সামসুর সমগ্র জীবন

সামসুর সমগ্র জীবন

আরো ষোলজন ভীক্ষারির সাথে সামসুও বসেছে আল্লার দান হোটেলের পেছনের মাঠে। রাত একটা বেজে গেছে। এখন যে কোনো মুহূর্তে আলী ভাই এসে লাইন দিয়ে বসে থাকা কয়-জনকে পেট পুরে ভাত খাওয়াবে।
এঁঠো, উচ্ছিষ্ঠ কিছু না, সারা দিনের বেচা-বিক্রির পর যা কিছু থেকে যায় সেই সব খাবার-দাবারে এদের মধ্যে বিলি করে দেয়। খাওয়া শুরু হয়ে একটু একটু করে বিরিয়ানী দিয়ে শেষ হয় জিলেপী খাইয়ে। এর মাঝে সাদা ভাত মাছ-মাংস ডাল তরিতরকারী সব।
আলী ভাই এখনো তার দু‘জন সাগরেদসহ হাড়ি ডেকচি নিয়ে বাইরে বের হয় নি। বের হওয়ার আগের প্রস্তুতীর টুং-টাং শব্দও ওঠে নি এখনো।
সামসু ভাবে তাহলে কি এখনো রাত একটা বাজে নি। নাকি আজকে খাওয়ানো ক্যানসেল। চিন্তাটা মাথায় আসতেই ওর চোখ ভরে ওঠে। সারা দিনে এই একবারই ও খায়। গোটা দিন যেন পেট ভরা থাকে সে ভাবেই খায়। কিন্তু আজ যদি সত্যি সত্যি খাওয়ার প্রোগ্রাম বাতিল করে থাকে এরা তাহলে ওকে না খেয়ে থাকতে হবে সারা রাত এবং কাল সারা দিন। রাতে না খেয়ে ও ঘুমাতে পারে না।
ভাবতেই কান্না চেপে দপ করে জ্বলে ওঠে ও। সাত-আট বছর বয়সের সামসু, রাগে জ্বলে উঠলেও বা আর কতটুকুই জ্বলতে পারে। নিজেকে বোকা মনে হয়। হেসে ফেলে।
এবার সময় কাটাতে ও লোক গুনতে বসে, আজ ক‘জন ফকির মিচকিন এসেছে এখানে? গুনে দেখে ষোল জন। দু জন নতুন। এর আগে কখনো আসে নি। তারা কে? কোথায় থেকে আসে?
আল্লার দান হোটেলের পেছনে বড় রান্না ঘর। তার পেছনে পায়ে হাঁটা পথ ঘেসেই এই ঘাস হীন ফাঁকা জায়গাটাই মাঠে। সেখানে তেরপল দিয়ে সামিয়ানার মতো করে ছাউনী দিয়ে রাখা। হোটেলের বাজার সদাই রিক্সায় বা ভ্যানে এনে এ দিক দিয়ের রান্নাঘরে ঢোকানো হয়। বয় বাবুর্চি আর রান্নার সহযোগি লোক-জন সব এ দিকটাই ব্যবহার করে। আবার কাজের ফাঁকে এদিকটায় এসে তেরপলের ছাউনীর নিচে খোলা বাতাসে বিশ্রাম নিতে পারে।
রাতে ওপরে ঝোলানো বড় লাইটটা জ্বেলে দিয়ে নিচে একটা তেরপল বিছিয়ে দেওয়া হয় এই সব গরীব দুঃখীদের খাওয়ানোর জন্যে।
গরীব খাওয়ানোর এই প্রথাটা চালু করে দিয়ে গিয়েছেন এই হোটেলের মালিক, শহীদ নিয়ামত উল্লা খান। দেশের মুক্তি যুদ্ধে সে শহীদ হয়ে যায়। এখন তার ছেলেরা মালিক। বাবার শুরু করা প্রথা এখনো চালু রেখেছে।
সামসু এ সব কথা শুনেছে ছিটে ফোঁটা করে ভিন্ন ভিন্ন জনের মুখে। তবে তার সে ইতিহাসে কোনো দরকার নেই, তাই আগ্রহও নেই।
সামসুর মনে পড়ে না ও আসলো কোথায় থেকে। অতিতের প্রথম স্মৃতি ওর তিন চার বছর আগে এক সন্ধে বেলা এখানে একটা সবজী-বওয়া ঝাকায় বসে ও খুব কাঁদছিল। আর কিছু মনে নেই। তার পরের স্মৃতী রামপুরা ব্রিজে ঠেলে ঠেলে রিক্সা পার করা। এই কাজটা সামসু এখনো করে। কাজ না বরং ও এটাকে খেলা মনে করে। যতক্ষণ ইচ্ছা রিক্সা ঠেলে ব্রিজে উঠিয়ে দাও, প্যাসেঞ্জার খুশী হয়ে দু-এক টাকা দিয়ে দেয়। ফিক্সড কোনো রেট নেই এই কাজের। তবে ক্যাশ ইনকাম।
আবার যতক্ষণ ইচ্ছা শপিং-মলের সিড়িতে বসে শুয়ে জিরিয়ে নেয়। রাতে ঘুমায় এখানেই।
খালি গায়ে লম্বা চওড়া মোষের মতো জমাট শরীরটা নিয়ে বেরিয়ে আসে আলী ভাই। সাথে দু‘জন সাগরেদ আর হাড়ি ডেকচি ।
সারা দিনে রিক্সা আর মাল বোঝাই রিক্সা ভ্যান ঠেলে ঠেলে যা টাকা পায় তা সবটাই জমিয়ে রাখে। টাকা জমিয়ে জমিয়ে সে একটা রিক্সা কিনবে বড় হলে। খাওয়া দাওয়া এই এক বেলা। রাতে। ফ্রি। এখানে খাওয়া শেষ করে ও হেঁটে হেঁটে চলে যায় শপিং মলের সিড়িতে।
তখন ও বুঝতেই পারে নি যে বছর পনেরোর মধ্যেই এই মলের সামনে এমন উড়াল পুলে রাস্তা হয়ে যাবে। ঢাকা শহরের চেহারা এমন টেলিভিশনে দেখা বিদেশের মতো হয়ে যাবে।
ফ্লাই ওভার বেয়ে কালো টয়োটা গাড়িটা নিজে ড্রাইভ করে নিয়ে এসে সামসু দাঁড়ায় এসে আল্লার দান হোটেলটার সামনে। গত বারো বছর রাতে ও আসে এখানে খেতে। প্রথম প্রথম আসতো বাস থেকে নেমে পায়ে হেঁটে। গত সাত-আট বছর আসছে এই গাড়িতে। হোটেলের সবাই তাই ওকে চেনে। সবাই জানে ওর খাওয়ার মেনু। প্রথমে এক প্লেট বিরিয়ানী নিয়ে একটু খায় তারপর ঠান্ডা ভাতে মাছ-মাংস-ডাল-সবজী শেষে জিলাপী।

Image by F. Muhammad from Pixabay 

Leave a Reply