Image by Jens Neumann from Pixabay

মরণোত্তর

বারোটা পাজারো পাঁচ মিনিট আগে পরে এসে পৌছে গেল বেসরকারী হাসপাতালটার  পার্কিং লটে। ডাক্টার নিশ্চিন্ত হলেন। উনি ভারতের কর্ণাটকের মানুষ। ব্যাঙ্গালোরে প্রাকটিস শুরু করে আস্তে ধীরে ছড়িয়ে পড়েন গোটা ভারতে। শেষে দ্রুত বাংলাদেশের এই হাসপাতালে। মাসে দুই দিন। সিঙ্গাপুরে মাসে দু দিন তারপর লন্ডনে মাসে তিন দিন। মাসের বাকীটা সময় ভারতের চারটা রাজ্যে হুড়া হুড়ি। আজ রাতেই এখান থেকে সরাসরি সিঙ্গাপুর চলে যাবেন তাই সেও একটু তাড়ার মধ্যে।

সাখাওয়াৎ সাহেবের ঢাকার অনেক আত্মিীয় স্বজন চলে এসেছেন। ডাক্টার সস্তি পেলেন। মোর্শেদের সাথে ওর বউও গিয়ে বসলো চেম্বারে। ওদের সাথে আগে থেকেই ডাক্টার রুগী সম্পর্ক্য। ওর স্ত্রী তাহমিনা বরিশালের মেয়ে। স্বামীর ভাগ্যে তার আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ।

মোর্শেদ একেবারে ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা বাণিজ্য নিয়েই খেলাধুলা করতে পছন্দ করতো। সিক্সে থাকতেই, সে সময়কার দু টাকার আচার কিনে দশ ভাগে ভাগ করে কাগজে মুড়ে মুড়ে চার-আনা দরে বেঁচে, আট আনা লাভ করতো। তবে ওর ব্যবসায়ি বুদ্ধি কিছুতেই লেখাপড়া ঢোকেনি। ওর ডক্টোরেট বাবা বুঝে ফেলেছিল ওকে দিয়ে আর হবে না। ঐ ফাইভ পাশই শেষ। বিয়ের আগে থেকেই তার সেই আচার ব্যবসার আইডিয়াটা বড় হয়ে ফুড ইন্ডাট্রিজেতে গিয়ে ঠেকে। তবে গাড়ি বাড়ি করবার মত সবটুকু উন্নতি,  বিয়ের পর। তাই তাহমিনার বিস্বাস সতীর ভাগ্যেই পতির ভাগ্য। তাহমিনার এক শত বিশ কেজি ওজনের শরীরটার সাথে সাথে তার উন্নাশিকতাও বেড়েই চলেছে।

ডাক্টার পুরুষুত্তম একদিন বলেছিলেন, ভাবী সাহাব কুছ চিন্তা নাহি লন্ডনে আসেন এক হপ্তার মুধ্যে আপনের উজন কমিয়ে যাইবে, ইন্সাল্লা। ডাক্টার সাহেব এ দেশে—মানে ঢাকায় আসতে আসতে শিখে ফেলেছেন, আশা ভরসা দেওয়া বক্যের শেষে ইন্সাল্লা বলা মাস্ট আর এই লোক গুলোই  এ দেশের মালদার পার্টি।

এরা লন্ডনে গিয়েও চিকিৎসা করাতে পারে, কেউ এটা ভাবছে,  তাহমিনার এটা শুনতেও ভালো লাগে। আত্মিীয় স্বজনদের কেউ এ কথা বললে অবশ্য তাহমিনা অবহেলার ভঙ্গিতে বলতো, না ভাই আমার কি আর সেই কপাল! ইতিমধ্যে দু‘ দু‘ বার থাইল্যান্ডে গিয়ে ডায়াবেটিকের চিকিৎসা করিয়ে এসেছে।  সে সূত্র টানলে তাহমিনার সাফ উত্তর, আপমান মোর্শেদ ভাই যায় মজা মারতে, আমাকে নিয়ে যায়তো লোক দেখানো! মোর্শেদকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, ওর আগে লন্ডনে ট্রিটমেন্ট করানোর মতো রোগ হোক, নিয়ে যাবো লন্ডনে।

ডাক্টার পুরুষুত্তম, মাঝ বয়সি সুঠাম শরীরের মাঝারি উচ্চতার একহারা চেহারার মানুষ। চেহারা দেখে এ সব মানুষের বয়স বোঝা যায় না। সাদা ফ্রেঞ্চ কাট দাড়িতে তাকে অভিজ্ঞ মনে হলেও বয়স্ক মনে হয় না। ঢাকা থেকে কলিকাতাগামী প্লেনে মোর্শেদের সাথে তার পরিচয়। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল মোর্শেদের একজন বন্ধু, কলিকাতাবাসী বাংলা সিনেমার পরিচালক, বিমল নাগ। বলেছিল, আরে ডাক্টার সাহেবতো শুধু ডাক্টার নয় উনি দেবতা, দেখছেন না দেবতাদের মতই ওনার যাতায়াত বিশ্বের সর্বত্র!

ডাক্টার এসে ঢুকলেন তার চেম্বারে। সেখানে আগে থেকেই বসে অপেক্ষা করছে সস্ত্রীক মোর্শেদ জামিল চৌধুরি। আজ আর সালাম বিনিময়ের মেজাজে নেই মোর্শেদের। আগা গোড়া সাদা পোশাক, একটা সাদা টাওয়েলে হাত মুছতে মুছতে ডাক্টার সাহেব তাহমিনার দিকে ঈসৎ মাথা দুলিয়ে হাসলেন ছোট্ট করে। তাহমিনার দেহ মনে তখন ষোল বছর বয়সি একটা বালিকা খিল খিল করে উঠলো, বাইরে সেও ছোট্ট করেই হাসে। মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে ডাক্টার মুখটা কাচু মাচু করে বললেন, “সরি মুরশাদ ভাইয়া,…“ ডাক্টারের কথা ডাক্টারের মুখেই থেকে গেল। তাহমিনা আৎকে উঠে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে ওঠে, “সাখোয়াত ভাইজান আর নেই?“

ডাক্টারের ঢাকার এ্যসিস্টেন্ট, গোলাম রব্বানী, এম বি বি এস শেষে সরকারী ঝামেলা চুকিয়ে এসে পড়েছে এখানে। সে বলে উঠলো, “ না না এখনো মরেন নি, তবে স্যারে বলতে চাইছেন এ ভাবে বাঁচিয়ে রাখা যাবো হয়তো আরো কিছু দিন আল্লাহ যদি চান। তবে তাতে কোন লাভ হবে না।“

“রোগীর রোগ সারেইন্না আপনাগো কাম, এতে আবার লাভ লসের কি আছে?“ মোর্শেদ বললো জোর গলায়।

ডাক্টার সাহেব জানেন ওর গলার শব্দে জোর বেশী, কারন ওর টাকা পয়সাও বেশী। ডাক্টার পুরুষুত্তম, দেশ বিদেশে তার পসার, মানুষ চিন্তে তেমন কষ্ট হয় না। উনি কর্নটকি টানে হিন্দি-ইংরাজী-বাংলা মিলিয়ে মিশিয়ে যা বললেন তার মানে:  এভাবে ওনাকে বাঁচিয়ে রাখলে প্রতিদিন অনেক খরচ…. মোর্শেদ হালকা গলায় কেশে তাহমিনাকে বললো, “যাও তুমি বাইরে গিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে বল, আল্লাহর কাছে দোয়া চাইতে, এখন আর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। ডাক্টার সাহেব জবাব দিয়ে দিয়েছেন।“

তাহমিনা বশংবদ মানুষের মতই উঠে চলে গেল বাইরে। ও বুঝতে পেরেছে এখন আর  এখানে বসে থাকাটা ওর স্বামী চায় না। রোগীর আসল খবর, ভালো মন্দ কিছুই তেমন জানা হলো না। এমনিতে কোন কিছুতেই আগ্রহের অভাব নেই তাহমিনার। তবে স্বামীর সাথে বিতর্কের বিষয় সামনে এসে পড়লে ও লেজ গুটিয়ে ফেলে। কারন ও জানে শত চেষ্টাতেও এখন আর ও রাগ করে বাপের বাড়ির সেই একতলা বিল্ডিংয়ের পাখার নিচে একটা রাতও কাটাতে পারবে না। ও মোটা চাউল খেয়ে, মোটা কাপড় পরে ঐ বাড়িতেই মানুষ। কিন্তু এখন আর চিকন চাল, ফিনফিনে কাপড় আর এসির বাতাস ছাড়া টিকতেই পারে না।

স্বামীর সাথে রাগই করা যাবে না যখন তখন আর তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে ঝগড়া করেই বা লাভ কি।

ডাক্টার পুরুষুত্তম এবং তার ঢাকার  সহকারি গোলাম রব্বানী দু‘ জনই গম্ভির ও অবাক। রব্বানী থাকতে না পেরে জানতে চাইলো, “স্যারতো এখনো কিছুই বলেননি, আপনি বুঝলেন কি ভাবে!“ জবাবে মোর্শেদ বললো, “শোনেন স্যার, যারা বেশী কথা কয়, তারা বেশী কথা শুনতে পছন্দ করে না।অল্প কথায় অনেক বুইঝা ফেলে। “

বাইরে বেরিয়ে অপেক্ষারত আরো এগারোটা পাজারোর পরিবার পরিজনকে সামাল দেওয়ার জন্য তাহমিনা সবাইকে বলে দিল। দোয়া করো সবাই।

হাসপাতালের নীচতলায় অনেকখানি জায়গা জুড়ে অনেক লোক বসতে পারে এমন একটা ওয়েটিং লাউন্স, সাথে রিসিপসন, নীচ তলায়ে ভেতরের কাঁচের গেটটা পেরোলেই সব ডাক্টারের চেম্বার। উপরের দুই, তিন, চার, পাঁচ তলায়  সব রুগীদের কেবিন, ওটি, ল্যাব আরো সব কী কী। নিচের লাউন্সে খুবই বিজ্ঞাণসম্মত উপায়ে রুগীর লোকজনদের আটকে রাখা; রিসিপসন না পেরলে ভেতরের কাঁচের সিংহদ্বারে পৌছানো না গেলে উপরের লিফ্ট, সিঁড়ি বা কোন ডাক্টারের নাগাল পাওয়া যাবে না।

সেই লাউন্সে বসে থাকা রোগীদের লোকজনেরা ভাবছে, আহারে, যার এমন পাজারোওয়ালা বারোটা আত্মিয়  ঢাকায় সেতো এমন ঝট করে মরতে পারে না। চিন্তাটা এসেছিল কুমিল্লা থেকে আসা মোতালেব মুন্সির ছেলে জামালের মাথায়। ডাক্টার ওকে ওর বাপের জটিল রোগোর কথা ইংরাজি আর বাংলা মিশ্রণে বুঝিয়ে বুঝিয়ে বলে দিল। রিসিপসনে কাগজপত্র দেখে বলে দিল এক দেড় লাখ টাকা লাগতে পারে। জামালের মেজাজ গেল খারাপ হয়ে। এত সুন্দর সুন্দর ডাক্টার, তাদের মুখের কথা শুনলেও রোগ অর্ধ্যেক ভালো হয়ে যায়; আর এই অফিসের লোকজন এমন জল্লাদ কেন! 

জামাল বসে বসে মনে মনে হিসাব কসছিল ওদের কোন জমির দাম এখন কত করে শতক। একবার কুমিল্লায় ওদের পাড়ার জমির দালাল মজ্নুর মোবাইলে ফোন করে জেনে নিল , ওদের ভিটের দক্ষিণ দিকের ধানি জমির এখন দর কত? এমন সময় আসলো বারোটা পাজারো।

মোর্শেদ ডাক্টারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে সবাইকে এক পাশে ডেকে নিয়ে গেল সাথের ক্যাফেটরিয়ায় কফি খেতে। বিশ পঁচিশজন  যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান পুরুষ মহিলা সমস্ত ক্যাফেটরিয়া জুড়ে। মোর্শেদ বলে দিল যার যা ইচ্ছা  খাও। এই ভাবে সচরাচর সবার এক সাথে দেখা হয় না। এই ভিড়ে ওর দুটো আপন বড় ভাই আর একজন আপন ছোট ভাই ও তাদের স্ত্রীও আছেন। সবার দিকে তাকিয়ে বললো, “হবায় খাইতে বইসি, হালায় ফোনটা গেল। আর খাইতে পারলাম না।“ ছোট ভাইয়ের বউয়ের দিকে তাকিয়ে বাকী কথাটা বললো, “তোমাদের ফোন কইরা রওনা দিলাম।“

ক্যাফেটোরিয়ার লোকটাকে বললো “ও ভাই আমারে একটা বার্গার দিয়েন।“ বউকে বললো, “তুমিওতো কিছু খাও নাই, তুমিও একটা বার্গার লও?“ তাহমিনা বললো, “না, আমি সেন্ডুইচ খাবো।“

এরা কেউই ঢাকাইয়া বংশদ্ভুদ নয়। দু এক পুরুষ ঢাকায়ে। দেশে বাড়ি এখনো বিভিন্ন জেলায়। কথার মধ্যে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে কিছু ঢাকাইয়া শব্দ এবং সুর ঢুকে পড়েছে। খেতে খেতে মোর্শেদ বললো, “কথা হইলোগা অহন,“ সবাই চুপ। সবার মুখে কিছু না কিছু খাবার, তবে তা শব্দবদ্ধ অনড়। মোর্শেদ বার্গারে আর একটা কামড় দিয়ে বললো, “ সাখোয়াত ভাই অহনো মরার মত বাইচা আছে। এই অবস্থা থাইক্যা ফিইরা আইবো এমন কোন আশা নাই। শরীলের সব কলকব্জা বন্ধ হইয়া গেছে।“ মোর্শেদ একটু থেমে বললো, “আমারে একটা কোক-ফান্টা যাহোক কিছু দাওরে ভাই, গলা হুকায় গ্যাসে।“ আবার সবার দিকে তাকিয়ে নেতৃত্বের কন্ঠে বললো, “ব্রেনতো আগেই গেছেগা, লিভার লুভারও সব গেছে, ধুক পুক কইরা চলতাসে কইলজাটা, হার্ট হার্ট। ওটা পাঁচ মিনিটেই যাইবারগা পারে আবার পাঁচ বছরও এই ভাবে পইড়া থাকতে পারে।“

“এহানে খরচ অনেক, অহন আর কোথাও সরামু তেমন অবস্থায়ও নাই।“  মোর্শেদের ছোট বোনের স্বামী বলে উঠলো, “এখানে আনাটাই ভুল হয়েছে, সাখাওয়াৎ ভাইজানের অবস্থাতো তেমন ভালো না।“ সাখাওয়াৎ সাহেব মোর্শেদের ছোট চাচার বড় ছেলে। গ্রামে এখনো এক ভিটায় বাড়ি।

“ভাইজানের রিটায়ার্ডমেন্টের পর আমিই ডাইক্কা আমার অফিসে চাকরি দিয়াদিই। আমার আপন চাচার পোলা, মাইনষের কাছে চাকরী চাইয়া বেড়াইবো, হুনতে ভালো হুনায় না। তাই…“ মোর্শেদ থামে। কোকে আর এক ঢোক দিয়ে শান্তির এক ঢেকুর তোলে। “হালায়, আমেরিকায় গেছি ভাই, ওহানে আপনি মেট্রোর মধ্যে পাদ দ্যোন কেউ কিছু মনে করবো না, হালায় ঢেকুর তোলেন, মনে হইবো যেন হাইগা দিছেন। হক্কোলা এমন কইরা তাকাইবো, আর মুখটা যা করবো না, মনে হইবো মাটি ফাঁক হইয়া গেলে আপনি হান্দাইয়া যাইতেন।“

ছোট বোনের স্বামীর দিকে তাকিয়ে মোর্শেদ বোঝে ওর উত্তর দেওয়া শেষ হয়নি, “পরশু দিন হঠাস কইরা পইড়া গেল অফিসের টেবিলে। স্টাফরা ধরা ধরি কইরা লইয়া আইলো। আমার বড় ভাইয়ে স্টোক করসে, তারে আমার স্টাফরা নিবো কোনহানে? সরকারী হাসপাতালে নাকি এহানে?“

এতক্ষনে একটা সি এন জি অটো রিক্সায় এসে লাউন্সে ঢুকলো সাখাওয়াৎ সাহেবের একমাত্র ছেলে বকুল আর ওর মা, সাখোয়াতের স্ত্রী। সবাই ওদের দেখে এগিয়ে এলো। বকুলের মা মোর্শেদকে দেখে কেঁদে কেঁটে অস্থির। সবাই অনেক ভাবে বেঝায়, তবে মোর্শেদের মুখের এক সান্তনায় সে সন্টুষ্ট। এতক্ষণ যারা মোর্শেদ সাহেবের সন্টুষ্টির জন্য খবর পাওয়র সাথে সাথে এগারোটা পাজারো ভরে হাসপাতালে এসে উপস্থিত হয়েছেন তারা একে একে প্রায় সবাই সাখোয়াৎ সাহেবের পরিবারকে বিভিন্ন কথায় সান্তনা দিল। সবাই জানে সিন্ধান্ত দেওয়ার কাজ মোর্শেদের।

মোর্শেদ বকুলকে এক পাশে নিয়ে গিয়ে ডাক্টারের বলা সমস্ত কথাই বুঝিয়ে বললো। বকুল সব শুনে থ। এ কোন অবস্থা?

বকুল বললো, “চাচা, আমাদের বাড়ীটা আপনি কিনবেন?“

মোর্শেদ হতচকিৎ, বললো, “না, এখানে এখন পর্যন্ত যা খরচ হয়েছে আমিই দেবো। সে সব চিন্তা করো না। আমি বলছিলাম পরেতো আরো অনেক খরচ আছে, তোমাদের সংসার আছে!“

বকুল বললো, “চাচা, আমার আব্বা আমাদের অনেক কষ্টে শিষ্টে এত দিন বাঁচিয়ে রেখেছে, যতদিন সম্ভব আমিও আমার আব্বাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।“