Image by Minhaj Ahmed from Pixabay

গফুরের দোতলা বাড়ির পাশের গলি


বউয়ের কাছ থেকে দুই ’শ টাকা নিয়ে গফুর বেরিয়েছিল চুল কাটাতে। তপনের সেলুনের পাশেই চাঁন মিঞার হোটেল। শীতের সকাল। হোটেলে সকালের নাস্তা খাওয়ার খদ্দেরদের ভিড়। তপন তখনো সেলুন খোলেনি। তিন-রাস্তার মোড়টাতে পুলিশ-ভ্যান আর পুলিশ সদস্যদের ঘোরা ঘুরি টের পাওয়া যাচ্ছে।
মাসে একবার চুল না কাটালে গফুরের মাথা কিট-কিট করে চুলকায়। গতকাল পেনশনের টাকাটা তুলে এনে মরিয়মের হাতে দিয়ে, মাথা চুলকোতে চুলকোতে গফুর বলেছিল, “কাল সকালে কটা টাকা দিয়ো, চুল কাটাব।“
ওর বউ, মরিয়াম টাকাকটা জিবের থুতু দিয়ে গুনে নিচ্ছিল। গফুর আদুরে গলায় বকা দেওয়ার ঢংয়ে বললো, “তোমাকে না কতবার বলেছি থুতু দিয়ে টাকা গুনতে নেই।”
মরিয়ম সে’ কথার পাশ দিয়ে না গিয়ে জানতে চাইলো, “ক’টাকা লাগে চুল কাটাতে?”
“এই এক শ’ আর ঐ আব্দুলের দোকানে বিরাশি টাকা … ”
মরিয়ম খেখিয়ে উঠলো, “ডাক্তার না তোমায় সিগারেট খেতে মানা করেছে?”
“আব্দুলের চায়ের দোকান, … সিগারেট নাতো, চা বিস্কুট এ সব।”
গফুরের হাতে দুটো এক ’শ টাকার নোট দিয়ে মরিয়াম বলে দিলো, “খবরদার খবরদার সিগারেট-বিড়ি খেওনা, একটা রিং পরানো আছে, এবার ব্যাথা উঠলে কিন্তু আর বাঁচানো যাবে না!”
সকাল সাতটা সাড়ে-সাতটা নাগাদ গফুর নোট দুটো পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো অফিসের জামা কাপড়ে, চুল কাটাতে। এই সময়েই সে গত বায়ান্নো বছর অফিসে বেরিয়েছে, ন’ মাস আগেও। এই সময়টাই বাড়ি থেকে বেরোনোর উপযুক্ত সময় বলে তার মনে হয়। বেরিয়েই সগিরের দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে, তা’ধরিয়ে টানতে টানতে রাজারবাগ মোড় পর্যন্ত চলে যেতো রোজ হেঁটে হেঁটে।
আব্দুলের চায়ের দোকানে ওর বাকি আছে বারো টাকা, সে টাকা পরে দিলেও হবে। আজ সগিরের দোকানে বাকি রাখা বেয়াল্লিশ টাকা শোধ করে দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে চললো তপনের সেলুনের দিকে। মরিয়ামের গত রাতের কথা মনে পড়লো। কানে যেন বেজে উঠলো, “ … এবার ব্যাথা উঠলে কিন্তু আর বাঁচানো যাবে না!” গফুর সিগারেটে জোরে একটা টান দিয়ে মনে মনে বলে ওঠে, ‘এখন আর বাঁচতে চায় কে?’
তপন তখনো দোকান খোলেনি। শীতের সকাল, তিন রাস্তার মোড়টাই ভরে উঠেছে চাঁন মিঞার হোটেলের নেহারির ঘ্রাণে। মনে হয় ওর তন্দুরের গরমেই মোড়টা উষ্ণ হয়ে আছে। দু চারটে পুলিশ নিজেদের গাড়ির পাশে ঘোরা ঘুরি করছে। রোজকার সকালের চেয়ে আজ লোক-জন একটু কম মনে হলো। একজন লম্বা-মত পুলিশকে দেখা গেলো চাঁন মিঞার হোটেলে ঢুকতে।
গফুর খবরের আগ্রহে, নাকি খাবারে গন্ধে হোটেলে ঢুকে পড়লো চট করে, বোঝা গেল না। পুলিশকে ঢুকতে দেখে হোটেলর লোকজন আর জনা ছয়েক কাস্টমার ছাড়া অন্যান্য সবাই খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে পড়লো দু মিনিটের মধ্যেই। লম্বা-মত পুলিশটা হোটেলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এমন ভাবে চারিদিকে তাকাচ্ছে, পেছনে দাঁড়িয়ে গফুরের মনে হলো সে যেন কাকে খুঁজছে।
গফুর এ এলাকায় পচিঁশ ছাব্বিশ বছর। প্রথমে ভাড়ার বাড়িতে, পরে গত সাত বছর যাবৎ নিজে একটা টিন সেডে দু কামরা বাড়ি বানিয়ে নিয়ে উঠে পড়েছিল। এখন সেখানেই ব্যাংক লোনে দোতলা বাড়ি। পরে দুই ছেলেকে দুটো তলা বরাদ্দ দিয়ে নিজে উপরে দুটো রুম করে নিয়ে বুড়ো বুড়ি থাকে। ওটাকে তিনতলা ধরা যায় না। বড় জোর আড়াই-তলা বলা যেতে পারে। সরকারি কাগজ-পত্রে ওটা দোতলাই।
পুলিশ ভদ্রলোকের কাছে দু-তিন জন বেয়ারা হাজির হয়ে গেল। গফুরও খুব উৎসুক, তাকিয়ে আছে সেই দিকে। বয়স্ব এক বেয়ারা, খবির, গফুরের কাছে এসে আপ্যায়ণ করলো, “নাস্তা খাবেন, ভাইজান?” গফুর ভালো করে শোনেওনি কথাটা। বললো, “হুম”
“আজ পায়াটা খুব ভালা হইয়ে, আপনেরে পায়া আর পরোটা দি, কেমন?”
গফুর পুলিশটার আগ্রহ বুঝে ওঠবার জন্য চারি দিকের আর কিছুতেই মন দিতে পারছে না। অন্যমনস্ক ভাবে বলার জন্যেই বলে উঠলো, “পরোটা না, পরোটা না, ফোল ফোলা দেখে দুটো তন্দুরি দে। খবির, এহানে কী হইছে কওতো; পুলিশ ঘুরতাছে?”
“আর কোয়েন না, ভাইজান, এই সগিরদের গলির মধ্যে নাহি এক বাড়িতে চোদ্দ মন পেয়াজ পাইছে।”
গফুর বলে ওঠে, “চোদ্দ মন পেয়াজ?” ও জানে এই বছর দেশে পেয়াজের ভালোই টান পড়েছে।
গফুর সরকারী চাকুরে, সারা জীবনই ও বাড়িতে পেপার নেয়। এখন রিটায়ার্ড মানুষ, সকালের পেপার ওর হাতে এসে পৌছায় দুপুরের দিকে। তারপর বাদ-বাদি সারাটা দিন, পেপার নিয়েই ও ব্যাস্ত থাকে। কাল পড়েছে: ’রংপুরে খোলা বাজারে পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা কেজি। আর গ্রাামাঞ্চলের হাট বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকা দরে। প্রতিবেশি দেশ ভারত পিয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই দেশের পিয়াজের বাজারে চলছে এই অস্থিরতা। পিয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে ভোক্তাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। ক্রেতাদের আশঙ্কা, যেভাবে দাম বাড়ছে, তাতে অচিরেই পিয়াজের দাম ৩০০ ছাড়াতে পারে।’
খবির ওকে একটা খালি টেবিল দেখিয়ে দিয়ে বলে গেল, “এহানে বয়েন ভাইজান। আমি পায়া আর তন্দুরি লয়া আইতাছি।” তারপর বাতাসে চিৎকার করে কাকে যেন বলে উঠলো, “ওই, একটা পায়া, পায়া আর দুটো তন্দুরি গরম গরম, জলদি।” হোটেলের কর্মব্যস্ততায় মিশে গেল খবির।
গফুরের মন পড়েছিল পুলিশ ভদ্রলোকটার দিকে। সে লোকটা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে ভারি গলায় ওয়ার্ডার দিলেন, “এক কাপ চা, অল্প চিনি।”
সঙ্গে সঙ্গে চা চলে আসলো তার টেবিলে।
গফুর নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে বসলো পুলিশের সামনের চেয়ারে। “স্যার, আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী।”
পুলিশ সদস্যটা তার গরম চায়ের কাপে একটা শব্দ-তোলা চড়া চুমুক দিয়ে নিজের হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলো।
গফুর আবার জানতে চায়, “পাওয়া গেলো কোন বাড়িতে?”
“আপনার বাসা কোনহানে?”
“এইতো, ও পাশের খনকা বাড়ি লেনের প্রথম চারটে বিল্ডিংয়ের পরের বাড়িটা।”
“ভাড়া?”
“না, না, আপনাদের দোয়ায়, নিজে বাড়ি করেছি আজ বছর সাতেক।”
“তাহলে, এই যে আপনার পাশে সগিরদের গলির শেষ মাথার বাড়িটা।”
“ও জব্বার সাহেবের বিল্ডিং? ক’তলা, স্যার?”
“চার তলায়, একটা মেয়ে মডেল ভাড়া থাকতো।”
গফুর অবাক হয়ে মুখ হা করে বলে, “মডেল? মেয়ে? চোদ্দ মন পিয়াজ! কিরে বাবা মডেল মজুদদারির ব্যবসা করতো?”
পুলিশ ভদ্রলোকটা এবার অবাক হলো, “চোদ্দ মন পিয়াজ?”
গফুর আরো বড় হাঁ করে জানতে চাইলা, “আরো?”
“কী বলছেন, চাচা, পেয়াজের জন্য আমরা এত গুলা …”
গফুর আগের মতো হাঁ অবস্তাতেই, “তাহলে?”
“আরে ভাই চোদ্দ শ’ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া গেছে!”
“কী! চোদ্দ শো পিস ইয়েবা? কোন বাড়ি?”
“কই কী, জব্বার সাহেবের বিল্ডিংয়ের চার তলায়।”
গফুর সায় দিয়ে বললো, “ঐ যে নাসরিন নামে একটা মডেল মেয়ে থাকতো জব্বার সাহেবের চার তলায়, ওর কথা বলছেন নাতো?”
পুলিশ লোকটা এবার শতগুনে উৎসাহিত হয়ে ওঠে, “হ্যা হ্যা, আপনি তাকে চেনেন নাকি?”
“হ্যা,তা এই পাড়ায় আজ চব্বিশ পঁচিশ বছর বসবাস করছি। নিজের একটা বাড়ি আছে। পাড়া প্রতিবেশীদের চিনে রাখবো না!”
“তাহলে চলেন, আপনাকে একটু আমার সাথে থানায় যেতে হবে”
গফুর একটুও না ঘাবড়ে জানালো, “কিন্তু আমার যে এখানে একটু কাজ আছে।”
ভদ্রলোক এবার পুলিশি গলায় বললো, “কী কাম আছে পাঁচ মিনিটের মধ্যে গুছায়া লন, আমাগো সাথে থানায় যাইতে হইবো আপনারে। মাইয়াডারে অহনও ধরা যায় নাই”

সরকারি অফিসের চাকুরেরা খুব ভাল করেই বোঝে যে দেয়ালেরও কান আছে। কারন অফিসের কারো কোনো কথা অপর কারো কানে গিয়ে পৌছাতে তেমন সময় লাগে না। এবার দেখা গেলো, সমাজ সংসারের নিয়মও তাই। বরং বলা যায় এখানে বাতাসে বাতাসে কথা ভেসে বেড়ায়। যার যেটা দরকার সেটা কানে তুলে নেয়।
মরিয়ম গিয়েছিল নীচে, মুদির দোকানে, বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল, খবরটা। মরিয়ম আর মুহূর্ত নষ্ট না করে প্রায় দৌড়ে দৌড়ে ফিরে আসে বাড়িতে। বড় ছেলে রাহা ইবনে গফুর পেশায় সিএ। সে তখনো বেরোয়নি ঘর থেকে। মরিয়াম ব্রেক-ফেল করা ফুললি লোডেড ট্রাকের মতো গিয়ে ঝপাস করে গোত্তা খেয়ে পড়লো তার ঘরে।
এক নিশ্বাসে বলে ফেললো তার শোনা সম্পূর্ণ কথা সচিত্র বর্নণা করবার মতো। ‘মরিয়মের কথা শুনে কখনোই মনে হবে না আপনি কথা শুনছেন, মনে হবে আপনি ঘটনা দেখছেন’: গফুরের ধারনা। ‘তবে ওর বর্ণনার মধ্যে নিজস্ব কল্পনা, ধারনা এবং পরিবেশনের জন্য রংয়ের ব্যবহারের কারনে মূল ঘটনার চাইতে ওর বিবৃত ঘটনা অনেক বেশী মনোহর ও উত্তেজক হয়ে ওঠে।’
এবার কিন্তু তা হলো নাা, কথা শুনে মনে হলো, ‘পিয়াজ মজুদদার হিসাবে ধারনা করে পুলিশ ভুল ক্রমে গফুরকে …
রাহা, ওদের বড় ছেলে মাথা ঠান্ডা রেখে, আগে জানতে চাইলো তার ছোট ভাই, “বাহা কই?”
বাহা ইবনে গফুর, পেশায় উকিল। বার কাইন্সিলের সদস্য, এখনো সিনিয়রের আন্ডরে এ্যসিস্টেন্ট। সে অনেক সকালে অফিসে বেরিয়ে যায়। কোর্ট-কাচারি এলাকায় তার অফিস। তখনো সে গিয়ে পৌছুতে পারেনি অফিসে, আরো তিন-চারটে স্টপেজ বাকি। পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠলো।
আধ-ঘন্টার মধ্যে মরিয়াম দুই পুত্রসহ থানায় গিয়ে হাজির। থানার ঠিকানা নিয়ে ওরা যেখানে পৌছুলো, সেখানে দিগন্ত বিস্তৃত একটা সিমেন্টে গড়া মেঝে মাঠের মতো পাতা, ছাদ নেই, চারি দিকে অনেক সবুজ গাছ আর আলো, তাই রোদ পড়ছে না কারো গায়ে এই দুপুর বেলাতেও। কাছ থেকে মনে হয় কোনো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বনে ওরা এসে পড়েছে।
মরিয়াম দুই ছেলেকে দু’হাতে ধরে নিয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়। ছেলে দুটো যে কেনো ছোট বাচ্চা হয়ে মায়ের হাত ধরে ঘুরছে, মরিয়াম বোঝে না। চিন্তাও করে না। দিগন্ত অবধি বিস্তৃত এই উন্মুক্ত থানায় বেশ কিছু পুলিশ চেয়ার টেবিলে বসে কাজ করছে। অনেকে আবার হাঁটা হাটি করছে চারি দিক। শত শত সাধারন মানুষ থানা সিমান্তের বনে ছোটাছুটি করছে নিজ নিজ কাজে। দ্রæত নিশ্বাস পড়ছে তাদের।
পুলিশ গুলো সাদা সাদা এপ্রন পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হয় এ যেন থানা নয়, কোনো হাসপাতাল!
মরিয়াম তার দুটো ছেলের হাত ধরে নিয়ে স্বামীকে খুঁজছে সেই হাসপাতাল-বনে। এদিক সেদিক চারিদিক হেঁটে হেঁটে। কোনো কোনো টেবিলে মোটা মোটা খাতাপত্র কোনো কোনোটায় বিশাল বিশাল দড়ি আর হাতের বেড়ি। কোনো টেবিলে টাইপ-রাইটার বা কম্পিউটার আবার কোনো কোনোটার উপর রাখা বেতের মোটা মোটা লাঠি। একটা টেবিলে দেখা গেলো দাবার ছক। সেই টেবিলের এক দিকে একজন বয়স্ক পুলিশ অফিসার। তার মুখো মুখি একজন পরিচিত রাজনীতিবিদ।
ওপাশ দিয়ে দ্রæত একজন উকিল দৌড়ে এসে ছুঁয়ে দিতে চাইলো একজন তরুন পুলিশকে, তবে ঠিক ছুঁয়ে ফেলবার আগেই তরুন পুলিশটা খিল খিল করে হেসে পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে পড়লো একটা কাগজ বোঝাই কাঠের আলমারির পেছনে। ঐ দূরে একজন কসাই চিৎকার করে উঠলো, ‘আমি কী করুম?’ এ দিকে ডান পাশ থেকে একটা জজ সাহেব তাঁর টেবিলে কাঠের হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে বলে চলেছেন, ‘ওয়ার্ডার, ওয়ার্ডার, এত কথা বললে আমি কাজ করবো কী ভাবে?’ তার পেছনে বিশাল একটা ছাতা নিয়ে দাঁড়ানো লোকটা ফিক করে হেসে ফেলে, ‘আপনার বসে বসে রায় দেওয়াটাও যদি কোনো কাজ হয়, তাহলে আমি কী করছি?’
চোখে কালো কাপড় বাঁধা দাড়িপাল্লা হাতে বিচারের নিষ্কলুষতার প্রতিকি সাদা মূর্তীটা ওপর থেকে একটু নিচে নেমে এসে হাসতে হাসতে বললেন, “রায় দেওয়ার এই কাজটা শেখবার জন্য ও অনেক পরিশ্রম করেছে। জীবনের শেষে যোগ করলে দেখা যাবে হয়তো, সে পরিশ্রম তোমার গোটা জীবনের শ্রমের সমান হবে।”
এত চেচামেচি-দৌড় ঝাপের মধ্যে দেখা গেলো ঈশান কোনের ছোট্ট একটা চৌকোন টেবিলে একটা সাপ লুডুর কোট। তার একপাশে এদিকে মুখ করে বসে একটা মোটা-সোটা দারোগা বা ডাক্তার গোছের পুলিশ আর এদিক পিঠ করে বসে সাপলুড়– খেলছে গফুর। গায়ে একটা কয়েদিদের পোশাক, মাথায় কয়েদিদের টুপি, সিনেমায় যেমন দেখা যায়। লম্বা-পানা পুলিশটা ওদের চার পাশে হাঁটা হাটি করছে পকেটে হাত দিয়ে। চোখে সন্দেহ।
বড় ছেলেটা হঠাৎ, “আব্বা” বলে চিৎকার করে মরিয়ামের হাত ছাড়িয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো গফুরকে পেছন থেকে। গফুর চট করে পেছন ফিরে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো হাসি মুখে। ছোট ছেলেটা সেই আদর দেখে মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ালের বাচ্চার মত মিউ মিউ করতে থাকে। গফুর, আজ সকালে দেখা রিটায়ার্ড মানুষটাই, তবে বাচ্চারা আর মরিয়াম দশ-পনেরো বছর আগর মতই হয়ে আছে। হাঁটা হাঁটি করা লম্বা-পানা পুলিশ সদস্যটা থমকে দাঁড়িয়ে।
মরিয়াম আরো খেয়াল করে, অদ্ভুদ ব্যাপার ওরা চারজন ছাড়া বাদ-বাকি সবাই মোবাইল ক্যামেরায় তোলা সেল্ফীর মত চিত্রার্পিত, হঠাৎ জমে যাওয়া ঝর্ণার মতো গতিশীলতার স্থিরচিত্র ।
গফুর অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “কী হলো, তোমরা সব এখানে?”
মরিয়ম বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে, “তোমার চেহারা দেখতে এসেছি। এখনো বাড়ি ফিরছোনা কেনো?”
“এই যে স্যার এখানে বসিয়ে রেখেছে সাপ-লুড়– খেলবার জন্য। দু এক হাত খেলে আসছি।”
ছোটটাও এবার হাত ছাড়িয়ে গিয়ে মুখ লুকালো বাপের কোলে।
গফুর বলে উঠে, “তোমার দু ছেলের থাকবার জন্য দোতলা একটা বাড়িতো করে রেখেছি, দুজনকে দুটো তলা দিয়ে দাও। তোমার জন্যেতো ফিস্কড ডিপোডিট আছেই। তাছাড়া মাসে মাসে বাড্ডার চারটে টিন-সেডের ভাড়াতো তুমিই পাবে, যত দিন বেঁচে থাকো।”
এবার হঠাৎ সেই মোটা দারোগা প্রশ্ন করে ওঠে, “এত কিছু করলে কি ভাবে সরকারি চাকরি করে?”
গফুর খেলার কোটের দিকে চেয়ে দেখে এবার তার চালটা চাললে সে গিয়ে পড়বে বড় সাপটার মুখে। সেই সাপের লেজটা গিয়ে পড়েছে আগুনের মধ্যে।
পকেটে মোবাইলটা বেজে ওঠার পর বাহা যে খবর পেলো তাতে সে বাস থেকে নেমে উল্টোমুখি বাস ধরে বাড়ি ফিরে দেখলো তখনো ওর মায়ের চোখে মুখে পানি দিয়ে দিয়ে হুস ফেরানোর চেষ্টা চলছে। বড় ভাই রাহা গেছে থানায়।
মরিয়াম জ্ঞাণ ফিরে পেয়ে চোখের সামনে বাহাকে দেখে আবারো জানালো সব কথা। সে উকিল তারই আগে যাওয়া দরকার থানায়। বাহা বলে, “এমনিতেই ধরে নিয়ে গেলো পুলিশ?”
“তাহলে তোর কী মনে হয়, তোর বাপ পেয়াজের মজুদদারি করতো?”
বাহার বউ বলে, “তা হোক, এই সময়ে বাড়ি পাঁচ দশ কেজি পেয়াজ নিয়ে আসলেওতো হতো!”
বড়-ভাই রাহা মোবাইলে জানিয়ে দিলো, দশ্চিন্তা কোনো কারণ নেই। ওরা ওর আব্বাকে নিয়ে গেছে কিছু জীজ্ঞাসাবাদের জন্য।
আপাত্ত সবাই শান্ত এবং দুশ্চিন্তা মুক্ত হলো। তবে চোর পালালে যেমন, মানুষ তদন্তে নামে চোর ঢুকলো কিভাবে! তেমন এবার উকিল সাহেব প্রশ্ন করে বসলেন, “কিন্তু পাড়ায় এত লোক থাকতে পুলিশ আব্বাকেই বা কেন নিয়ে গেল জীজ্ঞাসাবাদের জন্য।!”
মরিয়াম তখন একবার চিন্তা করে বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে, “তোর বাপতো আর মরে যায়নি, সে আসলে তাকেই প্রশ্নটা করিছ।” কথাটুকু বলে ফেলে ও হঠাৎই চুপ করে যায়। চলতি গাড়িতে হঠাৎ ব্রেক মারতে হলে যেমন গোত্তা খায় গাড়ি, চালকেরো ভীষন ধাক্কা খায়, চাকায় ঘসার শব্দ ওঠে, তেমন ধড়াস করে উঠেছে বুকের ভেতরটা। হায় হায়, এ কী বলে ফেললো ও! মনে পড়ে গেলো একটু আগে দ্যাখা স্বপ্নের কথা।
রাহা থানায় এসে বাপের খোঁজ পেয়ে, স্বস্তি নিয়ে বেরিয়ে খবর পেলো, এবার নাকি লবনের দামও বাড়বে? দোকানে দোকানে খবরটা পৌছে গিয়েছে বলেই লবন ঘন্টাখানেকের মধ্যেই হয়ে উঠেছে মহার্ঘ্য।বাড়ি ফেরার পথে আসে-পাশের প্রায় প্রতিটা মুদির দোকানে বলে কয়ে গড়ে ষাইট টাকা দরে জোগাড় করে আনতে পারলো নয় কেজি লবন।
সন্ধ্যে নামার পরপর গফুর বাড়ি ফিরে জানালো পাশের গলির মডেল মেয়েটাকে এরেস্ট করা গেছে, আর লবনের ক্রাইসিসটা সত্য নয়, গুজব।