আধুনিকায়ন

আধুনিকায়ন

মুক্তিযুদ্ধের আগে ঢাকা শহর কেমন ছিল জানি না। স্বাধিনতার বছরখনেক পর আমরা ঢাকায় এসেছি। তখন আমার বয়স আট বছর পেরিয়ে কয়েক মাস মাত্র। আমার দেখা ঢাকাটুকুতে তখনো সব দু-তিন তলা বিল্ডিং, মতিঝিলের টয়োটা বিল্ডিংটাই সে-সময়ে সর্বচ্চে ইমারত।
কাকরাইল মোড়ের কাছাজাছি শাত্নিনগরের দিকে যেতেই দঁড়িয়ে ছিল একটা পেট্রোল-পাম্প, নাম মনে নেই। তখনকার দিনে পেট্রোল-পাস্পগুলোর আদৌ কোনো নাম থাকতো কিনা তাও মনে নেই। এখন যেখানে এইচ আর ভবন, সেখানে তখন বস্তি; আর বেড়ার একটা হোটেল। হোটেলটারও নিশ্চয় একটা নাম ছিল, সে নামটাও মনে নেই। তবে হোটেলটার মালিক ছিল জামির হোসেন।
আমরা হোটেলটাকে বলতাম জামিরের হোটেল। ওখান থেকে বিকেলের নাস্তা আনিয়ে আমরা খেতাম প্রায়। আর আমিতো তখন আমিনের সাথে ওই হোটেলে গেলে, জামিরভাই আমাকে কোলে বসিয়ে অনেক কিছুই খাওয়াতো বিনি-পয়সায়ে, আদর করে।
আমিন, আসলটা আমি গোপন করে নিজে বানিয়ে নামটা দিয়েছি, কারন ওর আসল নামটা এখানে দিলে ভুল বেঝাবুঝি হবে। অনেক হিন্দু চাকরের নাম ভগবান। অনেকে সেটা অবলিলায় লেখেনও। কিন্তু আমার তাতে বাধেঁ।
যাইহোক সেই আমিন আসলে আমাদের গ্রামের বছর বারো তের বয়সের একজন হত-দরিদ্র পরিবারের ছেলে। আমাদেরই অনতিদূরের আত্মিয়, সম্পর্কে আমার চাচা। আমার ছোট ভাই, তখন বছরখানেকও বয়স হয়নি। তাকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই আমিনকে আনা। তবে আমি কাছাকাছি কোথাও বাইরে বেরোলে সে-ই হতো আমার সহযাত্রী বা সফরসঙ্গী।
পড়তাম উইলস লিটল ফ্লাওয়ারে। আমিনই আমাকে স্কুলে নিয়ে যেতো; স্কুল থেকে নিয়ে আসতে যেতো সে-ই। আমি ওর হাতে বই-খাতার প্যাটরাটা ধরিয়ে দিয়ে হাঁটতাম। ভাবতার, ‘আহ! একেই বলে স্বাধিনতা!‘ বড় হয় বুঝেছিলাম আসলে ওকে আমার সাথে পাঠানো হতো আমার অস্থায়ী মুরুব্বি হিসাবেই। অর্থাৎ আমি স্বাধিন নয়, আমিনই ওই সময়টুকু স্বধিনতা উপলব্ধি করতো।
যাইহোক সেই জামিরের হোটেলের ঠিক বিপরিতে রাস্তার উল্টো দিকেই সেই পেট্রোল-পাম্পটা। তার পাশ থেকে একটা পায়ে চলা পথ চলে গিয়েছে ভেতরে। আর তার ঠিক পাশেই, রাশিয়ান টেলিভিশন। কাঠের বাক্সওয়ালা টেলিভিশন।
কারো কারো বাসায় তখন সেই ‘ভিশন‘ যন্ত্রটা। বাড়ির ছাদে তার এ্যন্টিনা।
আস্তে আস্তে সেই এ্যান্টিনার সংখ্যা বেড়ে গেলো ঢাকায়। আমিও বেড়ে উঠছি সেই সাথে। যুবক হয়ে উঠে কয়েকটা প্রেমে পড়লাম একে একে, শেষ প্রেমটা এসে দাঁড়ালো কম্পিউটারের সাথে। দেশে তখন সেটা নতুন নতুন এসেছে। তখনও শুধু কাজের জায়গাগুলোতেই কম্পিউটার দেখা যেতো। চিড়িয়াখানায় বাঘ দেখবার মতো। দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি — বিস্তর আয়োজন করে, বিকট শীতল, প্রায় বিজন কক্ষে সেই যন্ত্রটা স্থাপন করে কাজ করা হতো।
সেই যে জামিরের হোটেলের মালিক জামির ভাইয়ের কথা বলেছিলাম। সে তখন একটা ছোট-খাটো ইন্ডাট্রির মালিক (সেই হোটেলের পয়সায় তৈরি ইন্ডাট্রি নয়। সে আসলে বড়লোক ঘরের নষ্ট ছেলেদের একজন। তার ভাইদের অনেকে বিলাত ফেরৎ ডাক্তার।) জামির ভাই তার ফ্যাকট্রির জন্য একটা এ্যপেল টু কম্পিউটার কিনেছিল, সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে। রাতে বিরাতে সেই ফ্যাকট্রিতে গিয়ে রাতের পর রাত জেগে শিখে ফেললাম এ্যপেল টু (ম্যাকেনটোশ) চালানো। বিনা ওস্তাদে রাত বিরাত জেগে আমার কম্পিউটার শেখাটাও একটা গল্পই বটে। তার চাইতেও অনেক বড় গল্প তৈরি হলো আরো বছর খানিক পর — একটানা পনেরো দিন এক জায়গায় বসে আইবিএম শেখা।
ইতোমধ্য আমার পেশা জীবন শুরু হয়ে গেছে। চলচ্চিত্র বানানো নিয়ে লেখাপড়া করেছি, পেশা হিসাবে বেছে নিলাম বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মান। আমার পেশার সাথে আধুনিক যন্ত্রপাতির সংসর্গ ভিষণ। সেখানে ক্রমে ক্যামেরায় বিস্তর বদল হতে থাকলো বছরে বছরে। সাংঘাতিক ভাবে বদলে গেলো সম্পাদনার কৌশল। লিনিয়ার থেকে হয়ে গেলো নন-লিনিয়ার। প্রায় শত বছর ধরে চলে আসা সিনেমার সনাতনি প্রথা বদলে গেলো। ছবি তোলবার আয়েসি প্রয়াস স্বমূলে উৎপাঠিত হয়ে চলে আসলো হাতে হাতে। জনে জনে ফটোগ্রাফার এবং সিনেমাটোগ্রাফার হয়ে উঠলো।
যাইহোক, আমার পেশাগত জীবন শুরু হবার কয়েক বছরের মধ্যে দেশে পৌছে গেলো ইন্টারনেট। আমি ততদিনে 486DX4 একটা ল্যাপটপ নিয়ে খুশীতেই ছিলাম। এবার বাসায় একটা পেন্টিয়াম কম্টিউটার কিনলাম পঁচানব্বুই হাজার টাকা দিয়ে। এবার তাতে ইন্টারনেট কানেকশন নেবার জন্য একটা 56Kbps ফ্যাক্স এন্ড ডাটা মডেম কিনলাম। মনে হলো আর কী চাই! এখন আমার এই কম্পিউটারের সাথে একটা 4mbps ব্রডব্যান্ড কানেকশন লাগানো। এখনো মনে হয়, আরো একটু স্পিড লাগে!!

source

Leave a Reply