আই লাভ ইউ

আই লাভ ইউ

কাল মলির জন্মদিন। তেমন কিছু আয়োজন নয়, ওরা তিন চার জন বন্ধু একসাথে রাতে মলিদের বাসায় কেক কেটে জন্মপূর্তি ঘোষনা করে ওর মায়ের রান্না বিরিয়ানি আর পায়েশ খাবে। ব্যাস এই। স্বপন শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, ‘যে করেই হোক কালকেই মলিকে আই লাভ ইউ বলে ফেলতে হবে।‘ নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিয়ে পাশ ফিরে শুতেই আবার একটা প্রশ্ন ভেসে ওঠে মাথায়, কিন্তু বলবে কীভাবে?
এই ‘কী ভাবে বলবে-তে‘ এসে রাত একটা বয়ে চললো। গত ছ‘বছর ও এই রুমে ওর বড় বোনের পাশের বেডে ঘুমায়। আজ মনে হচ্ছে রোজী আপা বড় জোরে জোরে নাক ঢাকে। কলেজে পড়ে, এর মধ্যে যেন বুড়ি হয়ে গিয়েছে। ভোর তিনটে সময়ও ঠিক করে উঠতে পারলো না ঐ অব্যার্থ অব্যাক্ত শব্দ তিনটে বলবে কীভাবে!
এবারো না বলতে পারলে ওর পক্ষে বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে উঠবে — মানে, ষোল সতেরো বছরের স্বপনের বুকে এই চিন্তা দামামা পিটিয়ে বেড়ালো সারারাত। ভোর হবার আগে আগে কখন যেন দুশ্চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। রোজি আপার চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গল সকালে। হ্যা আটটা বেজে গেছে স্বপন তখনো বিছানায়। ‘স্কুলে যেতে হবে না?‘এই প্রশ্নের মানে, ওঠো, স্কুলে যাও, দেরী হয়ে যাচ্ছে।‘ স্বপন তড়াক করে উঠে বসে। বোন চোখ রাঙ্গিয়ে বেরিয়ে গেছে। স্বপনের মাথায় আবারো সেই চিন্তাটা, ও কীভাবে বলবে?
একবার ভাবলো বোনকে খুলে বলবে। আবার মনে হলো, না থাক। রোজি আপা মোটেই মলিকে দেখতে পারে না। ও বলে মলির নাকি খুব ঢং। ‘ক্লাস এইটে পড়ে ভাব দেখলে মনে হয় নায়িকা। খবরদার ওর সাথে মিশবি না।‘ কিন্তু স্বপনের যে ওকেই ভালো লাগে! ঐ নায়িকা নায়িকা ভাবটাই ওকে বেশী টানে। ওর নিজের ক্লাস টেনেরও কিছু সুন্দর সুন্দর মেয়ে ওর বন্ধু। নাইনেরও কিছু ছেলে মেয়ে ওর বন্ধু কিন্তু ক্লাস এইটের ঐ একমাত্র মেয়ে যার সাথে ও কথা বলে।
স্কুলের পিকনিকে গাজিপুরে গিয়ে দুজনের আলাপ। মলির ব্যাক্তিত্ব দেখেই ও সেধে আলাপ করেছিল। ফেরবার পথে রিজার্ভড বাসে দেড় দু ঘন্টা দুজনে পাশা পাশি সিটে বসে ঢাকায় ফিরেছে। তখন কথায় কথায় মলি বলেছিল, ‘আমি কিন্তু তোমাকে ভাইয় টাইয়া বলে ডাকতে পারবো না।‘ স্বপন বিরক্ত হয় নি বরং হেসে বলেছিল, ‘কেন? আমি তোমার চাইতে বড়। ক্লাস …‘
‘তা হোক‘
‘তাহলে কী বলে ডাকবে?‘
‘তুমি আমার নাম ধরে ডাকবে। আমিও তোমার নাম ধরে ডাকবো।‘
‘সে কী? কেন?‘
‘কারন তুমি খুব হ্যান্ডসাম।‘
স্বপন যেন কিসের সাথে ধাক্কা খেলো। বললো, ‘ঠিক আছে। কিন্তু সবার সামনে…‘
কথাটা শেষ করতে পারে নি ও মলি সামনে সিটে বসা ওর বন্ধুর সাথে আলাপ জুড়ে দিলো পিকনিক নিয়ে।
তারপর দুয়েকদিন দু জনেই দুজনের বাসায় যাতায়াত করেছে, বাড়ির সবার সাথে আলাপ পরিচয়ও হয়েছে। একদিন রাতে স্বপন রোজিকে বলেছিল বাসের আলাপের কথা। রোজি বলেছিল, ‘খবরদার ঐ মেয়ের সাথে আর মিশবি না।‘ তাতে ফল হলো বিপরিত। মেলা মেশার আগ্রহটা আরো বেড়ে গেলো। মলি যাতে আর বাসায় না আসে সে জন্য স্বপনই ওর বাসায় যেতে লাগলো মাঝে মধ্যেই। ফলে মলির মা একদিন যত্ন করে খির খাওয়াতে খাওয়াতে স্বপনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, ‘যাক ভালোই হয়েছে আমার কোন ছেলে নেই, তোমাকে একটা ছেলে পেলাম। আর স্কুলে মলি একটা বড় ভাই পেলো।‘ কথাটা শুনে স্বপন একটু মুশড়ে পড়েছিল। কিন্তু ততক্ষনাৎ মলি চিৎকার করে উঠলো, ‘ও তোমার ছেলে হয়তো হোক, আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমার কোনো ভাই লাগবে না। ও আমার ফ্রেন্ড, ব্যাস ফ্রেন্ডই থাক।‘
সেই দিন থেকেই স্বপন ভাবছে এইবার আই লাভ ইউ বলে ফেলা যায়! কিন্তু ঐ একই সমস্যা– বলবে কী ভাবে?
সুযোগ পেয়ে এক দিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর স্বপন ওর মার কাছে জানতে চাইলো, ‘আচ্ছা মা, আব্বা কখনো তোমাকে আই লাভ ইউ বলেছে?‘ ওর মা কপট রাগ দেখিয়ে বলেছে, ‘এ আবার কী কথা?‘
আব্বা হেসে হেসে বলেছিল, ‘তোর মা-ই আমাকে প্রথম বলেছিল।‘
ওর মা আরো রেগে ওঠে — রাগতো নয় রাগের ছল, ‘বুড়ো বয়সে ভিমরুতি! যেমন বাপ তেমন ছেলে!‘
স্বপন যেন কুলের একেবারে কাছে এসে পৌছে গেছে। ও জানতে চায়, ‘ আব্বা, মা কি তোমাকে আই লাভ ইউ বলেছিল।‘
‘কেন? বলতে পারে না! আমরা কি চল্লিশ দশকের লাভার, যে শুধু লাল গোলাপ দিলেই বুঝে যাবো আর মেনেও নেবো?‘
‘না মানে আই লাভ ইউ — এই শব্দ গুলোই বলেছিল?‘
‘কেউ কি আর সরাসরি ওই শব্দ গুলোই বলে! অন্য কিছু বলে বুঝিয়ে দেয়‘
বাপ বেটার এই আলাপ শুনতে শুনতে ওর মা ঝন ঝন করে উঠে চলে গেলো রান্না ঘরে। মেয়েকে কাজে হাত লাগাতে বললো গম গমে গলায়।
রাতে শুতে আসলে স্বপন বোনকে জীজ্ঞাসা করলো, ‘আপা তুই কখনো কাউকে বলেছিস আই লাভ ইউ?‘
‘আমি কি কাউ, যে কাউকে বলবো আই লাভ ইউ?‘
স্বপন প্রথমে বুঝতে পারে নি ‘কাউ‘ শব্দটা নিয়ে ওর বোন খেলা করছে। সবার এমন আন সিরিয়াসনেস দেখে ও মনে মনে বেশ কষ্টই পায়। তবু কাটা কাটা হাসি হেসে বলে, ‘বল না আপা!‘
রোজি বকা দিয়ে ওকে দমিত করে ফেলে। ‘ফাজলামির জায়গা পায় না, ঘুমো।‘
সে দিন রাতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। তবে গতকাল রাতে আর কিছুতেই … ভোরের দিকে বোধহয় একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাতে ওর ঘুম পরিপূর্ণ হয় নি। ক্লাসে ঢুলছিল। সারা দিন কোথাও মলিকে দেখা গেলো না।
টিফিনে স্কুলের দোতলার বারান্দায় পায়চারী করতে করতে ভাবছিল ঐ কথাটাই। দোতলায় টিচার্স রুম তাই এ দিকটা অনেকটাই শান্ত — ছেলে-মেয়েদের দৌড় ঝাপ, হই-চই নেই। চিন্তা ভাবনা করবার জন্যে স্কুলের মধ্যে এই জায়গাটাই একেবারে ‘রাইট চয়েজ।‘ স্বপন হাঁটা-হাঁটি করে ভাবছে কী ভাবে বলবে। এমন সময় ওদের বাংলার ম্যাডাম রুম থেকে বেরিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। অতিব সুন্দরী ও সদ্য বিবাহিত ফিরোজা ম্যাম সাধারনত টিফিনের পরে আর ক্লাস নেন না। বাসায় ফিরে যান। হয়তো তাই যাচ্ছিলেন। স্বপনকে ওখানে দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ে। স্বপনও তখন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এই বাংলা ম্যাডাম বেশ রাগী। ক্লাসের ছাত্র ছাত্রিরা ভয় পায় ভিষণ। সে খুব ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করে, ‘কী?‘
স্বপন বলে ফেলে, ‘না কিছু না, ঐ লাভ ইউ ম্যাডাম।‘ আর যায় কোথায়? ফিরোজা ম্যাডাম সঠান ওর দিকে তাকায় এমন আৎকা অস্বাভাবিক কথা শুনে। স্বপনও সঙ্গে সঙ্গে জিবে কামড় খেয়ে মাথা নীচে করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে থাকে। মনে মনে টের পায় এবার ওর টিসি নিশ্চত– লাইফ শেষ। রেজাল্ট যতই ভালো হোক না কেন, ও সব সময় অংকে কম নম্বার পায়। আর ওর আব্বা ওর রেজাল্ট দেখে বলে — ঐ আর কী, মুসলডাঙ্গায় গিয়ে গরু চরাতে হবে তোর। মুসলডাঙ্গা ওদের গ্রামের বাড়ী, পৈত্রিক ভিটা। এবার স্বপনেরও সে কথা মনে পড়লো, এবার বুঝি সত্যি সত্যি মুসলডাঙ্গায় গিয়ে ওকে ক্ষেত-খামার করতে হবে! টের পায় ম্যাডাম ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। স্বপন ভাবছে ম্যাডামের পা জড়িয়ে ধরে বসে পড়বে। নাকি হাতজোড় করে মাফ চাইবে। কিন্তু ওর যে ভারি কান্না আসছে। কিছু বলতে গেলেই ও এখন হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলবে মনে হচ্ছে। ম্যাডাম একদম কাছে এসে পড়ে। স্বপন শক্ত হয়ে দাঁড়ায়, এবার যে কোনো সময় ও ম্যাডামের পায়ের ওপর আছড়ে পড়বে। ফিরোজা ম্যাডাম একেবারে ওর কাছে এসে দাঁড়ায়। হয়তো ঠাস করে গালে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দেবে। তা দিক তবু যেন টিসি না দেয়। ভাবছিল আর ভেতরে ভেতরে ঘামছিল স্বপন। ম্যাডাম ওর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘আমরা সবাই তোমাদেরকেও খুব ভালো বাসি। আমরা সবাই।‘ তারপর গালটা ধরে একটু টেনে দিয়ে বললেন, ‘ভালো করে পড়া শোনা কর। পরীক্ষার আগে সবারই এমন একটু টেনশন হয়।‘ ম্যাডাম চলে গেলেন। স্থবীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল স্বপন।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর একে একে বন্ধুরা সব চলে যাচ্ছিল। ড্রয়িংরুমের এক নির্জন কোনে বসে মলির কাছে ম্যাডানের গল্পটা বলছিল স্বপন। মলি জানতে চাইলো, ‘হঠাৎ ফিরোজা ম্যাডামকে বললে কেন আই লাভ ইউ?‘
‘অন্য একজনকে বলবো বলে ভাবছিলাম কয়েক দিন ধরে। হঠাৎ ম্যাডাম চলে আসলো, মুখ থেকে ভয়ে বেরিয়ে গেলো আই লাভ ইউ।‘
‘কাকে বলবে বলে ভাবছিলে?‘
‘না সে কথা তোমাকে বলা যাবে না!‘
‘‘শুধু কি আমাকেই বলা যাবে না? নাকি কোন বন্ধুকেই বলা যাবে না।‘
‘শুধু তোমাকে।‘
‘ঠিক আছে-বলতে হবে না। আমি বুঝতে পেরেছি!!‘
রাত বাড়ছে। স্বপন বেরিয়ে আসে একটু পর। দরজা বন্ধ করতে এসে আবারো মলি বলে, ‘তুমি ঠিক কী বলেছিলে?‘
‘এখন আর বলতে পারবো না। আন ইজি লাগছে।‘
‘থাক বলতে হবে না–আমারো আন ইজি লাগবে।‘
দুজনেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।

Leave a Reply