You are currently viewing শেষ নিদ্রর আগে

শেষ নিদ্রর আগে

১ পর্ব

সেকি আমি জানি, গত দু‘মাস আমি আইসিউতে জড়বৎ পড়ে আছি? প্রথম প্রথম মাথা খুললো। আমি স্বপ্নচারী জীবন কাটালাম ক‘দিন বা ক‘ঘন্টা। শেষে চোখটাও খুললো, বোধহয় কয়েক মিনিট। দেখলাম, চারি দিকে আঁধার, সামনে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে ভ্রমর-কালো এক নারী। মনে হলো, এই বুঝি আজরাইল — কারন, আগেই দেখেছি (স্বপ্নে) আমি হাজারো লাশের সাথে বিশাল কোনো নদী পাড়ে পড়ে আছি।
পরের দিনই মাঝে মধ্যে আরো কয়েকবার আমি হুস ফিরে পেয়েছি। ধিরে ধিরে বুঝে উঠতে পারলাম আমি হাসপাতালের বেডে। নড়া চড়ার ক্ষমতা নেই। আমার মুখে অক্সিজেন মাস্ক, নাকে খাদ্যের নল, গলা কেটে একটা নল লাগানো।
রাতের দিকেও একবার চোখটা খুলেছিল। দেখলাম ভ্রমর কৃষ্ণ এক সাফাই কর্মী। রাতে আইসিউ পরিস্কার করছে বড় একটা লাঠি লাগানো ঝাটা দিয়ে। বুঝলাম গত রাতে ওনাকে দেখে আমার মৃত্যু ভয় জেগেছিল মনে।
আজ সাত বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, আজো রাতে বিরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে মনে হয় সেই ভ্রমর-কৃষ্ণ নারীর কথা। ভয় কিন্তু কাটে নি।
আমি আইসিউতে জড়বৎ পড়ে, বোধ হয় বিগত রাতে প্রথমবারের মতো চোখ খুলেছিলাম। ভ্রমর কৃষ্ণ এক সাফাই কর্মীকে বড় একটা লাঠি লাগানো ঝাটা দিয়ে আইসিউ পরিস্কার করতে দেখে ভয় পেয়েছিলাম খুব। সে ভয় স্থায়ী হবার আগেই আবারো কখন যেন অজ্ঞাণ হয়ে পড়েছি, জানি না।
পরে যখন চোখ খুলতে পেরেছিলাম, সম্ভবত পরের দিনের সকালবেলা। চারিদিকে দিনের আলো। তখনও বুঝি নি আমি কোথায় এবং কেন? চোখ খুলতেই দেখি আমাদের বাড়িওয়ালী খালাম্মা। আমি আঁৎকে উঠলাম, এখনই নিশ্চয়ই বলবেন, “কী খোকন টাকা পাইছো?“
তারপরেই দেখলাম পাশে বসে খালুজান — মানে বাড়িওয়ালা। তখন বুঝলাম, আমি তো হ্সপাতালে, নিশ্চয়ই তাহলে আমাকে দেখতে এসেছেন।

তখনই আমরা তার বাসায় ভাড়া আছি অনেক বছর। ওনারা কখনো বাড়িওয়ালার মতো ব্যাবহার করেন না, আত্মীয়-স্বজনের মতো হয়ে আছি। নিজেদের বাড়ির মতো করেই থাকি। খালাম্মার সাথে আমার একটা মা-ছেলের মতো সম্পর্ক্য গড়ে উঠেছে। খালুজান মাস দেড়েক আগেই বেহেস্তবাসী হয়েছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন) ওনার মুখোমুখি হয়েছি কম।
আম্মার সাথেও যেমন অনেক কথা কাটা-কাটি হয়, আমি রোয়াব ঝাড়ি। খালাম্মার সাথেও তেমন। খালাম্মাও তেমন, আমার মায়ের মতো আৎকা জীজ্ঞেস করে বসে, “কী খোকন টাকা পাইছো?“ সেইটা ওনার ভাড়া চাওয়া নয় আর্থিক অবস্থার খোঁজ খবর নেওয়া। ভাড়াতো প্রথম দুয়েক বছর ছাড়া কখনোই আমি একসাথে দি নি, অনেক সময় এমনও হয়েছে ভাড়ার টাকা তার হাতে দিয়ে সে টাকা আবার ধার করে নিয়েছি।
আমি জানি না কোথায় শুয়ে আছি, খালাম্মাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল এখনই হয়তো বলবেন, “কী খোকন টাকা পাইছো?“
তবে সেদিন থেকে খালাম্মা আজ অবদি আর কখনোই আমাকে ও কথা বলেন নি। কারন এখন সংসারটা চালায় আার ছোট ভাই মিন্টু – সব দায়িত্ব ও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আমাকে বলে রেখেছে, “কোনো চিন্তা ভাবনা নয়। তাড়াতাড়ি সুস্ব হয়ে ওঠো।“
হাসপাতাল থেকে বাসা ফেবার সময় – সেই সাত বছর আগেই বলেছিল। আমিও তা-ই বিশ্বাস করেছিলাম। আজ সাত (এখন আট বছর) বছর পর মনে হচ্ছে ও আমাকে সান্তনা দিয়েছিল। সেই সান্তনার জোরেই এখনো বেঁচে আছি।

Leave a Reply