Image by Branimir Lambaša from Pixabay

দীপান্তর অথবা কালাপানির মতো


বিকালে বৃষ্টি হয়েছে খানিকক্ষণ।
সুতন্নী বই দেখে দেখে তিন রকমের রান্না রাঁধলো নিজের হাতে। ফ্রাইড রাইস, চাইনিজ ভ্যাজিটেবল আর চিকেন মাঞ্চুরিয়ান; বাঙ্গালীর কমন চাইনিজ খাবার। ও জানে ওর স্বামী কোনো মতেই বিশ্বাস করবে না।
রান্না-বান্না সদাসর্বদা ঝুট-ঝামেলার কাজ বলে মনে করে সুতন্নী। বাজার করা থেকে শুরু করে প্লেটে খাবার বাড়া অবধি সময়টা, সময়ের বিবেচনায় যদি ধরে নেওয়া হয় দশ; তাহলে খাওয়া-দাওয়ার সময়ের মান দাঁড়ায় বড় জোর এক। তারপরও একজন না একজন খেয়ে-দেয়ে বলবে, লবন কম বা হলুদ বেশী কিংবা আর একটু ঝাল কম হলে ভালো হতো। সব চাইতে বিরক্তিকর ব্যাপার, যার জন্য রান্না সে যদি বাড়িতে ফিরে খাওয়ার সময় বলে, ‘পেটটা ভরা ভরা লাগছে, আজ আর কিছু খাবো না!’ তার পর আর মেজাজ ধরে রাখা যায় না।
দুটো মানুষের সংসার। মাঝে-সাঝে শখ করে একটা কিছু রান্না করা এক কথা। আর প্রতিদিন দু’ তিন বেলার জন্য রান্না করা মানে চরম বিরক্তিকর ব্যাপার। সুতন্নীর কথা হলো, হ্যা, মা দাদিরা তাদের সময়ে গোটা সংসারের জন্য রান্না-বান্না করেছে সেটাই ছিল তাদের কালের সংসার আর ঘর-কান্না।
সাদা কালো ছক কাটা বড়-চওড়া বারান্দাওয়ালা পেল্লায় এক খোলামেলা দোতলা দালান। দেওর ভাসুর আর তাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে পনেরো বিশ জনের গোটা পরিবার। এক গুষ্টি মানে এক বাড়ি এবং এক হাঁড়ি। মেয়েদের কাজ, সারা দিন ধরে তিন-বেলা চার-বেলার শখ আর যোগান অনুযায়ী রান্না শেষ করে বিকালে মাথায় তেল দেওয়া, সন্ধ্যের পর ছেলেপুলেদেরকে ওদের ‘তখনো-ছাত্র’ বড়-ভাই অথবা বেকার ছোট চাচার তদারকীতে পড়তে বসিয়ে দিয়ে নিজেরা শরতের বই নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে বসা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পান চিবাতে চিবাতে পরনিন্দা, পরচর্চা করা। মাসে দ’ু মাসে কাছের সিনেমা ঘরে ভালো সিনেমা এলে হলে গিয়ে একটা বাংলা ছবি দেখা।
আর আজকাল শহরে সংসার মানে, নিজেদের তিন-চার কামরার বাক্স-পানা ফ্লাটে বড় জোর তিন, চার জন সদস্য। তাতে এসি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ট্যাব, ল্যাপটপ, প্লে-স্টেশন, গোটা তিনেক চলমান মোবাইল আর এদিক সেদিক পড়ে থাকা আরো দুয়েকটা নষ্ট মোবাইল সেট।
রান্নার চাইতেও বড় আরো শত রকমের কাজ আছে আজকাল। যে শুধুই হাউজ-ওয়াইফ তাকেও ঘরে বসে বসে মোবাইলে সোস্যালাইজেশনে ব্যাস্ত থাকতে হয়। একটা স্কুলে পড়া বাচ্চা থাকলেতো আর কথা নেই; সারাটা দিন স্কুলের সেডের নিচে শেষ। রাতে তার পড়া লেখার তদারকী। তারপরেও উত্তরাধিকার সূত্রে রক্তে বয়ে নিয়ে আসা ‘পরনিন্দা পরচর্চা’। সে জন্য আরো আছে কিটি-পার্টি। এ সব বাদ দিলেও শুধু বসে বসে টেলিভিশনে ভারতীয় শ্বাশুড়ি-বউয়ের কির্তী-কলাপ দেখে দেখেও দিন কেটে যায় ভস করে।
বরং সন্ধের পর স্বামী-স্ত্রী গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে একটু বাইরে কোথাও কিছু একটা খেয়ে নিয়ে ক্রেডিট-কার্ড ধরিয়ে দিলেইতো বেশ ঝামেলা শেষ। তাতে দাম্পত্য জীবনটাও সুখের হয়।
রতন বিতর্কে জড়িয়ে না পড়ে স্ত্রীর কথা মেনে নিয়েছিল ওর স্বভাব-গুনে। কিন্তু সেই মাসের সতেরো তারিখে ও বাড়ি ফিরে দেখে সুতন্নী বাড়িতেই চাইনিজ রেধে রেখেছ। সাদা-সিধে ডাল, ভাত, ভাজি, ভর্তা, মাছের ঝোল বা মাংস আলুর তরকারী: বড় সময় বিনষ্টকারী আয়োজন।
সারাটা দিন অফিসে এসির হিম-শীতল ঠান্ডায় বসে বসে কাজ করে, সাতটা নাগাদ সেখান থেকে বেরিয়ে নিজের এসি গাড়িতে বাড়ি ফিরে এসির নিচে সোফায় শরীর ডুবিয়ে এক কাপ গরম কফি খেতে খেতে আজো ও সারাদিনের ধকল কাটাচ্ছিল। বাড়ি মানে সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় বাইশ তলায় ড্রয়িং ডাইনিংসহ তিন বেড চার বাথের কোটি টাকা মূল্যের একটা ফ্লাট।
সুতন্নী হাসি মুখে পাশে এসে বসে। রতন জানতে চায়, “আজকে! ব্যাপারটা কী বলোতো?”
প্রতি দিন যেমন হয়; সুতন্নী মুচকী হেসে অন্য একটা প্রশ্ন করে বসে, “কোনো ব্যাটাছেলেই বাড়ির কারো কোনো জন্মদিন বা অন্য কোন স্মৃতিময় দিনের কথা মনে রাখতে পারে না, এমনকি নিজের জন্মদিন বা ম্যারেজডের তারিখটাও মনে রাখতে পারে না। কেন জানো?”
রতন কফিতে একটা জোর চুমুক দিয়ে তাকালো সুতন্নীর দিকে। বললো, “তা বলতে পারি না। তবে মেয়েরা আবার বেছে বেছে এইসব দিনগুলোর কথা ঠিকই মনে রাখতে পারে, কেন জানো?”
সুতন্নী কেউটের মতো ফস করে ফনা তুলে তাকায়, “বিকজ, দে কেয়ার দোজ ডেজ।”
রতন মনে মনে বলে, “দে কেয়ার দোজ ডেজ! হুম! কেয়ার মাই ফুট। ঐ সব দিনে বাসায় পার্টি দিতে পারা যায়। ফ্রেন্ডদের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে এসে আয়েস করে দেখানো যায়, দেখ কী হনুরে … যত্ত সব ফুট্টা ফুটানি!” মুখে সেই কথা না বলে বলে, “স্বামী বেচারাদের নাজেহাল করবার শিওর শট।”
সুতন্নী এবার সামান্য হেসে সম্মতি দেয়। বরং ও রতনের বেনসন লাইটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে নিয়ে ঠোটে আলতো করে ধরে, লাইটার দিয়ে সেটা ধরিয়ে নেয়। তারপর ঠোট দিয়ে আলতো করে চেপে ধরে দুটো টান, নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। রতন সে দিকে তাকিয়ে দেখে। এই দৃশ্যে নাকি ও কামাতুর হয়ে ওঠে!
সুতন্নী সিগারেটটা রতনের দিকে এগিয়ে ধরে, নেশা ধরারো চোখে তাকিয়ে। “নাও এখন তোমার দরকার হবে।”
রতন সিগারেটটা হাতে নেয়। “এবার আক্রমন?”
সুতন্নী চাবুক মারবার মত চট করে তাকায় রতনের দিকে। রতন বোঝে: মেয়েটা সারা দিন একা একা এই ফ্ল্যাটের নিরাপদ, নিশ্চিন্ত জীবনের মধ্যে বসে থেকে থেকে জেল খাটা কয়েদির মত পাষন্ড এবং বৈধর্ম্যী হয়ে উঠেছে। এ এপ্যার্টমেন্ট থেকে বেরোতে বা এখানে ঢুকতে গেলে তিন-তিনটে নিরাপত্তা বেন্টনী সামনে থেকে হেঁ^টে, চার-পাঁচটা সিসিডি ক্যামেরার নিরব চোখ টপকে, দুটো তালা-বন্ধ গেট পেরিয়ে তবেই যাতায়াত করতে হয়। তারপরো আবার ড্রাইভার!
ওদের বিয়ে হয়েছে বছর আড়াই। এই ফ্ল্যাটে উঠে এসেছে বছর দুয়েক। দুজনকে দুজন বুঝে ওঠবার মতো সময় বের করে উঠতেও পারেনি রতন, নিজের অবহেলার কারনে।
রতন বলে, “ছেলেদের মাথায় শত চিন্তা, শত পরিকল্পনা। সব কি আর এক মাথায় ধরে!”
“কেন, কোন বড় কম্পানিতে কোন মহিলা কি তোমার মত উচু পদে নেই? তাদেরতো ঠিকই সব কিছু মনে থাকে।”
“সে জন্যেইতো!”
“কী সেই জন্যইতো?”
“সে জন্যইতো সবখানে পিএস হিসাবে মহিলাদের রাখা হয়।”
রতন জানে এই অনর্থক তর্কের শেষ কোথায়। ঝগড়া, মান অভিমান, খেতে না-চাওয়া, সাধা সাধী, অনুরাগ শেষে বাথরুমে, শোয়ার-ঘরের মেঝেতে অথবা ড্রয়িং-রুমের সোফায় সেক্স। তারপর ঠান্ডা পানিতে গোসল।
সরাসরি সেই পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব না বলেই এই রকমের কথাবার্তা চালিয়ে যেতেই হয়। রতন সোফায় বসে বসে জুতো জোড়া খুলে সোফায় এলিয়ে পড়ে।
মাঝে এই কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকবার পরেই সুতন্নী বলে ওঠে, “ও, আমার সাথে কথা বলতেও তোমার ভালো লাগে না!”
এর পর সুতন্নী অভিমান করবে। রতনের দায়িত্ব সে মান ভাঙ্গানো।
সপ্তাহের সাত দিনে সাত রকমের ফিকির। কথায় আছে যত-মত-তত-পথ, তবে এখানে মতও একই জনার পথও একটাই, সুতন্নী অভিমান করবে রতনকে সেটা ভাঙ্গাতে হবে এবং সব শেষে আদর ভালবাসায় ক্লান্ত হয়ে পড়া।
রতন জানালো, আজ ওর মা ফোন করেছিল, আগামী সপ্তাহে সে আসবে ঢাকায়, ডাক্টার দেখাবার জন্য।
সুতন্নীর ধারনা, ওর শ্বাশুড়ী ডাক্তার দেখাতে নয় ঢাকায় আসে ছেলের সংসারে নিজের অধিকারটা কায়েম করে রাখতে। সুতন্নীর মাথা ব্যাথা করে ওঠে। ও আর মায়ের প্রসঙ্গে গেলো না, রণে ভঙ্গ দিয়ে বলে ওঠো, “হয়েছে, কষ্ট করে আর মনে করতে হবে না। তিন বছর আগে এই দিনে তুমি আমাকে দেখতে গিয়েছিলে নুরজাহান রোডে, আমার ছোট চাচার বাড়ি।”
“মনে আছে তোমার?”
“সব মনে আছে। নতুন একটা নীল জিন্স প্যান্ট আর আকাশী রঙ্গের টি-সার্ট পরে এসেছিল একটা বন্ধুকে সাথে নিয়ে। জিন্সে চেইনের জায়গাটা এমন ফুলেছিল যে আমরা দুই বোন তাই নিয়ে কী হাসা-হাসি করেছি ক’দিন — ওরে বাবা, আজো মনে পড়লে হাসি পায়।”
“মা আসছে শুনেছো?”
“শুনলামতো।”

সকাল সকাল উঠে করবেই বা কী!
এই ফ্ল্যাটে আসবার পর থেকেই বিছানা ছেড়ে দেরী করে ওঠে সুতন্নী। সকালে রতন রেড়ি হয়ে অফিস চলে যায় নয়টার মধ্যে। সুতন্নী তখনো বিছানার মধ্যে নাইটিতে আলু-থালু বসনে বা প্রায় উলঙ্গ হয়ে পড়ে আছে। এগারোটা নাগাদ ওদের ছুটো বুয়া, লাভলী-মা ডোর-বেল বাজালে তবেই ও ওঠে।
রতন আর সুতন্নীর ষোলো শো স্ক্যোয়ার ফিটের এই ফ্ল্যাটে ওরা একেবারে একা। আধুনিক সভ্য মহানগরীর সুযোগ-সুবিধার অরণ্যের মধ্যে ওদের এই ষোলো শো স্ক্যোয়ার ফিটের নির্জনতায় ওরা বর্বরের মত জীবন যাপন করাতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। বাইরে বেরোতে হলে ড্রাইভার আর নিজেদের গাড়ির নিরাপত্তা; ঘরে একসাথে থাকবার সুযোগ হলেই ঝগড়া, তর্ক-বিতর্ক, মতামতের লড়াই আর দেহ; জীবনটা আঁটকে গেছে এর মধ্যে।
ঘরে শর্টস পরে গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জী চাপিয়ে ঘুর ঘুর করা আর চলবে না সুতন্নীর। ওর ঘরে পরবার হাফ-প্যান্ট আর জিন্সগুলো সরিয়ে সেলোয়ার বের করে রাখতে হবে। চিন্তা করে দেখে নিলো ওড়না কিনতে হবে কয়েকটা।
“তোমার মা আসছেন কবে?”
রতন চুপ করে থাকে!
সুতন্নী আবারো প্রশ্নটা করে, ঈশারায় উুম আঃ শব্দ করে।
“বুধবার।“
“তার মানে, সোম, মঙ্গল, বুধ। আর দুই দিন! ফিরবে কবে?”
“মাতো এক সপ্তাহের বেশী …”
সুতন্নীও তা জানে। তবু জানতে চায়। এই এক সপ্তাহই ওর কাছে মনে হয় এক যুগ। ওর বাপ-মাকে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবার প্রশ্নই ওঠে না। রতনের বাবা এখন পঁচাত্তুর পেরোলো, গ্রামে বারো কাঠা জমির ওপর দোতলা বাড়ি, গাড়ি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, গিজার, ওয়াসিং মেশিন। জমি-জায়গা, কৃষাণ, চাষা ভূষা, কামলা, কাজের লোক, বাজারে দুটো আড়ৎ।
রতন বেরিয়ে গেলো দরজা ভেতর থেকে লক করে। সুতন্নীর অভ্যাস হয়ে গেছে, বিছানায় পড়ে আছে তখনো।
চিন্তা করে, শ্বাশুড়ি এসে, ছেলে অফিসে যাওয়া পর্যন্ত হেসে হেসে সময় কাটাবে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ভালো মন্দ জানতে চাইবে, শরীর স্বাস্থের খবর নেবে; তারপর একা পেয়ে মাত্র জানতে চাইবে, ‘কোনো ভাল খবর আছে কিনা?’ মানে বাচ্চা-কাচ্চার খবর। বিয়ের পনেরো বিশ দিন পর থেকেই প্রশ্নটা শুরু হয়েছে। প্রথম ছ’মাস প্রশ্নটা তবু আসতো মিছরীর মতো মিষ্টি হয়ে। তার পর আসতে লাগলো মিছরীর ছুরির মতো খোঁচা দিতে দিতে। আর গত এক বছরতো প্রশ্নটা সরাসরি আসছে ছুরির মতো, কাটতে কাটতে।
শ্বাশুড়ী সাড়ে-এগারোটা নাগাদ এসে এদিক সেদিক ঘুরতে ঘুরতে দেখলেন ক’পিস পাউরুটি তখনও রয়ে গেছে খাবার টেবিলে। সকালে স্বামী-স্ত্রী দু’জনে এক সাথে ব্রেকফাস্ট করেছে আজ, সকাল সকাল উঠতে হয়েছে বলে। সুতন্নী তখন রান্না ঘরে শ্বাশুড়ীর জন্য রাধছে। শ্বাশুড়ী কাছে গিয়ে বললেন, “বউমা, দুপুরের রান্না কতো দূর?”
সুতন্নী হেসে সানন্দে জানালো, “এইতো মা, রান্না প্রায় শেষ। ডাল, ভাত মাংস, সীম ভাজি, আপনি খুব ইলিশ মাছ খেতে ভালবাসেন। আপনার ছেলে কাল নিজে নিব-িমার্কেটে গিয়ে এতÍ বড় বড় তিনটে ইলেশ মাছ নিয়ে এসেছে; খেতে বসলে আমি ক’পিস ভেজে দেবো, গরম গরম খাবেন, মা।”
মা বললেন, “এত কিছু আমার নাম করে … কেন করো? লোকে শুনলে ভাববে, বাব্বারে বুড়ি খায় কত?”
“না, না তা হবে কেন; এখানে আর বাইরের লোক কে আছে?”
“একা একা ঘরে বসে তুমিওতো ভাবতে পারো কখনো! হয়তো গল্পগুজব করতে করতে বলে ফেললে কাউকে!”
“আমি বলবো, আমার শ্বাশুড়ী অনেক খায়!”
“হাসি ঠাট্টার মধ্যে বলেওতো ফেলতে পারো?”
সুতন্নী চুপ করে থাকে। ও জানে স্পর্ক্যের নিগূড় ছায়ার নিরাপদে দাঁড়িয়ে ‘মা’ অনেক কঠিন ভাবে আহত করতে জানেন। রতন একবার বলেছিল, ‘আমার মা এমনই, কী করবো? মাকেতো আর বদলাতে পারবো না।’ কথাটার গভীর-অর্থ অনুধাবন করে সে দিনের সারাটা রাত কেঁদেছিল সুতন্নী। কথাটা আজ আর মনে নেই ওর, অতি সামান্যই কারণ, তবে সেটাই প্রথম এবং রতনের সামনে। পরে শোবার-ঘরে রাতে রতন বলেছিল, ‘সরি, মা এভাবেই কথা বলে।’
‘সরি’ শুনে রতনের জন্য করুনা হয়েছিল সুতন্নীর। বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান রতন; সুতন্নী বোঝো, ‘মায়ের’ নারী সুলভ নিরাপত্তাহীনতার জুজুবুড়ি রতনকে আস্তে আস্তে সমাজ সংসার থেকে দূরে ঠেলে সরিয়ে রেখে দিয়েছে। ও জানে ঘরে ওর জন্য ‘ঘরের-খাবার’ তৈরি আছে, ঘুমানোর জন্য আরামদায়ক বিছানা পাতা আছে, আর কিছু পাওয়ার বা চাওয়ার নেই এখানে।
নিরব দেখে ওর শ্বাশুড়ী বললো, “রাতে আর আমার জন্য ভাত রেঁধো না, বউমা।”
বাড়তি কথা বললেই আবারো এমন কিছু উনি বলে বসবেন, হয়তো, সুতন্নীর মনটা খারাপ হবে। তাই জানতে চাইলো, “রাতে রুটি খাবেন? ডায়াবেটিস বেড়েছে নাকি?”
মা হেসে বললেন, “না, না ডায়বেটিস না। রাতে এই চার পিস রুটি খেয়ে নেবো।”
শ্বাশুড়ির হাতে ক’টুকরো পাউরুটি চোখে পড়লো সুতন্নীর। “সেকি আপনি সকালের বাসি পাউরুটি রাতে খাবেন কেন। পাউরুটি খাবেন? তা না হয় আমি আনিয়ে নেবো!”
“না, লাগবে না। আমি এই রুটি কটাই খেয়ে নেবো। বেকার বেকার এগুলো নষ্ট করার দরকার কী!”
“কেন,মা। আমি সন্ধ্যায় বেরিয়ে … ”
মা কথা শেষ করতে দিলেন না। বাকি কথাটুকু শোনবার মতো আগ্রহ নেই তার। কারন তাতে তার নিজের কথাগুলো বলতে দেরি হয়ে যাবে। “ছেলে পেলে নেইতো তোমাদের! ছেলের কামাইয়ের দরদ তোমরা কী বুঝবে? ওর বাপ-দাদা চোদ্দ গুষ্টির কেউ কখনো চাকরী করেছে? লোক-জন খাটিয়ে জমিদারী করেছে, নবাবের মতো চলছে। আর আজ সেই বংশের ছেলে পরের ‘জন’ খাটছে! …. ” আরো অনেক কথা। সুতন্নী জানে সে সবে কানে না তোলাই ভালো।
পরের দিন থেকেই সুতন্নীর সংসারে শুরু হলো তিন বেলা রান্নার আয়োজন। সকালের রুটিও বানাতে হবে, পাউরুটি বা প্যাকেটের রুটি এনে ভেজে দিলে হবে না। তাতে সংসারে খরচ বাড়ে; অপচয় হয়, অপব্যায় হয়।
অবশেষে তিন দিন পর রতনের মা ফিরে যাবার আগের দুপুরে বউমার সাথে খেতে বসে জানতে চাইলো, “সুতন্নী, তুমিতো আর ডাক্তারের কাছে যাওনি?”
“কেন, মা?”
“বলেছিলাম না। একবার টেষ্ট করিয়ে এসো। বাচ্চা কাচ্চা হচ্ছে না কেন?”
সুতন্নী বোঝে এ কথায় তর্ক বিতর্ক করে কোনো লাভ নেই, এটাই ওর শ্বশুড়ির হাতে এখন খোঁচা দেওয়ার বড় একটা অস্ত্র। “আপনার ছেলেকে বলেছিলাম, ও বলে দুজন এক সাথে যাবো। তারপর আর সময় করে উঠতে পারছে না!”
“ওরতো যাওয়ার কোনো দরকার নেই। তুমি গিয়ে নিজের টেস্টটা করিয়ে আনলেইতো পারো!”
কথাটা বলে ওর শ্বাশুড়ি কিছুক্ষণ নিরবে বসে থাকে। এমনটাতো স্বাভাবিক নয়। সুতন্নীর মনে হলো, এই নিরবতা ঝড়ের পূর্বাভাস।
নিরবতা শেষ করে ওর শ্বাশুড়ি খুব আস্তে আস্তে বলে ওঠেন, “ও আমাদের একমাত্র সন্তান। এখন ওর আর কোনো ছেলে-মেয়ে না হলে ওর পরে আর ওর বাবার কোনো চিহ্ণ থাকবে না। নামও নেবেনা কেউ। বল এ দেখতে কারো ভালো লাগে?”
কোনো টোটকা বা তাবিজ-কবজে সুতন্নী বিশ্বাস করে না। সুতন্নীকেও রতন ভালবাসে ভীষণ। তবু সুতন্নী জোর দিয় বলে ওঠে, “আমার মধ্যে কোন দোষ নেই, মা; আপনি আপনার ছেলেকে বলেন চিকিৎসা করাতে।”
ওর শ্বাশুড়ি কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেষে ধীর গলায় কানে কানে কথা বলবার মতো করে বললেন, “তুমি কিভাবে এত সিওর হলে যে তোমার কোন দোষ নেই?”
নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে হলে এখন ওকে বিয়ের আগের একটা দোষ স্বিকার করতে হবে। একটা নির্বুদ্ধিতাকে সমাজ বলে পাপ, সেই পাপের কথা সে বলবে কি করে? অন্যায় বা দোষ স্বিকার করা যায়, তবে পাপ…
ওকে চুপ-চাপ দেখে মা বললেন, “তোমার কোনো বয় ফ্রেন্ড নেই?”