মাস্ক বা মুখোশ

মাস্ক বা মুখোশ

এই মহামারীকালের বিপদের মধ্যেও কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির ওছিলা খোঁজে। তাদেরকে ধরে নেওয়া উচিৎ শিকারী পশু হিসেবে। লোকালয় থেকে তাদেরকে দূরে সরিয়ে রাখা দরকার।

সালমা নাহার দীর্ঘ্য দিন এই সরকারী হাসপাতালে চাকরী করে তার তিন ছেলে-মেয়েকে লেখা পড়া শিক্ষিয়ে বড় করে তুলেছে। সেই সাথে হাসপাতাল থেকেও সন্মান পেয়েছে অনেক। জুনিয়র নার্স থেকে সে আজ মেট্রন। ডাক্তারাও সাহস সঞ্চয় করে অপারেশন থিয়েটারে সালমা নাহার সাথে থাকলে।
আজই হাসপাতালের ডিরেক্টর সাহেব, ডা. মতিন বক্স তার ভূয়সী প্রসংশা করলেন নিজের চেম্বারে ডেকে নিয়ে। এই করোনা কালে এই ভয়ংকর দিনেও সে একটানা তিন দিন ডেউটি করে চলেছে, বাসায়ও ফেরে নি। হাসপাতালে নার্সদের বিশ্রাম নেওয়ার ঘরের বেডটাতে শুয়ে চার ঘন্টা ঘুমিয়ে নেয়। এবার সে বাসায় যেতে পারে, কারন আরো দুজন নার্স আজ থেকে ডিউটি করবে। বলে দিলেন ডিরেক্টার সাহেব।
শর্মিলী ওর মায়ের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে চলে ফোনে।
এখনতো তবু ফেসবুকের ম্যসেঞ্জারে কথা হয়। বাসায় রাউটারে মহল্লার মাতৃ ডট কম থেকে ব্রডব্যান্ড লাইন নেওয়া। স্বামী-স্ত্রী দুজনের দুটো মোবাইল, ওদের আট বছরের একমাত্র সন্তান সজীবের কম্পিউটার আর ওর স্বামী বকুলের ল্যাপটপ; সব কিছুতেই ইন্টারনেট। মাসে ছ‘শ টাকা মাত্র।
এই ক‘দিন আগেও যখন মোবাইল কোম্পানীকে টাকা দিয়ে কথা বলতে হতো তখনোও শর্মিলী ওর মায়ের সাথে ফোন করে কথা বলতো মিনিটে মিনিটে। এবং ফোনের কারনটাও হতো অদ্ভুত। “মা, তুমি আজ গোসল করে উঠে কি শাড়ী পরেছো?, তোমার জামাই সকালে দুটো ইলিশ মাছ এনেছে বত্রিশ‘শ টাকা দিয়ে, ইলিশ পোলাও খাবে। কী করে রাধতে হবে বলাতো?“
পরে মোবাইলে ইউটিইব দেখে দেখে ইলিশ পোলও রাঁধবার গবেষণাটা সেরে ফেললো। গবেষণার ফলাফল সহ্য করতে হলো বকুলকেই। বকুল খেয়ে দেয়ে স্ত্রীর সতৃষ্ণ জীজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘আজকালকার ইলিশে আর তোমন স্বাধ নেই। রাঁধো, রাঁধো। রাঁধতে বাঁধতে ভালো হবে।‘
আজকে মা-মেয়ের আলাপ একেবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে।
মা বললেন, ‘এই করোনার দিনে তোর শ্বাশুড়ীকেতো আর বের করে দিতে পারবি না, সেতো মা। তারও একটু বুঝে চলা দরকার বাড়িতে একটা বাচ্চা আছে।‘ শর্মিলী চুপ করে শুনছিল। ওর মা বলে চলেছে, ‘সরকারি ছুটি, দেশ সুদ্ধ মানুষ সব বাড়িতে বসে, কিন্তু আমার বেইনের ঘরে বসে থাকলে চলবে কেন? তোর শ্বাশুড়ীকে একটু বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘরে ধরে রাখতে পারিস না?‘ শর্মিলী এবার তার মায়ের কথার উত্তর দিল। ‘আমার শ্বশুড়ী কি কারো কথা শোনে!‘ ওদিক থেকে ওর মা বলেন, ‘হ্যা ছুটির দিনে ডিউটি করলেতো ওভাইটাইম পাবে — টাকার লোভ।‘
এর পর দু পাশে দুজন কিছুক্ষণ চুপ চাপ। যেন প্লান্টি কিক মারবার আগে মাঠের নিস্তব্ধতা।
শর্মিলীর মা বললেন, ‘এখনতো উনি ওনার বড় ছেলের বাসাতে গিয়ে থাকতে পারেন। সেখানেতো কেউ ছোট নেই। আর হাসপাতালটাওতো কাছে হয়। তুই আবার নিজে এসব কিছু বলিস না তোর শ্বাশুড়ীকে।‘
গোল খাওয়া গোলকিপারের মতো চেহারা করে বিমর্ষ শর্মিলী বললো, ‘নাহ আমি কাকে কী বলবো। নিজের সংসার সন্তানের কথা ও নিজে না চিন্তা করলে আমি আর কী বলবো। আর আমি বোঝালেও ওরা কি বুঝবে?‘
‘না মা, তুই কিন্তু নিজে কিছু বলবি না বাদলকেও। ও ভাববে তুই ওর মাকে তাড়াবার নতুন ফন্দি করছিস।‘
বাদল ওদিকে ড্রয়িং রুমে বসে বাড়িওয়ালার সাথে আলাপ করে যাচ্ছে। সে ভাড়া নিতে এসে নয়-সতেরো অনেক কথা শেষে কথা তুললো ওর মায়ের। বাদলের মায়ের হাসপাতালে কাজ, শুধুতো এই ফ্ল্যাট নয় পুরো বিল্ডংটাই রিস্কে পড়ে গিয়েছে।
সালমা নাহার ডিরেক্টরের রুম থেকে বেরিয়ে সোজা এসে দাঁড়ালো গেটের বাইরে ‘মেডিসিন কর্নারের‘ সামনে। দোকানের ছেলেটা দৌড়ে এসে হাজির হলো, ‘আপা কিছু লাগবো?‘ এই ওষুধের দোকান ও পাশের ঐ চা বিস্কুটের দোকান ঐ দিকের স্টেশনারি দোকান গুলোর মালিক কর্মচারীরা সবাই সালমা নাহারকে আপা বলেই ডাকে। কোনো ডাক্তারের চাইতে তার সন্মান ওর কম নয়। সালমা নাহার নিয়ে নিলো ক‘টা হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর বড় দু বোতল এন্টিস্যাপটিক।
বড় গেটটার মুখে একটা খালি রিক্সা যেতে দেখে সালমা নাহার ডাক দিল। রিক্সা এই এলাকারই। মাঝে মধ্যে দুজনই দুজনকে দেখেছে হয়তো কখনো না কখনো। ‘যাবা, রামপুরা?‘
‘না সিটার, যামু না।‘
‘সিদ্ধেশ্বরী?‘
রিক্সাওয়ালা ছেলেটা বললো, ‘না সিসটার।‘
পাশের দোকানদার একটু ধমকের সুরেই অনুরোধ করলো, ‘যা না বাবা, হারা দিনতো এহানেই বইয়া থাহস।‘
‘না ভাই আমি হাসপাতালের এসটাফ গাড়ীতে বয়ামু না।‘
উত্তেজিত হয়ে ওঠে পাশের চাওয়ালা, ‘ক্যানরে হালার পুত, হাসপাতালের এসটাফগো গোয়ায় গু লাইগা আছে নাকি তোর পুটকি মারছে …।‘
সালমা নাহার এবার হস্তক্ষেপ না করে পারলেন না। ‘এই সহোরাব, চুপ করো।“ চাওয়ালারে থামিয়ে রিক্সা চালককে নরম স্বরে বললেন, ‘আচ্ছা আচ্ছা না গেলে, যাও, যাও বাবা।‘
রিক্সা চালক বোধ হয় এবার এক রকমের মর্মপীড়ায় পড়ে অজুহাত দিল, ‘সিটার, আপনেরে রিক্সায় নিলে আর কোন প্যাসেঞ্জার উঠতে চাইবো না রিক্সায়!‘
এই অন্যায় অজুহাত শুনে সালমা নাহার জ্বলে উঠলেন। ‘ঢাকার লোকজন সব কি বসে বসে তোর রিক্সা দেখছে।‘
‘রাগ কইরেন না আপা, আমার নিজেরইতে ডর করে আপনারে রিক্সায় বয়াইতে। পেছনে বইবেন, করোনা যদি ভাইসা আসে আপনার সাসে (নিশ্বাসে)?‘
সালমা নাহার হেসে বললেন, ‘হ বাবা, বুঝছি। যাও তুমি যাও।‘
রিক্সাটা চলে গেল। সালমা নাহার মনে মনে বললেন, ‘মানুষ সচেতন না হয়ে আতঙ্কিতই হয়ে পড়েছে। ভয়। সারাক্ষণ প্রচার করা হচ্ছে, আতঙ্কিত হবেন না। তাই কি মানুষ আরো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে! ভয় পাচ্ছে রোগকে নয়, রুগীকে। মানুষকে মানুষ বাঘের মতো ভয় পেতে শুরু করেছে।‘ এসব কথা ঘুরছিল মাথায়।
ওষুধ দোকানের কিশোর ছেলেটা সালমা নাহারের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে। চোখে চোখ পড়ায় এবার বোকার মতো হাসে। সালমা নাহার জীজ্ঞেস করে, ‘ কিরে মালেকভাই কই।‘ মালেকভাই-ই দোকানের মালিক। এই ছেলেটা এখানে চাকরী করে। ছেলেটা বলে, ‘হে আহে না। করোনার ডরে।‘
‘তাই না কি? না না, সাবধান থাকা ভালো, তা তুই ডরাস না?‘
‘ডরাইলে কি, চাকরিতো কতে হইবো। তাছাড়া ওষুধ-পাতির দোকান, না খুললে চলে?‘
সালমা নাহার সেখানে দাঁড়িয়ে একটা রিক্সার আশায়। ছেলেটা বলে, ‘আপা, আগে কইলেন রামপুরায় যাইবেন পরে কইলেন সিদ্ধেশ্বরী…?‘
সালমা নাহার সগর্বে হেসে বললো, ‘রামপুরায় আমি থাকি আমার ছোট ছেলের সাথে। আর সিদ্ধেশ্বরীতে থাকে আমার বড় ছেলে।‘
‘ও!‘
‘রামপুরা গেলেতো ভালোই, নইলে সিদ্ধেশ্বরীতে গিয়ে এ বেলাটা থেকে বিকেলে বাসায় চলে যেতাম।‘
‘অহন বাবাস বাসায় না ঘোরাটাই ভালো।‘
শুনশান ঢাকা। প্রথম প্রথম ভালোই লাগলো। নিরব নিথর বিস্তীর্ণ কালো পথ। ছবির মতো শহর। পরক্ষনেই গাঁ ছম ছম করে ওঠে। গ্রামের নিরিবিলি পথে কিন্তু এমন শিউরে ওঠ না মন; ব্যাস্ত প্রান চঞ্চল ঢাকা এমন ফাঁকা ভালো লাগে না।
রফিকের দরজায় টোকা পড়লো। দরজা খুললো রফিক নিজে। দরজা খোলা নয়; দরজা খুলে উকি মারা। দরজায় একটা ছেকল (সিকিউরিটি চেইন) লাগানো। সেটা খুললেই পুরোপুরি দরজা খোলা হবে। রফিক সেটা না খুলে উকি মেরে দেখে তার মা সামিনা।
সামিনাও হাসপাতালে চাকরী করে সালমা নাহারের সাথে। ‘তুমি ঘরে আসবে এখন?‘
সামিনা ঢোক গিলে বললো, ‘না না, আমি ভেতরে আসবো না। আমার দুটো কাপড় নিতে এসেছিলাম। বউমাকে বল আমার লাগেজটা এনে দিতে আমি হাসপাতালে গিয়ে থাকবো।‘
নিজের লাগেজটা নিয়ে সামিনা নিচে নেমে এলো। নীচে নেমে চিন্তা করছিলো এখন কী করবে কোথায় যাবে। হট করে মনে পড়লো সালমা নাহারের কথা। সঙ্গে সঙ্গে ফোন।
সালমা নাহার তখন সবে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখছিল। ফোন বেজে উঠলো।
‘হ্যালো, হ্যা সামিনা আপা বলেন।‘
‘সে দিন যেন আপনি কোথায় একটা ওল্ড হোম দেখে এসে গল্প বলছিলেন।‘

Image by Jose Antonio Alba from Pixabay

Leave a Reply