Image by Alemko Coksa from Pixabay

বাতাসে বারুদের গন্ধ


অন্তু (২১/২২) ওর ক্রিকেট ব্যাটটা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
রাতে স্বপ্ন দেখে ওর আব্বা (৪৬) ওকে প্রশ্ন করছে। “বাংলায় কত?”
অন্তু মার্কশীটা সামনে ধরে দেখে বলে, “এ”
“ইংরাজীতে?”
“এ”
“অংকে”
“এ প্লাস”
এর মধ্যে ওর মামা (৩০/৩৫) এসে ঢুকলো হই হই করে। তার হাতে একটা ব্যাট।
অন্তু খোলা খেলার মাঠে নতুন ব্যাটটা দিয়ে জোরে একটা ছক্কা মারলে।
মনে হয় যেন টেনিস বলটা আকাশে সূর্যের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।
খেলার মাঠে অন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলটা দেখবার চেষ্টা করছে।
অন্যান্য কয়েকটা খেলোয়াড় ছেলে বলটা দেখার চেষ্টা করছে।
বলটা যেন আকাশে মিশে গেছে।

স্কুলের পোশাকে অন্তু। পিঠি ব্যাগ। স্কুল থেকে ফিরছে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে থেমে হাতে ধরা অদৃশ্য ব্যাটটা দিয়ে ফাস্ট ফুট ডাইভ দেয়।
ঠিক হলো না। আরো একবার।
আরো একবার।
এবার স্কয়ার কাট।
আবার ছক্কা।
ঘরে অন্তুর মা জোর করে ওর গালে ভাত তুলে খাইয়ে দেয়।
অন্তু বাইরে যাবার জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে
ওর মা (৪০/৪২) বকা ঝকা দিয়ে আরো এক গাল ভাত খাইয়ে দেয়।
অন্তু গালে ভাত নিয়ে দৌড়ে ওর পড়ার টেবিলের কাছে যায়। টেবিলের পেছন থেকে ব্যাড টেনে বের করে। তোষকের তলা থেকে টেনিষ বল টেনে বের করে। দৌড় মেরে চলে যায় বাইরে।

খাঁ খাঁ রোদের মধ্যে মাঠ পড়ে আছে ফাঁকা।
অন্তু মাঠে দাঁড়িয়ে চারি দিকে তাকায়।
কেউ কোথাও নেই।
দূরে একা বিল্ডিংয়ের ছায়ার নিচে বসে সগির (২৫/৩০), শান্ত (২৫/৩০), রফিক (২৫/৩০)— বসে বসে সিগারেট খাচ্ছে।
শান্ত ঈসারায় অন্তুকে ডাকে।
অন্তু আস্তে আস্তে দৌড়ে ওদের কাছে আসে।
শান্ত: তোর নাম কীরে:
অন্তু: অন্তু
সগির: আমির ভাইদের তিন তালায় থাকস না?
অন্তু: হ্যা
ডিজলড, মানে কয়েক দিন পর।
হাতে একটা ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আসে অন্তু।
একটা বন্ধ দোকানের সামনে শান্তরা বসে। অন্তু ঠান্ডা পানির বোতলটা এনে ওদের হাতে দেয়। ও হাঁফায়।
শান্ত, সগির, রফিক বোতলে চুমুক দিয়ে পানি খায়। পরে অন্তুর হাতে দেয় বোতলটা।
রফিক: ঠান্ড পানি মুখে দে, ভালো লাগবে!
শান্ত: এমন দৌড়ায় দৌড়ায় আইস কেন, বলদ।
সগির: তোর মায় জিগায় নাই, পানি কেডা খাইবো?
অন্তু: (হাঁপাতে হাঁপাতে বলে) হ্যা জীজ্ঞাসা করে ছিল।
রফিক: কী কইসোস?
অন্তু: বলেছি পাড়ার বড় ভাইরা খাবে!

ফাঁকা একটা মাঠ। অন্তু মহা আনন্দে মটর-সাইকেলে মাঠটা চক্কর দিচ্ছে। শান্ত আর একটা ছেলে বসে কথা বলছে মাঠে।
অন্তু আরো তিনটে চক্কর দিয়ে এসে থামে ওদের কাছে।
শারÍ: এইতো তুই ভালোই চালাইতে পারস। তোর বাপেরে ক একটা পালসার কিনে দিতে।
অন্তু মুখ চেপে হাসে।
শান্ত: কীরে হাসস ক্যা?
অন্তু: আব্বা নিজেই মটর-সাইকেল ভয় পায়।
শান্তা: আচ্ছা লাগবো না, লাগবো না। আমার গাড়ি মানে তোরও গাড়ি। যা, যখন মনে লয় লইয়া ঘুইরা র্ফিরা আহিস, যা।
অন্তু ভাবাবেগে গদ গদ হয়ে ওঠে।

দোতলা, বারান্দা, ছেলেদের খেলাধুলার হৈচেয়ের শব্দ ভেসে আসছে। ঘরের ভিতর থেকে রোকসানা (১৮) এসে একটা জামা মেলে দেয় কাপড় শুকোতে দেওয়া টাঙ্গানো দড়িতে। তারপর সেখানে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে চেয়ে থাকে বিভোর হয়ে।
নিচে, মাঠে অন্তু আর ওর কিছু বন্ধু (২০/২৫) ক্রিকেট খেলছে। অন্তু বল করলো।
উইকেটের সামনে ব্যাড হাতে ছেলেটা বলটা খেলে ঠেকালো। টেনিস বল গড়িয়ে গড়িয়ে দূরে চলে যাচ্ছে।
একজন বলটা দৌড়ে গিয়ে আটকালো।
খেলোয়াড় দুটো ছেলে তালি দিয়ে উঠলো
অন্তু আবারো বল করে।
আগের ছেলেটা আবারে ব্যাট চালালো।
এবার বলটা গিয়ে লাগলো দোতলার বারান্দায় মেয়েটার পেছনের দেয়ালে। মেয়েটা চমকে ওঠে। তাকায় অন্তুর দিকে।
অন্তুও উপরের দিকে তাকিয়ে মেয়েটার দিকে।
মেয়েটা বল তুলে নিয়ে ছুড়ে দেয় অন্তুর দিকে।
অন্তু লুফে নেয় বলটা।
মেয়েটা হেসে ওঠে, বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে উৎসাহ যোগায়।

শান্তদের ড্রয়িং রুমে অন্তুর সাথে কথা বলতে বলতে ঢোকে শান্ত।
শান্ত: তোগো কলেজে ইলেকসন?
অন্তু: হ্যা।
শান্ত: তুই কোন দলে?
অন্তু: [হাসে] আমি … কোনো দলে নাই। তুমি কোন দলে ভাইয়া?
শান্ত: ইলেকসনের দিন আর তার আগে পরে দুই দিন দুই দিন, কলেজে যায়িস না।
অন্তু: কেন ভাইয়া?
শান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকে অন্তু দিকে।
অন্তু: সরি — ভাইয়া
শান্ত: কহনো কাউরে কইবিনা তুই কোনো দল করস না। কোনো মিটিং মিছিলে যাবি না, আমার সাথে সাথে চলস, মাইনষে যা বোঝোনের বুইঝা লইবো।
অন্তু: আচ্ছা, ভাইয়া।
শান্ত ঘরে পুরানো দিনের গদিওয়ালা কাপড়ের সোফা, গদির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা পিস্তল বের করে। দেখায় অন্তুকে
শান্ত: অš,‘ আমি নিজেই একখান পাওয়ার, এটা যার কাছে থাকে হেই পাওয়ার। এইনে ধর …
শান্ত জোর করে অন্তুর হাতে দেয় পিস্তলটা।
শান্ত: … হাতে নিয়া দেখ শরীলে কেমন বল আইসা পড়ে।
অন্তু হাতে পিস্তলটা নেয় ওজন করার মত। ওর হাত কাঁপছে।
শান্ত: কী হইলো মদ্দ পোলা এত ডরাস ক্যান
কথাগুলো শান্ত কানে শুনতে পাচ্ছে; ও এবার ধীরে ধীরে পিস্তলটা ঘুরিয়ে ধরে গুলি করার ভঙ্গিতে। ওর হাত কাঁপছে।

অন্ধকার। একটা পিস্তলের মুখ এ দিকে। ওটা কার হাতে, তা দেখা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে পিস্তল ধরা হাতটা খুবই আস্তে আস্তে ট্রিগারে চাপ দিচ্ছে।
অতর্কিতে গুলির শব্দ হয়।
বিছানায় ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠে অন্তু।
রাতে অন্তুর মা বসে টিভি দেখছিল।
অন্তু এসে তার পাশে বসে।
টিভি দেখে।
অন্তু অস্তে আস্তে মাথা ঘুরিয়ে ওর মায়ের দিকে তাকায়। তাকিয়ে থাকে। একদৃষ্টিতেতাকিয়েই আছে। টেলিভিশনের রঙ্গিন আলোর ছটা ওদের চেহারায় খেলছে।
মা: [ওর দিকে না তাকিয়ে] ঘুমোসনি এখনো।
অন্তু: ঘুম আসছে না মা।
মা: আমাকে কিছু বলবি?
অন্তু: কী?
মা: যা কাউকে বলতে পারছিস না
অন্তু: [মাথা নামিয়ে ফেলে] নাহ।
অন্তুর মা ওর দিকে তাকায়।

মাঠের পাশের দোতলা বারান্দায় সেই মেয়েটা।
অন্তু ব্যাট করছে। বল আসে। অন্তু ছক্কা মারে।
বারান্দায় মেয়েটা হাত তালি দিয়ে ওঠে।
অন্তু ওকে দেখে মুচকি হাসে।
অপর দিকে উইকেটের কাছে একটা ছেলে বল লুফে ধরে নিয়ে আবারো বল করার জন্য যায়। দৌড়ে এসে বল করে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেয়েটা খেলা দেখছে।
মটর-সাইকেল চালিয়ে শান্ত আসে মাঠের পাশে।
শান্ত মটর-সাইকেল থেকে নেমে হাতের ঈসারায় ডাকে শান্তকে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেয়েটা বিরক্ত হয়। ও দেখছে ওদের।
দূরে শান্ত অন্তুর সাথে কী সব কথা বার্তা শেষ করে, অন্তুর হাতে মটর সাইকেলটা দিয়ে নিজে একটা রিক্সা থামিয়ে তাতে উঠে চলে যায়।
মেয়েটা বারান্দা থেকে দেখছে।
অন্তু মটর-সাইকেলটা চালিয়ে নিয়ে মাঠের মধ্যে চক্কর দেয়। ওর খেলার সাথিরা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে ওকে ঘিরে ধরে।
মেয়েটা বারান্দা থেকে দেখছে।

একটা সিড়ির নিচে মটর-সাইকেলটা রাখা।
অন্তু নিজের ঘরে ঢোকে, বিছানার তোষকটা এক কোনে তুলে মটর-সাইকেলের চাবিটা রাখে। ও চলে যায় ঘরের বাইরে শব্দ শোনা যায়।
১০
কোনো পার্কের একটা পুকুরের সামনে নীল একটা গার্ডেন বেঞ্চে বসে অন্তু আর মেয়েটা গল্প করছে।
মেয়েটা: যারা তোমার মত নয় তাদের সাথে তুমি মিশবে কেন?
অন্তু: ইচ্ছা না থাকলেও সমাজে অনেকের সাথে মিশতে হয়।
মেয়েটা: ওরা সমাজের নষ্ট মানুষ! ওদের নিজেদের একটা সমাজ আছে আমাদের সমাজ থেকে আলাদা এবং গোপন।
কথা শুনে অন্তু অবাক হয়। মেয়েটা কথা বলতেই থাকে।
মেয়েটা: ওরা চায় আমাদের ভালো ভালো ছেলে- মেয়েরা ওদের সমাাজে ঢুকুক, তাই ওরা প্রচুর প্রলোভন দেখায়। আর আমরা চাই যেন ওরা আমাদের সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
অন্তু: কেনো এমন মারামারি?
মেয়েটা: মারামারি না, এটা আত্মরক্ষা। অসুখ হলে আমরা ইঞ্জেকসননি। রোগীকে মারবার জন্য নয়, রোগটা মারার জন্য।
অন্তু: আচ্ছা আমরা কি এখানে প্রেম করতে এসেছি নাকি সমাজ শুধরাতে এসেছি? [অন্তু হাসে]
মেয়েটা: নষ্ট, অসামাজিক মানুষদের কবল থেকে প্রেমিককে বাঁচানোটাও কি প্রেমের অংশ নয়।
১১
অন্তু আর ওর মামা সিড়িতে নামতে নামতে কথা বলছে
অন্তু: মামা, অসামাজিক মানুষ কারা?
মামা: যারা সমাজে অশান্তি ছড়ায়। নিজেদের স্বার্থে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবন ধারনে বাঁধার সৃষ্টি করে।
অন্তু: এদের চিনবো কিভাবে?
মামা: প্রতিটা পাড়া মহল্লায় এরা খারাপ হিসাবেই চিহ্ণিত। চোখ কান খোলা রাখো —সমাজই বলে দেবে কারা অসামাজিম।
ওর মামা নেমে চলে যায়। অন্তু দাঁড়িয়ে থাকে।
১২
খেলার মাঠে। অন্তু ফিলডিং দিচ্ছে।
একটা সাইকেলে করে একটা ছেলে আসে মাঠের পাশে, অন্তুর পেছনে। সে ডাকে অন্তুকে বেল বাজিয়ে।
মেয়েটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে, হাসি খুশি খেলা দেখছে
মেয়েটা দেখছে। দূরে মাঠের পাশে অন্তু আর ছেলেটা কী কথা বলছে। ছেলেটা একটা খাম দেয় অন্তুকে। অন্তু ওর কথাশুনে পকেটে রাখে খামটা।
মেয়েটার আনন্দঘন চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
১৩
একটা আন্ডার-কন্সট্রাকসন বিল্ডিংয়ের সিড়ি।
অন্তু উঠছে সেই সিড়ি দিয়ে ওপরে।
অন্তু দেখছে, সিড়ি, সিড়ির খর তৈরি হতে থাকা বাড়ির বিভিন্ন নির্মানিিধন অংশ, সে উপরে ওঠে। চারিদিকে দেখে কাকে যেন খোঁজে।
অন্তু শান্তদের সেই ড্রয়িংরুমে, সেই সোফায় বসে এক গøাাস পানি খাচ্ছে। আমরা ওর সামনে কাউকে দেখিন\ অন্তু ফ্রেমে বাইরে কার সাথে যেন কথা বলে:
১৪
অন্তুর অন্ধকার প্রায় কামরা।
অন্তু বিছানার তোষকের কোনা তুলে খামটা বের করে
খামের মধ্যে কিছু ইয়াবা ট্যাবলেট,
অন্তু দেখে ভালো করে। আতকে ওঠে। বাইরে পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ ভীষন ওভয়ংকর ভাবে শব্দ তোলে ওর দিকেই আসছে
অন্তু ছট ফট করে নিজের ঘরের মধ্যে
ওগুলো লুকিয়ে রাখবার জন্য এ দিক সে দিক ছোটা ছুটি করে।
বাইরে দরজায় জোর জোর টোকা পড়ে।
অন্তু নিজের কামরার মধ্যে ছট ফট করে
বাইরে ওর বাবার কন্ঠ শোনা যায়: কে?
বাইরে থেকে ভারিকন্ঠ ভেসে আসে: পুলিশ, দরজা খোলেন ।
অন্তু ছুটে গিয়ে নিজের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়।
১৫

অতর্কিতে সাইকেলের বেলের আওয়াজ বেজে ওঠে খুব জোরে
বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেয়েটা নিরানন্দে খেলা দেখছে।
কোনো শব্দ নেই, মাঠে খেলছে সবাই অন্তু নেই।
বারান্দায় মেয়েটা চারি দিকে কাকে যেন খোঁজে। শেষে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ঘরের ভেতরে চলে যায়।
ফাঁকা বারান্দা।
নিজেরা সতর্ক হোন, সন্তানকে সতর্ক থাকতে শেখান