You are currently viewing সাহিত্যের ‘সাহিত্য‘ বা ইতিহাস নয় সাহিত্যের ‘বিজ্ঞানের রসায়ন‘

সাহিত্যের ‘সাহিত্য‘ বা ইতিহাস নয় সাহিত্যের ‘বিজ্ঞানের রসায়ন‘

সেদিনও ফেসবুকে চোখ বোলাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে চোখে পড়লো কবিতার একটা ইংরেজি পত্রিকায়। দুটো ব্যাপারেই আমার আগ্রহের কমতি নেই: কবিতা আর ইংরেজি। দুটোর সাথেই আমার প্রেমের সম্পর্ক– পরকীয়া প্রেম; গাচছড়া বাঁধা তো বাংলার সাথে – ইতিসাসের সাথে। খোঁজ লাগালাম, পাওয়া যায় কিভাবে?

সেই সূত্র ধরে পরিচয় হয়ে গেলো উদয় শংকর দুর্জয়ের সাথে। তার বিনয়-অবনত কণ্ঠের ভারীক্কিপনায় আমি ধরেই নিয়েছিলাম- এতো কলকাতার ছেলে! নামের ধর্ম-পরিচিতিটাও যে সে চিন্তাকে একেবারেই প্রশ্রয় দেয় নি তা নয়। গুগোল করে পেলাম তার দুটো বই, একটা কবিতার অনুবাদ অন্যটা প্রবন্ধ।

উদয় শংকর দুর্জয়ের প্রবন্ধ সংগ্রহ নিয়ে বসলাম। মাখনে ছুরি চালানোর মতো করে সে রাতেই পড়ে ফেললাম পরপর তিনটে লেখা। আসলে এখানে ছুরি হলো তার লেখা আর মাখন হলাম আমি। প্রবন্ধগুলো আমাকে চিরে চললও। ব্রেন-হেমোরেজের পরে চোখের সাথে পেরে উঠি না বলে আজকাল আর একটানে দু-তিন ঘণ্টা ছাপা বই পড়তে পারি না।

পরের দুদিনে জীবনানন্দ দাশ থেকে শেষ করলাম শহীদ কাদরী অবধি। লেখক নিজেই একটা সিলেবাস তৈরি করে প্রবন্ধ গুলো থরে থরে সাজিয়ে দিয়েছেন কবিতার অন্দর মহলে ঢোকবার জন্য। আসলে বলা উচিৎ সাহিত্যের; ‘সাহিত্য‘ বা ইতিহাস নয় সাহিত্যের ‘বিজ্ঞানের রসায়ন‘ হলও এই বইটা।

লেখার গুনে বইটার পনেরোটা গদ্যই অসামান্য হয়ে উঠেছে। পাতায় পাতায় অসংখ্য তথ্য একেবারে ঠাকমার মুখে বলা কাহিনীর সরলতা নিয়ে বলে ফেলা– কখনোই ত্বত্ত্বভারে নুজ্ব হয়ে পড়ে নি। বরং বইটা নিজের পাণ্ডিত্যের ভারে নুয়ে আছে জ্ঞান বিলি করবার জন্য। মেরী শেলীর ফ্রাংকেনস্টাইন, জীবনানন্দের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি‘প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথের মতামত, রবীন্দ্রনাথ আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে দেওয়া আশকারা, ভি এস নাইপলের সত্যিকারের কোনও কিছুর জন্য অপেক্ষা। আরও অজস্র কবি সাহিত্যিকের লেখা আর জীবনের ছোট ছোট কথা দিয়ে গল্পের ছলে বলা সমস্ত বইটা।

লেখক মেদ শূন্য গদ্য-ভাষ অত্যন্ত প্রাঞ্জল, স্বচ্ছ এবং স্পষ্ট। কোথাও বাক চাতুর্যতা বা অতিকথন নেই। গোড়াতেই বলেছেন অন্যভাষার মুগ্ধ-পাঠের আত্মোপলব্ধির কথা। অতঃপর একে একে বব ডিলন, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, মেরী শেলী, ভি এস নাইপল, স্টিফেন হকিং, কন্ডে, ডেবিড ওয়ালিয়ামস, ইশিগুরো, বেঞ্জামিন জেফানাইয়া, নবারুণ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, হুমায়ূন আজাদ, শহীদ কাদরীকে ধরে বায়রনসহ আরও শতজনের প্রসঙ্গে কথায় আধুনিক কবিতা ও সাহিত্যের ধরন ধারণ নিয়ে অকাতরে আলোচনা করে গেছেন শতাধিক পৃষ্ঠা।

শেষে বইয়ের কারিগরি দিকটা নিয়ে একটু কথা না বললে বড় অন্যায় হয়ে যায়। এত মোটা কাগজে বইটা ছেপে অনর্থক মূল্যবৃদ্ধির কোনও মহৎ কারণ দেখি না।

Leave a Reply