সরি

সরি

রাত ন‘টার দিকে বাসায় ফিরেছিল ফারজানা। ও জানতো শাহদৎ বাসায় ফিরে একা একা বোর হচ্ছে। খাওয়া দাওয়া না করে শুয়েই পড়েছে হয়তো। তিন তলায় দু-রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাটটাতে ওরা দুজন। বিয়ের পর পরই উঠে এসেছে এখানে।
ফারজানা নিজের চাবি দিয়ে যথা সম্ভব অল্প শব্দ তুলে খুট করে দরজা খুলে দেখে ড্রয়িং রুমে বসে বসে শাহাদৎ টিভি দেখছে মনযোগ দিয়ে। ফারজানা জানে এটা মনযোগ দিয়ে টিভি দেখা নয়; এটা ওকে গুরুত্ব না দেওয়া। তার মানে শাহাদৎ এখন তাজা বোমার মতো তাতিয়ে আছে। সুযোগ পেলেই ফেটে পড়বে। কিন্তু ফারজানাই বা কী করতে পারতো।
বশীরের সাথে ও গিয়েছিল নিউ মার্কেটে। টুক-টাক কিছু সাংসারিক জিনিষ-পত্র কিনতে। হঠাৎ করে ভার্সিটিতে গোলা গুলি। ঝপ-ঝপা ঝপ করে সব দোকান পাট সাটার নামিয়ে দিলো। বাইরে গোলা-বারুদ, পুলিশ, কাঁদানো গ্যাস, বোমা, আগুন, লঠি-চার্জ, রক্ত। ওরা একটা খাবার দোকানে ফুচকা খেতে ঢুকে ছিল। আটকে পড়লো সেখানে। সেখানে নিরাপদ আশ্রয়ে বসে কাটলো এতক্ষণ।
এত সব কথা বলবার মতো মনের অবস্থা বা সময় এখন নেই। শাহাদাৎ ওর দিকে না তাকিয়ে শুধু নিজের হাতের ঘড়িটার দিক দেখলো। বললো, ‘নটা বারো।‘
ফারজানা আর কিছু বলবার সুযোগ না দেওয়ার জন্যে চিৎকার করে উঠলো, ‘হ্যা, হ্যা, আমি এত রাত পর্যন্ত রাস্তায় ঘুরে ঘুরে প্রেম করে বেড়াচ্ছিলাম।‘
শাহাদৎ কোনো কথা বললো না। সশব্দে অবজ্ঞা সূচক হাসি হাসলো এক কণা। এবার ফারজানা সত্যি সত্যি জ্বলে উঠলো। ‘নিউ মার্কেটে গিয়েছিলাম বশীরভাইয়ের সাথে। কিছু টুকটাক জিনিষ-পত্র কিনতে!‘
সাহদৎ আসলেও একবার ভেবেছিল ফাজোনা কারো সাথে প্রেম ট্রেম করছে নাতো? ওদের বিয়ে হয়েছে আট বছর। অফিসের রাখির সাথেতো ও নিজে প্রেম-প্রেম সম্পর্ক বজিয়ে চলছে। ফারজানাও তেমন ….! তবে বশীরের নাম শুনে ও নিশ্চিত হলো। বশীর সাহদাতের আবাল্য বন্ধু, ওকে সাহদৎ ভালো করে চেনে, সে প্রেমের ব্যাপারে ভীষণ কাঁচাকাঁচা, আর বন্ধুত্বের ব্যাপারে সাংঘাতিক আদর্শবান। স্কুল কলেজ এক সাথে। জীবনে কোনো মেয়ের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়েও দেখে নি। ওর সাথে গেলে, ঠিক আছে। ফারজানা নিজেও প্রেমে মোটেই পটু নয়। মনে মনে এত সব চিন্তা করে নিয়ে সে নিজেকে বকা দেয়। ছিঃ ছিঃ বউকে সন্দেহ!
ওর দিকে না তাকিয়ে আবারো বললো, ‘তাড়া তাড়ি ফ্রেস হয়ে আসো, খিদেতে আমি এক্কেবারে শেষ।‘
ফারজানা বেডরুমের দিকে যেতে যেতে উত্তর দিল, ‘ টেবিলে সব বেড়ে দিচ্ছি আমি খেয়ে এসেছি। তুমি খেয়ে নাও ।‘
আজ চার বছর পর আবারো এক রাতে সেই টেবিলে কেক সাজিয়ে বসে সাহদৎ ভাবছিল এসব। আজ ওদের বিবাহ বার্ষিকি। প্রতি বছরই এই ভাবে বসে থেকে থেকে ভাবে। আজ হয়তো ফারজানা নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে এসে বলবে ‘সরি‘।

Leave a Reply