ভালো বাসা এবং ভালবাসা

ভালো বাসা এবং ভালবাসা

শরীফ ন‘ টার মধ্যে বেরিয়ে যায়, এক ব্যাংকের মতিঝিল শাখার এসিস্টেন্ট ম্যানেজার সে। সামনেই প্রেমোশন পেয়ে ম্যানেজার হবে। মেয়েটাও কলেজে বেরিয়ে পড়ে বাপের সাথেই। ছেলেটা স্কুলে, সিক্সের ছাত্র। ছাত্র ভালো, পড়তে বসার জন্যে বকা ঝকা করতে হয় না, মেধাবী, ‘বাপের মতোই হয়েছে‘ বলে ওর দাদী। একটু আগেই স্কুল বাস এসে তাকে নিয়ে গেলো। শাশুড়ি সবে নাস্তা খেয়ে বিছানায় গিয়ে শুলেন। এতক্ষনে তমা একটু নিঃশ্বাস ফেলে বসবার সুযোগ পেলো।
শরীফ কাল অফিস থেকে ফিরে এসে জানিয়েছিল ওর প্রোমোশন হবে খুব শিঘ্রী। ফলে ছেলে মেয়ে বায়না ধরলো, ‘পার্ট‘। ব্যাস, আরকি, গোটা পরিবার গিয়ে হাজির বেইলী রোডের কেএফসিতে।
মানে, ওর ছেলে-মেয়েদের কেএফসিতে খাওয়ার ওজুহাত প্রয়োজন। আর ছেলে-মেয়েদের বাপের দরকার স্বস্ত্রীর বাইরে বেড়ানোর ওজুহাত। পড়ে রইলো রাতের জন্য রাধা সব ভাত তরকারী। সে-সবের ব্যাবস্থা চিন্তা করতে করতে সব ফ্রিজে তুলে রাখতে রাখতে তমা মনে মনে ভাবছিল, এই হটকারিতা, অস্থিরতা, বিরক্তিটাইতো সংসারের সুখ। তাইতো রাগ আসে না, রাগের ছল আসে চোখে-মুখে।
ঠিক তখন ফোনটা এসেছিল তরুর। তরু ওর বড় বোন। বছর দুয়েকের বড়। তবু দু‘জনে কখনো ভালো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে নি। তরুও ঢাকাতেই থাকে। ওর স্বামীর চাকরি এক বেসরকারি অফিসে। বেতন অল্প, সংসারের অবস্থা বিশেষ ভালো না। চেয়ে-মেঙ্গে চলতে হয়না ঠিকই তবে টানা-টানির মধ্যে থাকতে হয় সারা বছর।
ওর ফোন দেখেই তমার মনটা তিতে হয়ে ওঠে। হয়তো কোনো আত্বিয়-স্বজন কেউ মারা গেছে। নয়তো ছেলের স্কুলের বেতন বাকী পড়েছে? ফোন ধরেই বললো, “হ্যা বল?“
তরু দশ মিনিট ধরে ফোনে যা শোনালো তাতে তমার মন আচমকা খারাপ হয়ে ওঠে। ঝক মকে শিতের দুপুরটায় কোত-থেকে এক রাশ কালো মেঘ উড়ে এসে ঢেকে ফেললো সমস্ত মন-ভূবন। একটু পরেই ভিজে উঠলো চোখ। ঝম-ঝমা-ঝম বৃষ্টির আসঙ্কায় মানুষ যেমন দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে ওঠে কাছের কোনো আস্তানায়; তমা তেমনি ঝট করে ফোনটা কেটে দিয়ে দ্রুত চলে আসে নিজের শোবার ঘরে। বিছানায় শুয়ে আরাম করে শরীর ঘুমাচ্ছে। নাক ডাকছে।
তমা ওর দিকে তাকিয়ে দেখে। বড় মায়া মায়া লোকটার চেহারা। হ্যা এটাই ওর আশ্রয়।
কিছুক্ষণ নিস্পলক তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে। মনটা ফুর ফুর করে হেসে ওঠে সবে দুটো দাত গজানো শিশুর ফোকলা মুখের হাসির মতো। আবারো মনে পড়ে, তরু জানিয়েছে বাদল ভাইয়ের খুব অসুখ, ডাক্তার বলছে রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে যাচ্ছে। চিকিৎসা করানোর পয়সা নেই। মুখ-হাত ধুয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়। শরীফ পাশ ফিরে শুয়ে ওর গায়ে হাত দিয়ে জড়ানো গলায় বলে, ‘এত ক্ষনে সময় হলো।‘ তমা কথার উত্তর দিতে গিয়ে টের পেলো সে নাক-ডাকছে।
তমা পাশে এসে শুলেই বা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেই লোকটা যেন কী ভাবে টের পেয়ে যায়। শরীফ পাশ ফিরে ওর জামার মধ্যে একটা হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ছোট বাচ্চার মতো খেলতে থাকে ঘুমের মধ্যেই। প্রশ্নটা করে গভীর ঘুমে ডুবে যায়।
ঘুম আসে না তমার। আজ ওর বুকের ওপর শরীফের হাতটা ভীষণ ভারি মনে হচ্ছে। সারা রাত ঘুম হলো না। সকালে উঠে আবারো সংসার। সবাই যে যার কাজে চলে গেলো । শাশুড়ি নিজের ঘরে গিয়ে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছে। ছেলে চলে গেলো। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে তমা এসে বসলো ডাইনিং টেবিলে। মাথায় হাত দিয়ে। হঠাৎ মনে হলো,ওর বুকের ওপর শরীফের হাতটা ভারি পাথরের মতো চেপে বসে আছে এত বছর!

Image by Susanne Jutzeler, suju-foto from Pixabay

Leave a Reply