পরতে পরতে চিত্রনাট্য

এখন চলচ্চিত্র মানেই সবাক চলচ্চিত্র। অর্থাৎ যে চিত্র চলৎ-শক্তি ও বাক-শক্তি সম্পন্ন। মানে যে ছবির চলার ও বলার ক্ষমতা আছে। ক্ষমতা তো আর থাকে না, বিভিন্ন যান্ত্রির কলা কৌশলের সাহায্যে তাতে ক্ষমতা যোগানো হয়। তা এই চিত্র চলে ফেরা করে নানা রকমের শব্দ শুনিয়ে কী করে? আমাদেরকে গল্প দেখিয়ে বিনোদন করে। গল্প দু রকমের: একটা সত্যি ঘটে যাওয়া বা ঘটছে এমন গল্প আর একটা বানানো গল্প বা ফিকশন। ইংরেজিতে বলে ফিকশন আর নন-ফিকশন। এই দু রকমের গল্প শোনাবার জন্যে কয়েক রকমের চলচ্চিত্র বানানো হয়। 

তাদের মধ্যে অন্যতম হলো পূর্ণ-দৈর্ঘ চলচ্চিত্র বা সিনেমা, স্বল্প-দৈর্ঘ চলচ্চিত্র বা সর্ট ফিল্ম, প্রামান্যচিত্র বা ডকুমেন্টারি ফিল্ম, বিজ্ঞাপন-চিত্র বা এ্যডভার্টাইজিং-ফিল্ম। টিভি-নাটক এবং সিরিয়ালও তো আসলে চলচ্চিত্রই। বর্তমানের ভিডিও গেমসগুলোকেও চলচ্চিত্রের মত করেই খেলানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরো আছে: মিউজিক ভিডিও, ভিডিও ক্লিপস, ইউ-টিউব ভিডিও। একেবারে সাম্প্রতিক সংযোজন, ওয়েব সিরিজ। এ সবইই চলচ্চিত্র গোত্রের। এই সব রকমের চলচ্চিত্রেই চলচ্চিত্র নির্মান সবটুকু কলা-কৌশল ব্যবহার করতে হয়। শুধু প্রয়োগ মাত্রার তফাৎ। তবে সবকটাতেই চিত্রনাট্য লাগে।

আপনি একটা চিত্রনাট্য লিখতে বসেছেন, কিন্তু কেনো চিত্রনাট্য লিখবেন? গল্প-কবিতা-উপন্যাসের মতো কেবলই আবেগের চোটে তো আর চিত্রনাট্য লিখতে বসা হয় না। চিত্রনাট্য হলো চলচ্চিত্র নির্মানের নীল-নক্সা–তার মধ্যে যেমন শিল্প সাহিত্য আছে তেমন যান্ত্রিক কলা-কৌশল প্রয়োগের টেকনিক্যাল জারগনসও* আছে। অর্থাৎ, চিত্রনাট্য লেখাটা নিছকই লেখা নয়। একটা শিল্প-রচনার পরিকল্পনা করা।

*jargon: special words or expressions that are used by a particular profession or group and are difficult for others to understand.

আপনি হয়তো নিজে কোনো চলচ্চিত্র বানাবেন বা অন্য কেউ চলচ্চিত্র বানাবে, সে আপনাকে চিত্রনাট্যটা লিখে দেওয়ার জন্য বলেছে। আবার, হয়তো আপনি একটা চিত্রনাট্য লিখছেন পরিচালকদের বা প্রযোজকদের কাছে দেখাবেন; চিত্রনাট্যটা বিক্রি করবার জন্যে। দুটোই আসলে চিত্রনাট্যই তবে দ্বিতীয়টাকে বলা হয় স্পেক-চিত্রনাট্য। (স্পেকুলেটিভ-স্ক্রিনপ্লে) বেচার জন্য লেখা, কারো পছন্দ হলে সে কিনে নেবে। আর শুটিংয়ের জন্যে তৈরি করা চিত্রনাট্যকে বলা হয় শুটিং-স্ক্রিপ্ট।
এখানে দুটো কথা মনে রাখতে হবে: এক, চলচ্চিত্র হয়নি যে খসড়া চিত্রনাট্যকে মোটেই চিত্রনাট্য বা স্ক্রিপ্ট বলা যাবে না, সেটা খসড়া চিত্রনাট্য। আর দুই, আমরা এখানে স্পেক চিত্রনাট্য নিয়ে কথা শুরু করবো।

— স্পেক-চিত্রনাট্যে সাধারন টেকনিক্যাল-জারগনস গুলো ব্যবহার করা হয় না। সেগুলো ব্যবহার করা হয় শুটিং-স্ক্রিপ্টে।

আগেই বলেছি গল্প দু রকমের, ইংরেজিতে বলে ফিকশন আর নন-ফিকশন। সত্যি ঘটনা আর বানানো ঘটনা। প্রামান্যচিত্র আর সংবাদচিত্রই সত্যি ঘটনা বা নন-ফিকশন নিয়ে তৈরি। এবং সাধারনত পূর্ণ দৈর্ঘ বা স্বল্প দৈর্ঘ চলচ্চিত্র; টিভির নাটক বা সিরিয়াল; ওয়েব সিরিজ সবগুলোই ফিকশন বা বানানো কাহিনি দিয়ে তৈরি। ‘সত্য গল্পের ভিত্তিতে‘ নির্মিত চলচ্চিত্রও আসল ঘটনার রং বাড়িয়ে কমিয়ে কাহিনি-সূত্রে ফেলে সাজানো হয়।
এই কাহিনি-সূত্রটা কী? কাহিনি-সূত্রটা হলো: ক চায় খ আর গ তাতে বাঁধা দেয়। ক গকে পরাজিত করে খকে পায়। এখানে ক মানে নায়ক; খ মানে নায়ক কিছু একটা পেতে চায়, অর্থাৎ তার চাওয়া; আর গ হলো ভিলেন, মানে সেই চাওয়ার পথে বাঁধা। সেই বাঁধাটা পেরিয়ে চাওয়াটা পাওয়ার কায়দাই হলো গল্প।
এই সূত্রের সব চাইতে সহজ গল্প হলো। ক–একটা বেকার মেধাবি ছেলে; খ–বড় লোকের আদুরে মেয়ে; আর গ–মেয়ের বাপ।

এই ক-খ-গ কাহিনিসূত্রের ওপরেই চলচ্চিত্রের সব গল্প দাঁড়িয়ে।

আপনি একটা চিত্রনাট্য লিখতে বসেছেন। নিশ্চয়ই একটা গল্প ফেঁদেছেন মাথায়? অথবা কোথোও থেকে গল্প একটা বেছে নিয়ে বসেছেন? এবার তাহলে প্রথমেই গল্পটার একটা লগলাইন লিখে ফেলুন।
লগলাইন বা সংক্ষিপ্তসার মানে, চলচ্চিত্রের জন্য লিখতে চাওয়া চিত্রনাট্যের কাহিনির সংক্ষিপ্তসার (একটা দুটো বাক্য)। পুরো চিত্রনাট্য পড়বার আগেই পাঠককে আকৃষ্ট করে তোলার জন্য এতে গল্পের মূল দ্বন্দ্বটা বর্ণনা করে হয়ে থাকে। যাতে যে কেউ লগলাইনটা পড়েই কাহিনিটার সারকথা বুঝতে পারে।
এবার লিখতে হবে কাহিনিটার সিনপসিস বা কাহিনিসংক্ষেপ। সিনপসিস কিন্তু মোটেই লগলাইন নয়। সংক্ষিপ্তসারে আপনি কাহিনিটার মূল দ্বন্দ্বটা বলেছেন। সিনপসিসে বা কাহিনিসংক্ষেপে আপনাকে খুব অল্প কথায় কাহিনিটা বলতে হবে।

একটা গল্প বেছে নিয়ে বা নিজে তৈরি করে নিয়ে কাহিনি-সূত্র মেনে গল্পটা সাজিয়ে নিয়েছেন। গল্পটার লগলাইন বা সংক্ষিপ্তসার আর সিনপসিস বা কাহিনিসংক্ষেপও তৈরি করে ফেলেছেন। মনে করিয়ে দিই; লগলাইন মানে এক-দু লাইনে গল্পটার মূল দ্বন্দটা বলা; সিনপসিস হলো খুবই ছোট করে গল্পটা বলে ফেলা।
এবার সিনেমার মতো করে বলবার জন্য আপনার গল্পটা সাজিয়ে ফেলতে হবে। এই গল্পটা সিনেমায় বলবার জন্য সাজিয়ে ফেলাকে বলা হয় ট্রিটমেন্ট। বাংলায় বলা যেতে পারে কাহিনির চলচ্চিত্রায়ণ সংস্কর‌ন।

একটা স্পেস-স্ক্রিপ্ট লিখবো বলে আমরা কাহিনি-সূত্র অনুসারে একটা গল্প মনোস্থির করে নিয়ে তার লগ-লাইন, সিনপসিস আর ট্রিটমেন্ট তৈরি করে নিয়ে বসেছি।
সিনেমার যাবতীয় বিজ্ঞানটা (যে কোনো বিজ্ঞানের মতোই) আন্তর্জাতিক মানে তৈরি, তাই ইংরেজিতে লেখা। আমরা আমাদের দেশে চিত্রনাট্য ব্যবহারযোগ্য করে লেখবার জন্য অবশ্যই তা বাংলায় লিখবো, মোটেই ইংরেজিতে লেখবার দরকার নেই। তবে সিনেমার বিজ্ঞান ও ব্যাকরণ বোঝবার জন্যে ওদের কায়দাটা রপ্ত করে নিতে হবে।
প্রথমেই স্ক্রিপ্ট লেখবার ফরমেটটা জানতে হবে।
স্ক্রিপ্ট লেখবার জন্য এখন অনেক সফটওয়ের নেটে পাওয়া যাবে। কয়েকটা ফ্রি, অন্যগুলো কিনে ব্যবহার করতে হয়।
আমরা এখানে দেখবো কীভাবে কম্পিউটারের এমএস-ওয়ার্ডে হলিউডি রীতিতে ফরমেট করে স্ক্রিপ্ট লেখা যায়।
একেবারে ছোট্ট করে বলতে গেলে, হলিউডে চিত্রনাট্য হলো ইংরাজির Courier 12pt font-এ লেটার সাইজের [৮১/২ ইঞ্চি আড়ে ও ১১ ইঞ্চি দীর্ঘ্য] উজ্জ্বল সাদা কাগজে single space-এ লেখা ৯০ থেকে ১২০ পৃষ্ঠার টাইপ করা বর্ণনা। বাধাই করবার জন্য তার বাঁ পাশে তিনটে করে ফুঁটা।
Courier ফন্টটা হলো moto type face, মানে এর প্রতিটা টাইপ সমান প্রস্তের, প্রতিটা টাইপ কাগজে সমান জায়গা নেয়। Courier 12pt font-এ লেটার সাইজের কাগজে single space-এ টাইপ করা চিত্রনাট্যের এক পৃষ্ঠার চিত্রায়িত দৃশ্যের গড় দৈর্ঘ্য ১ মিনিট। অর্থাৎ হলিউডের নিয়মে ৯০ থেকে ১২০ পৃষ্ঠার টাইপ করা চিত্রনাট্য দিয়ে বানানো সিনেমার গড় দৈর্ঘ্য ৯০ মিনিট থেকে ১২০ মিনিট। মানে দেড় থেকে দু’ঘন্টা।
(বাংলার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে এমন কোন সিন্ধান্তের কথা আমার জানা নেই। আমার ব্যক্তিগত চর্চার উপর নির্ভর করে বললাম ১৪ পয়েন্ট SutonnyMJ বা SutonnyOMJ ব্যবহার করা যেতে পারে। তাতে প্রতি পৃষ্ঠার চিত্রায়িত ব্যাপ্তিকাল প্রায় এক মিনিট।)
পৃষ্টা গুনে ব্যাপ্তিকাল অনুমানের এই কায়দাটা কেবলই স্পেক-স্ক্রিপ্টের ক্ষেত্রেই খাটে।

গল্প বলাটা আদিম একটা কলা বা শিল্প আর গল্প শোনাটাও আদিম বিনোদন। মানুষ যখন কথা বলতে পারতো না (ভাষা আবিস্কারের আগে) তখনই নাটকের জন্ম, নাটকে কী বলা হয়? একটা গল্প বলা হয়। বিশ্বের সর্বাধুনিক বিনোদন শিল্প সিনেমা এবং সিনেমার পথ ধরে একেবারে হালের ইউটিউবের ওয়েব সিরিজ। অর্থাৎ গল্প বলাটাই বিনোদনের শেষ কথা। গল্প বলার শিল্প বদলেছে, তাই গল্প বলবার ঢংটাও বদলেছে অনেক। সিনেমায় গল্প বলবার রীতিটাই সিনেমার ভাষা বা সিনেভাষ।
এখন আপনি যে কাহিনি নিয়ে তার চলচ্চিত্রায়ন সংস্করন করলেন সেটাকে সিনেমায় ভাষায় বলতে হবে — তা না হলে সেটাতো আর সিনেমা হলো না। ছবিতে ছবিতে গল্প বলা হয়ে গেলো।
প্রতিটা ভাষার যেমন লেখবার আর বলবার কিছু নিয়ম বা ব্যাকরণ তৈরি হয়ে যায়। তেমন এতদিনে সিনেমার ভাষারও লেখবার কিছু নিয়ম তৈরি হয়ে গেছে সেই নিয়মেই চিত্রনাট্য লেখা উচিৎ। তাতে একটা সার্বজনিক বোধ থাকে। আর সিনেভাষ–মানে সিনেমার মতো করে গল্প বলবার কায়দা? সেটা অবজার্ভেশন আর চর্চার বিষয়।
যে কোনো জীবিত ভাষার মতো সিনেভাষও প্রতি দিন একটু একটু করে বদলাচ্ছে। সে দিকে নজর রাখা দরকার আধুনিক চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে। সিনেভাষ যত রপ্ত থাকবে, চিত্রনাট্যে কাহিনি তত উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠবে।

চিত্রনাট্যে সংলাপের বিশেষ একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সিনেমার জন্য চিত্রনাট্যে সংলাপ লিখতে হলে মাঝে-সাঝেই চরিত্রের পাশে (পারেনথেটিক্যাল) ব্রাকেটের মধ্যে V.O অথবা O.S. বা O.C. লেখা হয়।
V.O. মানে “voice over”, সংলাপটা দৃশ্যের বাইরে থেকে ভেসে আসছে। অর্থাৎ, যে কথাটা বলছে সে এই দৃশ্যে নেই সে অন্য কোনো দৃশ্য থেকে বা অদৃশ্য কোথাও থেকে কথা বলছে।
যেমন রফিক টেলিফোনে কথা বলছে ময়নার সাথে। আমরা দেখছি রফিক টেলিফোনে কথা বলছে, আর তার কথার উত্তরে শুনতে পাচ্ছি ময়নার কথা। এখানে ময়নার সংলাপ V.O.।
O.S. মানে “off screen”, দৃশ্যের মধ্যে থেকেই কোনো চরিত্র কথা বলছে, তবে তাকে এখন দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ সে এই দৃশ্যেই আছে তবে এই শটে নেই — মানে ক্যামেরার বাইরে থেকে সে কথা বলছে।
O.C. মানে “off camera”, ক্যামেরার বাইরে- O.C. আসলে O.S., তবে শব্দটা পুরাতন,এখন আর এর ব্যবহার হয় না। আপনিও শব্দটা এড়িয়ে চলুন।