সাথ নিভানা সাথীয়া

সাথ নিভানা সাথীয়া

আমাকে কোমল কন্ঠে, ‘বস বাবা‘ বলে খালাম্মা গলা চড়িয়ে ভাবীকে আদেশ করলেন, ‘আ্যই, শমি, খোকন এসেছে। ভালো করে এক কাপ চা দাও। আমাকেও এক কাপ দিও, চিনি ছাড়া।‘ খালাম্মার ডায়বেটিস, তাই চিনি খান না আজ-কাল। সারোয়ার ভাইয়ের স্ত্রি, শমিভাবী চা দিয়ে গেলো। র-টি। এ বাড়িতে র-টি চলে,মানে লাল চা। আমার তাতে আগ্রহ কম।
খালাম্মা সম্পর্কে আমার মায়ের কোনো বোন নয়, সানোয়ার ভাইয়ের মা। সানোয়ার ভাইয়ের কাছে আমি ছাত্র হিসাবে পড়তাম স্কুল ফাইনাল পর্যন্ত, টিউশন। সেই ছোটবেলা থেকে এবাড়িতে যাতায়াত। আমার ছেলে এবার সিক্সে উঠবে। আজ ছুটির দিন, তাই সানোয়ার ভাইয়ের সাথে আলোচনা করতে এসেছিলাম। সে এখন বাইরে বেরিয়েছে সান্ধ্য ভ্রমনের নেশায়। ‘সারা সপ্তাহ অফিস, ছুটির দিনেও সান্ধ্য ভ্রমন!‘
আমি কোনো প্রশ্ন করি নি। এমনিতেই কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো। খালাম্মা উত্তর দিলেন, ‘হ্যা আমার ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর থেকে ও এই হাঁটা শুরু করেছে।‘ ওনার চোখ তখন টিভির পর্দায়। বলবার মতো কিছু নেই বলেই বললাম, ‘কী দেখেন খালাম্মা?‘
‘সিরিয়াল।‘ আমিও খানিকক্ষণ দেখলাম। কিছুতো কথা বলা দরকার। বললাম, ‘কী সিরিয়াল?‘
খালাম্মা বললেন, ‘গোপী বাহু।‘ ব্রেকে দেখলাম সিরিয়ালের নাম সাথ নিভানা সাথীয়া। বললাম, ‘ও সাথ নিভানা সাথীয়া।‘ খালাম্মা আমার দিকে সঠান তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তার চোখের দিকে তাকানোর সাহস আমার হলো না, তাকালাম না। আমার অপরাধও বুঝলাম না। অযথা মনোযোগ দিতে হলো টেলিভিশনের দিকে। কিছুক্ষণ দেখে বিরক্ত হয়ে উঠেছি তখনই আবার ব্রেক। খালাম্মার দিকে ফিরে ওনার চোখে চোখ পড়ায় একটু বোকার মতো হাসলাম। খালাম্মা বললেন, ‘বড় বেশী ব্রেক দেয় চ্যানেলটায়।‘
বললাম, ‘না, এক ব্রেক থেকে পরের ব্রেক পর্যন্ত যেটুকু ঘটনা দেখালো – তা হজম করবার জন্যেতো এই ব্রেকের দরকার ছিল।‘
খাল্ম্মা আমার দিকে তাকালেন, ‘তোর বউ দেখে না নাটকটা?‘
‘জানি না। তবে যা দেখছি তাতেতো ওর এ নাটক দেখার কোনো কারন নেই।‘
‘কেন?‘
‘না, আমার মা, মানে ওর শ্বশুড়ীতো এখানে থাকে না এই বিদ্যে শিখে ও খাটাবে কোথায়!‘
‘হ্যা তুই ঠিক বলেছিস খোকন। এ সব সিরিয়াল আজকালকার বউদের নষ্ট করে ফেলছে।‘
আমি বললাম, ‘না খালাম্মা, শ্বাশুড়ী-বউয়ের সম্পর্ক ধীরে ধীরে বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে দিন দিন, সেটা নষ্ট করবার জন্য তৈরি হচ্ছে এই সব সিরিয়াল। যাতে সহবৎ নয়, সংযম নয়, বিরক্ত আর অতিষ্ট হয়ে বাপ-মাকে বুড়ো বয়সে দূরে রাখার ব্যবস্থ্যা নেওয়ার সিন্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় ছেলেরা, সেই চেষ্টা চালাচ্ছে।‘
আমিতো বলে থামলাম। খালাম্মা উঠলেন চেচিয়ে, ‘কী যাতা বলিস তুই!?
বললাম, ‘নাটকের নামটা কী?‘
‘তুইতো নিজে পড়ে দেখলি, সাথ নিভানা সাথিয়া।‘
‘তার মানে কী?‘
‘সাথে থেকো বন্ধু।‘
একটু থেমে বললাম, ‘ না, ঠিক তা নয়।‘
খালাম্মা আমার দিকে বড় বড় চোখ বের করে বিরক্তি আর বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে। ছোটবেলা এই খালাম্মার হাতে দুয়েকবার কান মলা খেয়েছি। এখনও সে কথা মনে আছে। ভয়ে ভয়ে বোঝাতে শুরু করলাম, ‘হিন্দী নিভানা মানে, যে কথা দিয়েছিলে তা রেখো। সাথ নিভানা সাথিয়ার ঠিকঠাক বাংলা অর্থ, সাথে থাকবার যে কথা দিয়েছিলে সে কথা রেখো। হিন্দুদের বিয়ের সময় আগুনের চারি পাশে ঘুরতে ঘুরতে আগুনকে সাক্ষী রেখে নারী-পুরুষ দুজনে দুজনের কাছে কিছু প্রমিস করে মানে কথা দেয়। মানে বিয়ে করেছো যে সব কথা দিয়ে তা রেখো।‘
‘তাতে খারাপটা কী।‘
‘খারাপ কিছু না। নাটকটায় বলছে তোমার শ্বাশুড়ী যতই জাঁদরেল হোক না কেনো, তোমার স্বামী শ্বশুর মূক ও বধীর হয়ে থাক তবু তুমি কখনো সঙ্গ ছেড়ো না।‘
উনি আরো জোরে চিৎকার করে উঠলেন, ‘তাতে খারাপটাকী?‘
‘শ্বাশুড়ীদের ইন্দন যোগাচ্ছে– তোমরা পুরাতন দিনের মতো কঠোর হও। কিন্তু আজ আর সব মেয়েইতো গোপীর মতো পিতৃ-মাতৃ হীন অশিক্ষিত অসহায় নয়, তারা কেন সহ্য করবে?‘
খালাম্মা চুপ করে বসে রইলেন।
আমি বললাম, ‘এখন গণতন্ত্রের দিন, সবার সাথে সবার সদ্ভাব বজিয়ে রেখে নরম হয়ে চলার দিন। যুদ্ধ করে দেশ দখলের দিন নয়।‘
খালাম্মা চুপ করে আছে দেখে আমি আরো একটু বললাম, ‘রাজা বাদশাদের মতো জোর করে গায়ের জোরে চাবুক মেরে শাসন করা যাবে না। কাজ করে প্রমান করতে হবে আপনি সুশাসক, জনগনের সেবা করবেন। তবেই ভোট আপনার পক্ষে, নইলে সিংহাসন নেই।‘
খালাম্মা গুম হয়ে বসে আছে দেখে আমি সালাম করে বেরিয়ে পড়লাম।
আমার ছেলেকে কোন স্কুলে ভর্তি করবো সে চিন্তা মাথাতেই রয়ে গেলো।

Leave a Reply