Image by Markus Spiske from Pixabay

পরীক্ষা

কাল পরীক্ষা, অতএব, সারাটা দুপুর-বিকেল ঘুমিয়ে, সন্ধ্যায় একটা সিদ্ধ ডিম, গরুর খাটি দুধ এক গ্লাস, দুটো বড় কলা আর দুটো বাগরখানি খেয়ে পড়তে বসে তৃণা। আবারো রাজ্যের ঘুম এসে জোটে চোখে। খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে তৃণা সর্বদাই পুরুষ আর ঘুমের ব্যাপারে ষোল আনা যুবতী।

যে কোন সময় একটু ঘুমিয়ে নেওয়া আর ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ করা ওর মজ্জায় এসেছে ওর মায়ের জীন থেকে। হালকা খাবার হিসাবে ফার্স্ট ফুড খাবার উপায় থাকলে যখন তখন খিদে পাওয়াটা মজ্জায় এসেছে বাপের দিক দিয়ে। তিন ভাই বোনের মধ্যে ও বড়, তিনজনের একই ধরণ।

ধূসর যে দিন বললো, আমার একটু স্বাস্থ্যবান বউই পছন্দ। তৃনা বলে, বউ না, বল পাত্রী। ধূসর বাতাসে গাঁ ভাসিয়ে উত্তর দেয়, আমারতো পাত্রীই দরকার তবে কারো বউ হলেও তেমন কোন আপত্তি নেই। সবাই হেসে ওঠে শুধু তৃনাই বিরক্ত হয়ে বলে, একটু স্বাস্থবান! হোয়াট ডু ইউ মিন। জাবির মুক্ত মঞ্চে বসে ছ’জন বন্ধুই বুঝেছিল তৃণার এমন খেকিয়ে ওঠবার কারণ। সে আরো তিন বছর আগের কথা। ধূসর গম্ভীর গলায় বলে, না, নো এক্সট্রা ফ্যাট তবে হাগ করলে যাতে ভরাট ভরাট মনে হয়।

তৃণার শরীরে আরো একটু মাংসের প্রয়োজন, খিদে বাড়লো।

খাদ্য রসিক তাকে বলা যাবে না, কারণ, খাদ্যের মূল্য ও চর্বী জাতীয় উপাদান বিচার করে সে খাদ্যের মান বিচার করে। অর্থাৎ বেশী দামী খাদ্য আর বেশী চিনি-চর্বী ওয়ালা খাদ্যই, ওর মতে উত্তম খাদ্য।

তবু গত তিন বছরে ও নিজের ওজন সাতচল্লিশ কেজি থেকে বাড়িয়ে সাড়ে সাতচল্লিশ করতে পারছে না।

ধূসরকেও আর কোন মতে মনের ইচ্ছাটা বোঝানো যাচ্ছে না।

তৃণা চাইছিল হোস্টেলে  বন্ধুদের সাথে থেকে পরীক্ষাটা দিতে। বাহা উদ্দিন প্রথমেই মেয়ের সাহস দেখে রেগে আগুন। সাথী, তৃণার মা কমিনিউকেশন গ্যাপ বা যোগাযোগের গাড্ডাটা টের পেয়ে ও ঘরে গিয়ে স্বামীকে বোঝালো, বন্ধু মানে বান্ধবী, আজকালকার ছেলে মেয়েরা ছেলে বন্ধু আর মে‘বন্ধুর মধ্যে কোন ভেদাভেদ করে না।সবই বন্ধু আর ছেলে-বন্ধু বা মেয়ে-বন্ধু মানে এখন প্রেমীক প্রেমিকা।

বাহা উদ্দিন বলে, বাড়ীর গাড়ীতে যাবে, গাড়ীতে আসবে, তুমিও সথে যাও!

গত এক দেড় বছর বাদশাই ওদের গাড়ী চালাচ্ছে। আস্তে ধীরে, গাড়ীর গাঁ বাঁচিয়ে। অটোমোবাইলের প্রাথমিক ইঞ্জিনিয়রিং-এ পটু। গাড়ীর যত্ন নেওয়ার ব্যাপারেও অসাধারন। গাড়ীকে ভালবাসতে জানে। যেন জন্মসূত্রেই ড্রাইভার!

বাদশার প্রথম দিনের পরিচয়ে, বাহা উদ্দিন বলে, ঢাকায় কোথায় থাকো?

–বংশাল।

–আর কে কে আছে?

–আব্বা হুজুর, আম্মা হুজুর আর একটা ছোট বোন আইএ পড়ে।

–এখন আর আইএ নেইরে পাগল, এইচএসসি হয়ে গেছে।

–জ্বী, এইচএসসি।

–পুরা নাম?

–জাহাঙ্গীর মিরজ্জা।

–কী! জাহাঙ্গীর মির্জা? বাব্বা।

জাহাঙ্গীর চোখে-মুখে হাসি ছড়িয়ে দেয়।

–তুমি কি আবার মোগল খান্দানের লোক। মির্জা পাইলা কই?

–আমাদের টাইটেল স্যার, আমার আব্বা হুজুরের নাম  মিরজ্জা বক্কর।

–তাহলেতো তোমাকে বাদশা জাহাঙ্গীর বলেই ডাকতে হবে!

জাহাঙ্গীর আবরো চোখে-মুখে হাসি ছড়িয়ে বলে, স্যার আমার ডাকনাম বাদশা।

সেই থেকে বাদশা ওদের গাড়ী চালায়।

সাথী বোঝে বাহার ওয়ার্ডার প্রথম কটা দিন মেনে চলতেই হবে। তারপর, কষ্টের কথা বলে, ওকেই যেতে বলতে হবে। ব্যাস! ওয়ার্ডার ক্যানসেল। বিয়ের বারো বছর আগ থেকেই ও বাহা উদ্দিনকে চেনে।

সাথী বাথরুমের শীতল সাদা ডিম্বাকৃতি টয়লেট প্যানে বসে, মুখো মুখি দেয়াল জুড়ে আয়না। বাহার খামক্ষেয়ালীপনা। বাথটাবের লাগোয়া দেয়ালে আয়না আর বাথটাবের সামনে প্লাস্টিকের অর্ধ-স্বচ্ছ পর্দা। বাহা এটাকে বলে সত্যবাদী দেয়াল।

সত্যবাদী দেয়ালে নিজেকে দেখতে দেখতে ভাবছিল, তৃণার বয়স একুশ। মানে ওদের বিয়েরও বয়স একুশ বছর। তারো বারো বছর আগে, মানে বোত্রিশ-তেত্রিশ বছর। ও তখন ক্লাশ এইটে আর বাহা বারোর ফাইনাল দেবে। মানে ও এখন আটচল্লিশ বা অরিজিনালী পঞ্চাশ।

সাথী খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে, ওর মুখে বা গলায় এখনো তেমন কোন ভাজ পড়েনি। বুকে বাঁধা টাওয়েলটা নামাতে নিজের কাছে নিজেরেই লজ্জ্বা লজ্জ্বা লাগে। তবু টাওয়েলটা বুক থেকে সরায়। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে না। মাথা নামিয়ে ফেলে। চোখে পড়ে পেটের নিচের দিকে হাজারো আকি বুকিঁ আঁকা সাদাটে চামড়া।

সাদা স্যামসাং ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনের সাদা রং সাথীর পছন্দ নয়। হাতে নিলে মনে হয় ছেলেদের হাত। আসলে সেটটা বাহার। বাহা নতুন সেট কিনে সাথীকে সেটটা গিফ্ট করেছে।

আটটার বাংলা খবরে জানা গেল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারনে পরীক্ষা এক সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে তৃণাদের। মুহূর্তের মধ্যে খবরটা ছড়িয়ে পড়লো নেটে নেটে। ফেসবুক তোলপাড়। কাল পরীক্ষাটা না হলে ছাত্রদের জীবন সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে। বাহা তার আমদানী-রফতানীকারক ব্যবসার অফিসে বসে ফোন করে খবরটা জানালো সাথীকে।‍

তৃণা ঘুমে কাদাঁ। ও এসবের টের পেল না কিছুই।  

রাতে যাতে ওকে ঘুম কাতর না করে ফেলতে পারে এ জন্য মাজেদাকে দিয়ে মাইক্রো ওভেনে ফ্রাইড রাইস গরম করে খেয়ে, মাজেদার বানানো এক কাপ গরম কফি নিয়ে বসলো গিয়ে পড়ার টেবিলে। সাথী মেয়ের কাছে এসে বললো, তোর মোবাইলে টুংটাং করে অনেক ম্যাসেজ আসছিল। দ্যাখ না কিসের?

–দরকার নেই।

–খুলেই দেখ না।

–তোমার এত ইন্টারেস্ট কেন!

–কাল তোদের পরীক্ষা হচ্ছে না।

তৃণার চটকা ঘুম ভেঙ্গে গেল ফটাস করে, কী বলছো তুমি! তিন দিন আগেও ও মনে করেছিল পরীক্ষাটা কয়েকটা দিন পিছিয়ে গেলে খুব ভাল হয়। এখন মন খারাপ লাগছে, ইস এত করে প্রিপারেশন নিলাম! মনে মনে আসলেই খারাপ লাগছে। তবে খবরটা কর্ণফাম হওয়া দরকার। প্রথমেই মনে পড়ে ধূসরের নাম।

ও জানে, মায়ের সামনে ফোন করলেই, যদি শোনে কোন ছেলে, তাহলেই সাথীর মাথা ঘুরতে শুরু করবে। কোন ছেলের সাথে কথা বলা বা চলা ফেরা করা মানেই যে প্রেম নয়, এ কথা আজো ওর অভিভাবকরা কিছুতেই বুঝতে চায় না।

তৃণা এক দিন সুযোগ করে মাকে বোঝাবার চেষ্টা করে, মা, আজকালকার দিনে  প্রেম-ভালবাসা এমন দূর্মুল্য যে তা জোগাড় করা অত সহজ নয়।  মেয়ের মুখে এইটুকু শুনে, সাথী হাপ ছেড়ে বাচঁলো। তবে পরের ধারনাটা ওর ঘুম কেড়ে নিল।

–আগেকার দিনে তবু শরীর-টরির দিলে একসময় বিবেক চাড়া দিয়ে উঠতো। আজকাল যাত্রা-নাটকের বিবেকের সাথে সাথে পোলাপানদের বিবেকও সব ‘আউট অফ ফ্যাশন’।

এরপর পর পর তিন দিন ভালো করে ঘুম হলো না সাথীর।  চতুর্থ দিন রাতে সাথী হঠাৎ চোখ মেলে ধরে বোঝে, সে আসলেই ভয় পেয়েছে তৃণার কথায়, প্রেম পাবার জন্য মেয়েটা আবার কোন বিবেকহীণ ছেলের সাথে …। ছেলেরা চিরকালই বিবেক হীন। 

বাহাকে নাক ডাকতে শুনে ভাবে, বিয়ের আগে এই মানুষটাই পাগল হয়ে যেত এক দিন দেখা না হলে। বিয়ের পর পরও  এই মানুষটা বাঘের মত ওৎ পেতে থাকত আকঁড়ে থাকবার জন্য। দুটো বাচ্চা হবার পর পরই সাথী বলেছিল, এবারএকটু সাবধান হও। এ যুগেতো কত কিছুর ব্যবস্থা আছে। বাহা ইঙ্গিতটা বুঝে বলেছিল, পলিথিনে মুড়ে রসগোল্লা খেতে কেমন লাগবে তোমার? কথাটা শুনে খারাপ লাগেনি সাথীর।

আরো কয়েক বছর গেল।  তারপর থেকে শুরু হলো এই বিছানায় পড়েই নাক ডাকা। বাহার নাক ডাকাকে নাসিকা গর্জন না বলে বলতে হবে ‘নাকের চাপা শব্দ’। তা সে শব্দে সাথী বিরক্তিবোধ করে না। তবে সাথী তখনও মাঝে মধ্যে বিভিন্ন কায়দায় বাহার ঘুম ভাঙ্গাতো। বাহাও সেই নিঃশব্দ আহ্বানের অর্থ টের পেত। আজকাল আর সাথীরও ইচ্ছে করে না ঘুম ভাঙ্গাতে। বাহাও রাতে গভির ঘুম দেয় বিবেকহীন মানুষের মতেই।

আজকের ঘুম ভাঙ্গার কারণ, একেবারেই ভিন্ন।

তৃণা খেয়ে দেয়ে মনযোগ দিয়ে পড়তে বসে জানলো কাল পরীক্ষা হচ্ছে না। খুব ইচ্ছা হল ধূসরের সাথে কথা বলবার সুযোগটা কাজে লাগাবে। সাথীর দিকে তৃণা তাকিয়ে দেখে সে ওর দিকে তাকিয়ে। অদ্ভুদ ধরনের অস্বস্তি। সাথী বলে, কী হলো,  একজন কাউকে ফোন করে সিওর হবিতো।

তৃণা রুকুকে ফোন করে পুরো ব্যপারটা জেনে নিয়ে অন্য আলাপ জুড়ে দিল। সাথী এতক্ষণে বুঝে ওঠে, ওদের বন্ধুদের আলাপের সময় কাছে থাকাটা ঠিক নয়। আজ থেকে বিশ কুড়ি বছর আগেও মা-বাবার কাছে এই মধ্যবৃত্তিয় মনোভাবে লজ্জ্বার কিছু ছিল না । আজকাল মা-বাবারা ছেলে মেয়েদের সামনে এমন ভাবে ছোট হতে পারে না।

সাথীদের কিশোরবেলা এমন কিছু ঐহিাসিক যুগের কথা নয়। তখন মোবাইল ফোনের ব্যাপার ছিল না ঠিক, তবে, সাথীদের খুলনা নিউজপ্রিন্টের কলোনীর কোয়ার্টারে ল্যান্ড ফোন একটা ছিল। মাসে দু’মাসে কখনো স্কুলের কোন বান্ধবী ফোন করলে বা তার কাছে এ ফোন করলে ওর মা বা বড় আপা কাছে এসে বসতো, পাহারাদারের মত। কথা কিছু আস্তে হলে মুখে কিছু না বলে ঈসারায় বলতো, ফিস ফিস করিস কেন ফিস ফিস কিসের?

সাখী জানে এখন সরে না গেলে মেয়ে এখনি বলে বসবে, প্লিজ, মা, এ বিট পারসোনাল। অর্থাৎ, তুমি বুঝতে চেয়েছিলে আমি কার সাথে আলাপ করি, জানিয়ে দিলাম, রুকুর সাথে কথা বলছি, এতেতো আর কোন আপত্তি থাকবার কথা নয়। ব্যাস এবার যাও।

পারসোনাল শব্দটা নিজের সন্তানের মুখে শুনতে হলে মা-বাপ ভীষণ একাকিত্ব বোধ করে। আর মা-বাবার সমস্যা, তারা কিছুতেই সন্তানকে একা রেখে নিরাপদ বোধ করে না। তৃণা জানে এসব, সব জানে তবু এ শুধু নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবার লড়াই; এখানে হারলে চলবে না। হোক সে মা তবু অন্য কারো মান বাঁচাতে গিয়ে নিজের নাক কাটতে দেওয়া যায় না।

ওর মায়ের কাছে এ সব যুক্তি তক্ক তবু চলে, কিন্তু বাবা? তার এক কথা, যতদিন দেখে শুনে বিয়ে না দিয়ে দিচ্ছি, লেখা পড়া করে উকিল ব্যারেস্টার হয়ে গেলেও লাভ নেই, তার কথা মতই চলতে হবে, ব্যাস।

খুব যে ছোটবেলার কথা তাও নয়, স্পষ্ট মনে আছে, তখনো ওরা খালিশপুরে দাদা-দাদির সাথেই, অন্যান্য ষোলজন চাচা-ফুপুরা সব এক বাড়ীতেই থাকে। ওরা আর অন্য দুই বড় চাচাদের, এক-একটা সংসারের জন্য  একটা করে কামরা । আর এক কামরা ছেলেদের, এক কামরা মেয়েদের। মোট মাট বিশ পচিশ জনার মধ্যবিত্ত সার্কাস দল। ওর দাদাজানও এ ভাবে সামন্ত প্রভুদের স্বরে কথা বলতন।

এখন সে সব ভাবলেও তৃণার গাঁ ঘিন ঘিন করে। মোটা মুটি মানব জাতীর জংগলবাস পর্বের পরের জীবন ব্যবস্থা। এক-এক কামরায় এক-এক সংসার। সেখানেই  তিন ভাই-বোনের জন্ম। রীতি মত অসভ্যের সভ্যতা। এখন ঢাকায় ভাড়ার ফ্ল্যাটের দু রুমে তিন ভাই-বোন, বাবা-মার এক রুম তার পরেও লিভিং, ডাইনিং আর কিচেন। ওর রুমে বসে চিৎকার না করলে বাবার রুমে শব্দ পৌছায় না।

রাতে কোন কাজ থাকলে কষ্ট হয়, তবু সে রাত কেটে যায় এক সময়; নিস্কর্মা নিশিযাপন কষ্টের সাথে সাথে বিরক্তিকর রকমের বিড়াম্বনাময় এবং অতি দীর্ঘ্য। বিকেল-সন্ধ্যাটা ভাল করে ঘুমিয়ে নিয়ে এবার বিনিদ্র রজনীতে তৃণা ভোগ করছে যন্ত্রনা। তৃণা আবার একবার ভাবে, এবার ধূসরকে একটা ফোন করবে নাকি? ও জানে, ধূরস বলবে, আমি এখন ঘুমাবো। তাছাড়া, তৃণা ভাবে, অযচিত কথোপকথনে নিজে খাটো হবে।

কাউকে না কাউকে এক দিন বলতেই হবে ভালবাসায় স্বীকৃতি পাবার সেই অতি চর্বিত চর্বণ বাক্যটা। কিন্তু তৃণাই কেন? বরং ছেলেরা এক হাটু মুড়ে বসে লাল একটা গোলাপ হাতে, কথাটা বললেই অনেক স্মার্ট লাগে। স্বপ্নের মত লাগে, মেয়েদের কাছে নিজেরাই একটা গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে। তৃণা জানে, শেষ পর্যন্ত ওকেই  বলতে হবে।

রাতের গভীরে ডুবে একাকি তৃণা মনে মনে বলে, তারপর?

বাবা কখনো টের পেলে, তৃণাকে সে টুকরা টুকরা করে কেটে ফেলবে। কথাটা ওর মা ওকে বলে আসছে বড় হবার পর থেকেই। এখন কথাটা কেমন যেন সত্য সত্য বলে মনে হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে চারি পাশে রাতের এই চাপ চাপ আধারে বসে, কথাটা একেবারে ভয়ংকর হয়ে ওঠে মাথার ভেতরে।

তখন ও নয়। তখনো ও জানে প্রেম-ভালবাসা সিনেমার উপাদান মাত্র। সিনেমায় যেখানে ওসব দেখা যায়, সেখানে মারামারিও দেখা যায় প্রচুর, অদ্ভুদ রং আর ঢঙ্গের সব পোশাক। তৃণা সেই তার নয় বছর বয়সের জীবনে অমন মামারারি বা পোশাক আশাক ওর ছোট্ট পৃথিবীটার আশে পাশে দেখেনি কখনো। তাই স্বভাবিক ভাবেই মনে করতো, ওসব ব্যাপারই সিনেমার বিষয়বস্তু।

সাথীর বিয়ের পর পরই ওর বাবা নিউজ প্রিন্ট মিল থেকে রিটায়ার্ড হয়ে গ্রামে না ফিরে বসু পাড়া লেনে একটা তিন রুমের বাড়ি বানিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করে।তখনও তৃণারা থাকতো খালীশপুরে।  বসু পাড়া লেনের সেই নানা বাড়ীর পাশের বাড়ীর এক মেয়ে এক ছেলের সাথে পালিয়ে গেল। ব্যাস, তারপর সপ্তাহখানেক যাবৎ তৃণার উপর উপদেশমালা বর্ষিত হতে থাকলো।তৃণা তখন কিছুই বুঝলো না, শুধু শিখলো ছেলেদের সাথে কথাবার্তা বলা বা চলা যাবেনা, এই পৃথিবীতে মহিলা মন্ডিত হয়ে বেচেঁ থাকাই নিরাপদ।

বিয়ের আগে, খুলনা নিইজপ্রিন্ট মিলসের কলোনীতে সাথীরা থাকতো।

বাহা উদ্দিন তখন  নিউজপ্রিন্ট মিলসের বাইরে, রাস্তার উল্টো দিকের বিহারি বাজারে ‘বাহা এন্ড ব্রাদার্স’ নামে একটা ‘মুদি ও স্টোরস্’-এর মালিক। বাহা বাবার পুজিঁ আর নিজের শেষ চেষ্টার ওপর ভরসা করে জীবন যুদ্ধে নেমেছে।

তখনো কেউ বুঝে উঠতে পারেনি, এক দিন এই লক্ষ্যাধিক মানুষের জীবিকা নিবার্হি প্রাণচঞ্চল যন্ত্র দানব, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস্’  মৃত অজগরের মত নিষ্প্রাণ পড়ে থাকবে! বাহার স্পষ্ট মনে আছে, ততদিনে ওদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে, দু পরিবারই নিমরাজি; তৃণার বয়স কাটাঁয় কাটাঁয় নয় বছর এক মাস। দু’হাজার পাঁচের ছাব্বিশে ডিসেম্বর, মাত্র একান্ন বছর বয়সে ছেচলিশ বছর একটানা কাজ করে  খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস অকালে ….।

এক সময় এই মিল এলাকাটাই ছিল ওর একমাত্র প্রেম, পরে সেটাই হয়ে উঠেছিল জীবিকা এবং স্বপ্ন।

মিল বন্ধ হরাব হায় হুতাশ তখন চারিদিকে। এর মধ্যে হঠাৎ করেই একদিন সাথীর মাস্তান মেজ ভাই রফির সেলুনে চুল কাটাতে এসে, বাহার দোকানে বসলো কিছুক্ষণ।

সাথীর পলিয়ে বিয়ের পর ওর কোন আত্মিয়ের এই দোকানে এই প্রথম আসা। বাহা ওর দোকানের কেক, বিস্কুট, চানাচুর, গরম গরম পেটিস, কোল্ড ড্রিংস ইত্যাদি ‘নাস্তা’ দিয়ে আপ্যায়ণ করলো সেই সুমন্ধিরে। সে এসবের কিছুই খাচ্ছে না দেখে বাহা অতি বিনয়ে বললো, ভাইজান, চা খাবেন? চা আনিয়ে দি? সোবহানের দোকানের গরুর দুধের গরম চা?

সেজভাই ওসব দিকে কান না দিয়ে বললেন, মিলতো উঠে যাচ্ছে,  শুনেছ?

–জী ভাইজান।

–তখনতো আর এই মুদির দোকান চলবে না!

–হা!

–হ্যা কী, বল না!

–জী ভাইজান, না।

–তা তখন কি করবা কিছু ঠিক করছো?

বাহা কিছুমাত্র চিন্তা না করে বললো, ভাবছি পোর্ট থেকে মাল এনে দোকানে দোকানে সাপ্লাই-এর কাজ করবো। একটা সাইকেলতো পড়ে আছেই বাড়িতে।

–কোন পোর্ট?

–কেন, মোংলা?

খবরদারি ভঙ্গিতে ভাই তার দিকে তাকিয়ে থাকলো নিঃশব্দে। বাহা ভেব্যাচেক্যা খেয়ে বলে উঠলো, কেন?

–ও জায়গায় মদ-মাগী আর বেশ্যা পাড়া। ভদ্রলোকের সন্তানরা ওখানে যায় না।

বাহা বললো, আচ্ছা।

ভাইও অবাক হয়ে বলে, তাহলে করবা কি? একটা চাকরী করবা?

–জী ভাইজান, পেলেতো করবোই।

ভাইজান এবার প্যান্টের পকেট থেকে একখানা ভিজিটিং কার্ড বের করে বাহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ঢাকায়, আমার এক দোস্তের কারখানা। গিয়ে দেখ। চাকরী বাকরী হলেও হতে পারে।

খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলসের সাথে সাথে একই দিনে ’বাহা এন্ড ব্রাদার্স’  বন্ধ করে, দু’দিন পরেই বাহা চলে আসে ঢাকায়; শাজাহানপুরে এক ফার্নিচারের কারখানা। তাদের দোকান সেল্সম্যানের চাকরী।

পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যবসাটার কায়দা কানুন রপ্ত করে নিয়ে নিজেই পান্থপথে দুটো শো-রুম নিয়ে, আজ প্রায় এক দশক। বাবা-কেলে বড় সংসারটা ভেঙ্গে নিজের বউ বাচ্চা নিয়ে নুতন একটা ছোট সংসার তৈরি করে চলে এসেছে ঢাকায়।

এর মধ্যেই পৃথিবী বদলে গেছে অনেক।মনে হয় এই একপুরুষেই বদলে গেল দশ পুরুষ। বিশ্ব এখন মুক্ত, নাকি তারের জালে বন্ধী। কিছুই আর কারো জানতে বাকী রইলোনা। সবাই এখন মুক্ত, যৌথ পরিবার ভেঙ্গে ভেঙ্গে আজ সবাই একেকটা মুক্ত পরিবারেব বাসিন্দা। এবার প্রতি জন একেকটা নম্বার আর নেটের ঠিকানা নিয়ে  একেকটা সয়ং সম্পূর্ণ একা।

তৃণা এই রাতে টের পায়, সেও খুব একা। অন্য রকমের একা।

একটা ফোন আসে, ধূসরের কল। তৃণা জানে, ফোনটা ধরার পরপরেই ওর মা এসে একবার দেখা দিয়ে যাবে।

ফোন বাজে। বাজতেই থাকে বেশ কিছুক্ষণ।

সকাল হয়। বাদশা তাড়া তাড়ি চলে এসেছে। ও জানে আজ তৃণা ম্যাডামের পরীক্ষা। তৃণা বলে, যাই দেখে আসি। বাহা ভাবে, যাক, পরীক্ষার অনেক ধকল, না হয় শুধু শুধুই একটু ঘুরে আসুক। সাথী বলে, আমি যাবো না, ঘরে অনেক কাজ। ভাবছি আজ ফ্রিজটা পরিষ্কার করবো।

এত সকালে ঢাকা শহর শুনশান। তবু গাবতলীতে যানজট। গাবতলী পেরিয়ে তৃণা বললো, আমি সামনে এসে বসি, পেছনের সিটে খুব একা একা লাগে।

কাল পরীক্ষা, অতএব, সারাটা দুপুর-বিকেল ঘুমিয়ে, সন্ধ্যায় একটা সিদ্ধ ডিম, গরুর খাটি দুধ এক গ্লাস, দুটো বড় কলা আর দুটো বাগরখানি খেয়ে পড়তে বসে তৃণা। আবারো রাজ্যের ঘুম এসে জোটে চোখে। খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে তৃণা সর্বদাই পুরুষ আর ঘুমের ব্যাপারে ষোল আনা যুবতী।

যে কোন সময় একটু ঘুমিয়ে নেওয়া আর ঘুম থেকে উঠেই ব্রাশ করা ওর মজ্জায় এসেছে ওর মায়ের জীন থেকে। হালকা খাবার হিসাবে ফার্স্ট ফুড খাবার উপায় থাকলে যখন তখন খিদে পাওয়াটা মজ্জায় এসেছে বাপের দিক দিয়ে। তিন ভাই বোনেরই একই ধরণ।

ধূসর যে দিন বললো, আমার একটু স্বাস্থ্যবান বউই পছন্দ। তৃনা বলে, বউ না, বল পাত্রী। ধূসর বাতাসে গাঁ ভাসিয়ে উত্তর দেয়, আমারতো পাত্রীই দরকার তবে কারো বউ হলেও তেমন কোন আপত্তি নেই। সবাই হেসে ওঠে শুধু তৃনাই বিরক্ত হয়ে বলে, একটু স্বাস্থবান! হোয়াট ডু ইউ মিন। জাবির মুক্ত মঞ্চে বসে ছ’জন বন্ধুই বুঝেছিল তৃণার এমন খেকিয়ে ওঠবার কারণ। সে আরো তিন বছর আগের কথা। ধূসর গম্ভীর গলায় বলে, না, নো এক্সট্রা ফ্যাট তবে হাগ করলে যাতে ভরাট ভরাট মনে হয়।

তৃণার শরীরে আরো একটু মাংসের প্রয়োজন, খিদে বাড়লো।

খাদ্য রসিক তাকে বলা যাবে না, কারণ, খাদ্যের মূল্য ও চর্বী জাতীয় উপাদান বিচার করে সে খাদ্যের মান বিচার করে। অর্থাৎ বেশী দামী খাদ্য আর বেশী চিনি-চর্বী ওয়ালা খাদ্যই, ওর মতে উত্তম খাদ্য।

তবু গত তিন বছরে ও নিজের ওজন সাতচল্লিশ কেজি থেকে বাড়িয়ে সাড়ে সাতচল্লিশ করতে পারছে না।

ধূসরকেও আর কোন মতে মনের ইচ্ছাটা বোঝানো যাচ্ছে না।

তৃণা চাইছিল হোস্টেলে  বন্ধুদের সাথে থেকে পরীক্ষাটা দিতে। বাহা উদ্দিন প্রথমেই মেয়ের সাহস দেখে রেগে আগুন। সাথী, তৃণার মা কমিনিউকেশন গ্যাপ বা যোগাযোগের গাড্ডাটা টের পেয়ে ও ঘরে গিয়ে স্বামীকে বোঝালো, বন্ধু মানে বান্ধবী, আজকালকার ছেলে মেয়েরা ছেলে বন্ধু আর মে‘বন্ধুর মধ্যে কোন ভেদাভেদ করে না।সবই বন্ধু আর ছেলে-বন্ধু বা মেয়ে-বন্ধু মানে এখন প্রেমীক প্রেমিকা।

বাহা উদ্দিন বলে, বাড়ীর গাড়ীতে যাবে, গাড়ীতে আসবে, তুমিও সথে যাও!

গত এক দেড় বছর বাদশাই ওদের গাড়ী চালাচ্ছে। আস্তে ধীরে, গাড়ীর গাঁ বাঁচিয়ে। অটোমোবাইলের প্রাথমিক ইঞ্জিনিয়রিং-এ পটু। গাড়ীর যত্ন নেওয়ার ব্যাপারেও অসাধারন। গাড়ীকে ভালবাসতে জানে। যেন জন্মসূত্রেই ড্রাইভার!

বাদশার প্রথম দিনের পরিচয়ে, বাহা উদ্দিন বলে, ঢাকায় কোথায় থাকো?

–বংশাল।

–আর কে কে আছে?

–আব্বা হুজুর, আম্মা হুজুর আর একটা ছোট বোন আইএ পড়ে।

–এখন আর আইএ নেইরে পাগল, এইচএসসি হয়ে গেছে।

–জ্বী, এইচএসসি।

–পুরা নাম?

–জাহাঙ্গীর মিরজ্জা।

–কী! জাহাঙ্গীর মির্জা? বাব্বা।

জাহাঙ্গীর চোখে-মুখে হাসি ছড়িয়ে দেয়।

–তুমি কি আবার মোগল খান্দানের লোক। মির্জা পাইলা কই?

–আমাদের টাইটেল স্যার, আমার আব্বা হুজুরের নাম  মিরজ্জা বক্কর।

–তাহলেতো তোমাকে বাদশা জাহাঙ্গীর বলেই ডাকতে হবে!

জাহাঙ্গীর আবরো চোখে-মুখে হাসি ছড়িয়ে বলে, স্যার আমার ডাকনাম বাদশা।

সেই থেকে বাদশা ওদের গাড়ী চালায়।

সাথী বোঝে বাহার ওয়ার্ডার প্রথম কটা দিন মেনে চলতেই হবে। তারপর, কষ্টের কথা বলে, ওকেই যেতে বলতে হবে। ব্যাস! ওয়ার্ডার ক্যানসেল। বিয়ের বারো বছর আগ থেকেই ও বাহা উদ্দিনকে চেনে।

সাথী বাথরুমের শীতল সাদা ডিম্বাকৃতি টয়লেট প্যানে বসে, মুখো মুখি দেয়াল জুড়ে আয়না। বাহার খামক্ষেয়ালীপনা। বাথটাবের লাগোয়া দেয়ালে আয়না আর বাথটাবের সামনে প্লাস্টিকের অর্ধ-স্বচ্ছ পর্দা। বাহা এটাকে বলে সত্যবাদী দেয়াল।

সত্যবাদী দেয়ালে নিজেকে দেখতে দেখতে ভাবছিল, তৃণার বয়স একুশ। মানে ওদের বিয়েরও বয়স একুশ বছর। তারো বারো বছর আগে, মানে বোত্রিশ-তেত্রিশ বছর। ও তখন ক্লাশ এইটে আর বাহা বারোর ফাইনাল দেবে। মানে ও এখন আটচল্লিশ বা অরিজিনালী পঞ্চাশ।

সাথী খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে, ওর মুখে বা গলায় এখনো তেমন কোন ভাজ পড়েনি। বুকে বাঁধা টাওয়েলটা নামাতে নিজের কাছে নিজেরেই লজ্জ্বা লজ্জ্বা লাগে। তবু টাওয়েলটা বুক থেকে সরায়। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে না। মাথা নামিয়ে ফেলে। চোখে পড়ে পেটের নিচের দিকে হাজারো আকি বুকিঁ আঁকা সাদাটে চামড়া।

সাদা স্যামসাং ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনের সাদা রং সাথীর পছন্দ নয়। হাতে নিলে মনে হয় ছেলেদের হাত। আসলে সেটটা বাহার। বাহা নতুন সেট কিনে সাথীকে সেটটা গিফ্ট করেছে।

আটটার বাংলা খবরে জানা গেল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারনে পরীক্ষা এক সপ্তাহ পিছিয়ে গেছে তৃণাদের। মুহূর্তের মধ্যে খবরটা ছড়িয়ে পড়লো নেটে নেটে। ফেসবুক তোলপাড়। কাল পরীক্ষাটা না হলে ছাত্রদের জীবন সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে। বাহা তার আমদানী-রফতানীকারক ব্যবসার অফিসে বসে ফোন করে খবরটা জানালো সাথীকে।‍

তৃণা ঘুমে কাদাঁ। ও এসবের টের পেল না কিছুই।  

রাতে যাতে ওকে ঘুম কাতর না করে ফেলতে পারে এ জন্য মাজেদাকে দিয়ে মাইক্রো ওভেনে ফ্রাইড রাইস গরম করে খেয়ে, মাজেদার বানানো এক কাপ গরম কফি নিয়ে বসলো গিয়ে পড়ার টেবিলে। সাথী মেয়ের কাছে এসে বললো, তোর মোবাইলে টুংটাং করে অনেক ম্যাসেজ আসছিল। দ্যাখ না কিসের?

–দরকার নেই।

–খুলেই দেখ না।

–তোমার এত ইন্টারেস্ট কেন!

–কাল তোদের পরীক্ষা হচ্ছে না।

তৃণার চটকা ঘুম ভেঙ্গে গেল ফটাস করে, কী বলছো তুমি! তিন দিন আগেও ও মনে করেছিল পরীক্ষাটা কয়েকটা দিন পিছিয়ে গেলে খুব ভাল হয়। এখন মন খারাপ লাগছে, ইস এত করে প্রিপারেশন নিলাম! মনে মনে আসলেই খারাপ লাগছে। তবে খবরটা কর্ণফাম হওয়া দরকার। প্রথমেই মনে পড়ে ধূসরের নাম।

ও জানে, মায়ের সামনে ফোন করলেই, যদি শোনে কোন ছেলে, তাহলেই সাথীর মাথা ঘুরতে শুরু করবে। কোন ছেলের সাথে কথা বলা বা চলা ফেরা করা মানেই যে প্রেম নয়, এ কথা আজো ওর অভিভাবকরা কিছুতেই বুঝতে চায় না।

তৃণা এক দিন সুযোগ করে মাকে বোঝাবার চেষ্টা করে, মা, আজকালকার দিনে  প্রেম-ভালবাসা এমন দূর্মুল্য যে তা জোগাড় করা অত সহজ নয়।  মেয়ের মুখে এইটুকু শুনে, সাথী হাপ ছেড়ে বাচঁলো। তবে পরের ধারনাটা ওর ঘুম কেড়ে নিল।

–আগেকার দিনে তবু শরীর-টরির দিলে একসময় বিবেক চাড়া দিয়ে উঠতো। আজকাল যাত্রা-নাটকের বিবেকের সাথে সাথে পোলাপানদের বিবেকও সব ‘আউট অফ ফ্যাশন’।

এরপর পর পর তিন দিন ভালো করে ঘুম হলো না সাথীর।  চতুর্থ দিন রাতে সাথী হঠাৎ চোখ মেলে ধরে বোঝে, সে আসলেই ভয় পেয়েছে তৃণার কথায়, প্রেম পাবার জন্য মেয়েটা আবার কোন বিবেকহীণ ছেলের সাথে …। ছেলেরা চিরকালই বিবেক হীন। 

বাহাকে নাক ডাকতে শুনে ভাবে, বিয়ের আগে এই মানুষটাই পাগল হয়ে যেত এক দিন দেখা না হলে। বিয়ের পর পরও  এই মানুষটা বাঘের মত ওৎ পেতে থাকত আকঁড়ে থাকবার জন্য। দুটো বাচ্চা হবার পর পরই সাথী বলেছিল, এবারএকটু সাবধান হও। এ যুগেতো কত কিছুর ব্যবস্থা আছে। বাহা ইঙ্গিতটা বুঝে বলেছিল, পলিথিনে মুড়ে রসগোল্লা খেতে কেমন লাগবে তোমার? কথাটা শুনে খারাপ লাগেনি সাথীর।

আরো কয়েক বছর গেল।  তারপর থেকে শুরু হলো এই বিছানায় পড়েই নাক ডাকা। বাহার নাক ডাকাকে নাসিকা গর্জন না বলে বলতে হবে ‘নাকের চাপা শব্দ’। তা সে শব্দে সাথী বিরক্তিবোধ করে না। তবে সাথী তখনও মাঝে মধ্যে বিভিন্ন কায়দায় বাহার ঘুম ভাঙ্গাতো। বাহাও সেই নিঃশব্দ আহ্বানের অর্থ টের পেত। আজকাল আর সাথীরও ইচ্ছে করে না ঘুম ভাঙ্গাতে। বাহাও রাতে গভির ঘুম দেয় বিবেকহীন মানুষের মতেই।

আজকের ঘুম ভাঙ্গার কারণ, একেবারেই ভিন্ন।

তৃণা খেয়ে দেয়ে মনযোগ দিয়ে পড়তে বসে জানলো কাল পরীক্ষা হচ্ছে না। খুব ইচ্ছা হল ধূসরের সাথে কথা বলবার সুযোগটা কাজে লাগাবে। সাথীর দিকে তৃণা তাকিয়ে দেখে সে ওর দিকে তাকিয়ে। অদ্ভুদ ধরনের অস্বস্তি। সাথী বলে, কী হলো,  একজন কাউকে ফোন করে সিওর হবিতো।

তৃণা রুকুকে ফোন করে পুরো ব্যপারটা জেনে নিয়ে অন্য আলাপ জুড়ে দিল। সাথী এতক্ষণে বুঝে ওঠে, ওদের বন্ধুদের আলাপের সময় কাছে থাকাটা ঠিক নয়। আজ থেকে বিশ কুড়ি বছর আগেও মা-বাবার কাছে এই মধ্যবৃত্তিয় মনোভাবে লজ্জ্বার কিছু ছিল না । আজকাল মা-বাবারা ছেলে মেয়েদের সামনে এমন ভাবে ছোট হতে পারে না।

সাথীদের কিশোরবেলা এমন কিছু ঐহিাসিক যুগের কথা নয়। তখন মোবাইল ফোনের ব্যাপার ছিল না ঠিক, তবে, সাথীদের খুলনা নিউজপ্রিন্টের কলোনীর কোয়ার্টারে ল্যান্ড ফোন একটা ছিল। মাসে দু’মাসে কখনো স্কুলের কোন বান্ধবী ফোন করলে বা তার কাছে এ ফোন করলে ওর মা বা বড় আপা কাছে এসে বসতো, পাহারাদারের মত। কথা কিছু আস্তে হলে মুখে কিছু না বলে ঈসারায় বলতো, ফিস ফিস করিস কেন ফিস ফিস কিসের?

সাখী জানে এখন সরে না গেলে মেয়ে এখনি বলে বসবে, প্লিজ, মা, এ বিট পারসোনাল। অর্থাৎ, তুমি বুঝতে চেয়েছিলে আমি কার সাথে আলাপ করি, জানিয়ে দিলাম, রুকুর সাথে কথা বলছি, এতেতো আর কোন আপত্তি থাকবার কথা নয়। ব্যাস এবার যাও।

পারসোনাল শব্দটা নিজের সন্তানের মুখে শুনতে হলে মা-বাপ ভীষণ একাকিত্ব বোধ করে। আর মা-বাবার সমস্যা, তারা কিছুতেই সন্তানকে একা রেখে নিরাপদ বোধ করে না। তৃণা জানে এসব, সব জানে তবু এ শুধু নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবার লড়াই; এখানে হারলে চলবে না। হোক সে মা তবু অন্য কারো মান বাঁচাতে গিয়ে নিজের নাক কাটতে দেওয়া যায় না।

ওর মায়ের কাছে এ সব যুক্তি তক্ক তবু চলে, কিন্তু বাবা? তার এক কথা, যতদিন দেখে শুনে বিয়ে না দিয়ে দিচ্ছি, লেখা পড়া করে উকিল ব্যারেস্টার হয়ে গেলেও লাভ নেই, তার কথা মতই চলতে হবে, ব্যাস।

খুব যে ছোটবেলার কথা তাও নয়, স্পষ্ট মনে আছে, তখনো ওরা খালিশপুরে দাদা-দাদির সাথেই, অন্যান্য ষোলজন চাচা-ফুপুরা সব এক বাড়ীতেই থাকে। ওরা আর অন্য দুই বড় চাচাদের, এক-একটা সংসারের জন্য  একটা করে কামরা । আর এক কামরা ছেলেদের, এক কামরা মেয়েদের। মোট মাট বিশ পচিশ জনার মধ্যবিত্ত সার্কাস দল। ওর দাদাজানও এ ভাবে সামন্ত প্রভুদের স্বরে কথা বলতন।

এখন সে সব ভাবলেও তৃণার গাঁ ঘিন ঘিন করে। মোটা মুটি মানব জাতীর জংগলবাস পর্বের পরের জীবন ব্যবস্থা। এক-এক কামরায় এক-এক সংসার। সেখানেই  তিন ভাই-বোনের জন্ম। রীতি মত অসভ্যের সভ্যতা। এখন ঢাকায় ভাড়ার ফ্ল্যাটের দু রুমে তিন ভাই-বোন, বাবা-মার এক রুম তার পরেও লিভিং, ডাইনিং আর কিচেন। ওর রুমে বসে চিৎকার না করলে বাবার রুমে শব্দ পৌছায় না।

রাতে কোন কাজ থাকলে কষ্ট হয়, তবু সে রাত কেটে যায় এক সময়; নিস্কর্মা নিশিযাপন কষ্টের সাথে সাথে বিরক্তিকর রকমের বিড়াম্বনাময় এবং অতি দীর্ঘ্য। বিকেল-সন্ধ্যাটা ভাল করে ঘুমিয়ে নিয়ে এবার বিনিদ্র রজনীতে তৃণা ভোগ করছে যন্ত্রনা। তৃণা আবার একবার ভাবে, এবার ধূসরকে একটা ফোন করবে নাকি? ও জানে, ধূরস বলবে, আমি এখন ঘুমাবো। তাছাড়া, তৃণা ভাবে, অযচিত কথোপকথনে নিজে খাটো হবে।

কাউকে না কাউকে এক দিন বলতেই হবে ভালবাসায় স্বীকৃতি পাবার সেই অতি চর্বিত চর্বণ বাক্যটা। কিন্তু তৃণাই কেন? বরং ছেলেরা এক হাটু মুড়ে বসে লাল একটা গোলাপ হাতে, কথাটা বললেই অনেক স্মার্ট লাগে। স্বপ্নের মত লাগে, মেয়েদের কাছে নিজেরাই একটা গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে। তৃণা জানে, শেষ পর্যন্ত ওকেই  বলতে হবে।

রাতের গভীরে ডুবে একাকি তৃণা মনে মনে বলে, তারপর?

বাবা কখনো টের পেলে, তৃণাকে সে টুকরা টুকরা করে কেটে ফেলবে। কথাটা ওর মা ওকে বলে আসছে বড় হবার পর থেকেই। এখন কথাটা কেমন যেন সত্য সত্য বলে মনে হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে চারি পাশে রাতের এই চাপ চাপ আধারে বসে, কথাটা একেবারে ভয়ংকর হয়ে ওঠে মাথার ভেতরে।

তখন ও নয়। তখনো ও জানে প্রেম-ভালবাসা সিনেমার উপাদান মাত্র। সিনেমায় যেখানে ওসব দেখা যায়, সেখানে মারামারিও দেখা যায় প্রচুর, অদ্ভুদ রং আর ঢঙ্গের সব পোশাক। তৃণা সেই তার নয় বছর বয়সের জীবনে অমন মামারারি বা পোশাক আশাক ওর ছোট্ট পৃথিবীটার আশে পাশে দেখেনি কখনো। তাই স্বভাবিক ভাবেই মনে করতো, ওসব ব্যাপারই সিনেমার বিষয়বস্তু।

সাথীর বিয়ের পর পরই ওর বাবা নিউজ প্রিন্ট মিল থেকে রিটায়ার্ড হয়ে গ্রামে না ফিরে বসু পাড়া লেনে একটা তিন রুমের বাড়ি বানিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করে।তখনও তৃণারা থাকতো খালীশপুরে।  বসু পাড়া লেনের সেই নানা বাড়ীর পাশের বাড়ীর এক মেয়ে এক ছেলের সাথে পালিয়ে গেল। ব্যাস, তারপর সপ্তাহখানেক যাবৎ তৃণার উপর উপদেশমালা বর্ষিত হতে থাকলো।তৃণা তখন কিছুই বুঝলো না, শুধু শিখলো ছেলেদের সাথে কথাবার্তা বলা বা চলা যাবেনা, এই পৃথিবীতে মহিলা মন্ডিত হয়ে বেচেঁ থাকাই নিরাপদ।

বিয়ের আগে, খুলনা নিইজপ্রিন্ট মিলসের কলোনীতে সাথীরা থাকতো।

বাহা উদ্দিন তখন  নিউজপ্রিন্ট মিলসের বাইরে, রাস্তার উল্টো দিকের বিহারি বাজারে ‘বাহা এন্ড ব্রাদার্স’ নামে একটা ‘মুদি ও স্টোরস্’-এর মালিক। বাহা বাবার পুজিঁ আর নিজের শেষ চেষ্টার ওপর ভরসা করে জীবন যুদ্ধে নেমেছে।

তখনো কেউ বুঝে উঠতে পারেনি, এক দিন এই লক্ষ্যাধিক মানুষের জীবিকা নিবার্হি প্রাণচঞ্চল যন্ত্র দানব, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস্’  মৃত অজগরের মত নিষ্প্রাণ পড়ে থাকবে! বাহার স্পষ্ট মনে আছে, ততদিনে ওদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে, দু পরিবারই নিমরাজি; তৃণার বয়স কাটাঁয় কাটাঁয় নয় বছর এক মাস। দু’হাজার পাঁচের ছাব্বিশে ডিসেম্বর, মাত্র একান্ন বছর বয়সে ছেচলিশ বছর একটানা কাজ করে  খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস অকালে ….।

এক সময় এই মিল এলাকাটাই ছিল ওর একমাত্র প্রেম, পরে সেটাই হয়ে উঠেছিল জীবিকা এবং স্বপ্ন।

মিল বন্ধ হরাব হায় হুতাশ তখন চারিদিকে। এর মধ্যে হঠাৎ করেই একদিন সাথীর মাস্তান মেজ ভাই রফির সেলুনে চুল কাটাতে এসে, বাহার দোকানে বসলো কিছুক্ষণ।

সাথীর পলিয়ে বিয়ের পর ওর কোন আত্মিয়ের এই দোকানে এই প্রথম আসা। বাহা ওর দোকানের কেক, বিস্কুট, চানাচুর, গরম গরম পেটিস, কোল্ড ড্রিংস ইত্যাদি ‘নাস্তা’ দিয়ে আপ্যায়ণ করলো সেই সুমন্ধিরে। সে এসবের কিছুই খাচ্ছে না দেখে বাহা অতি বিনয়ে বললো, ভাইজান, চা খাবেন? চা আনিয়ে দি? সোবহানের দোকানের গরুর দুধের গরম চা?

সেজভাই ওসব দিকে কান না দিয়ে বললেন, মিলতো উঠে যাচ্ছে,  শুনেছ?

–জী ভাইজান।

–তখনতো আর এই মুদির দোকান চলবে না!

–হা!

–হ্যা কী, বল না!

–জী ভাইজান, না।

–তা তখন কি করবা কিছু ঠিক করছো?

বাহা কিছুমাত্র চিন্তা না করে বললো, ভাবছি পোর্ট থেকে মাল এনে দোকানে দোকানে সাপ্লাই-এর কাজ করবো। একটা সাইকেলতো পড়ে আছেই বাড়িতে।

–কোন পোর্ট?

–কেন, মোংলা?

খবরদারি ভঙ্গিতে ভাই তার দিকে তাকিয়ে থাকলো নিঃশব্দে। বাহা ভেব্যাচেক্যা খেয়ে বলে উঠলো, কেন?

–ও জায়গায় মদ-মাগী আর বেশ্যা পাড়া। ভদ্রলোকের সন্তানরা ওখানে যায় না।

বাহা বললো, আচ্ছা।

ভাইও অবাক হয়ে বলে, তাহলে করবা কি? একটা চাকরী করবা?

–জী ভাইজান, পেলেতো করবোই।

ভাইজান এবার প্যান্টের পকেট থেকে একখানা ভিজিটিং কার্ড বের করে বাহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ঢাকায়, আমার এক দোস্তের কারখানা। গিয়ে দেখ। চাকরী বাকরী হলেও হতে পারে।

খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলসের সাথে সাথে একই দিনে ’বাহা এন্ড ব্রাদার্স’  বন্ধ করে, দু’দিন পরেই বাহা চলে আসে ঢাকায়; শাজাহানপুরে এক ফার্নিচারের কারখানা। তাদের দোকান সেল্সম্যানের চাকরী।

পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যবসাটার কায়দা কানুন রপ্ত করে নিয়ে নিজেই পান্থপথে দুটো শো-রুম নিয়ে, আজ প্রায় এক দশক। বাবা-কেলে বড় সংসারটা ভেঙ্গে নিজের বউ বাচ্চা নিয়ে নুতন একটা ছোট সংসার তৈরি করে চলে এসেছে ঢাকায়।

এর মধ্যেই পৃথিবী বদলে গেছে অনেক।মনে হয় এই একপুরুষেই বদলে গেল দশ পুরুষ। বিশ্ব এখন মুক্ত, নাকি তারের জালে বন্ধী। কিছুই আর কারো জানতে বাকী রইলোনা। সবাই এখন মুক্ত, যৌথ পরিবার ভেঙ্গে ভেঙ্গে আজ সবাই একেকটা মুক্ত পরিবারেব বাসিন্দা। এবার প্রতি জন একেকটা নম্বার আর নেটের ঠিকানা নিয়ে  একেকটা সয়ং সম্পূর্ণ একা।

তৃণা এই রাতে টের পায়, সেও খুব একা। অন্য রকমের একা।

একটা ফোন আসে, ধূসরের কল। তৃণা জানে, ফোনটা ধরার পরপরেই ওর মা এসে একবার দেখা দিয়ে যাবে।

ফোন বাজে। বাজতেই থাকে বেশ কিছুক্ষণ।

সকাল হয়। বাদশা তাড়া তাড়ি চলে এসেছে। ও জানে আজ তৃণা ম্যাডামের পরীক্ষা। তৃণা বলে, যাই দেখে আসি। বাহা ভাবে, যাক, পরীক্ষার অনেক ধকল, না হয় শুধু শুধুই একটু ঘুরে আসুক। সাথী বলে, আমি যাবো না, ঘরে অনেক কাজ। ভাবছি আজ ফ্রিজটা পরিষ্কার করবো।

এত সকালে ঢাকা শহর শুনশান। তবু গাবতলীতে যানজট। গাবতলী পেরিয়ে তৃণা বললো, আমি সামনে এসে বসি, পেছনের সিটে খুব একা একা লাগে।