You are currently viewing কাজী রাফির গেঁথে তোলা একটা ছোটগল্প: গন্তব্য

কাজী রাফির গেঁথে তোলা একটা ছোটগল্প: গন্তব্য

আমরা যখন কাউকে বলি বা মনে মনে ভাবি লোকটা বড় ছোটলোক। সে কি সত্যই তার উচ্চতার জন্য! তাঁর কিছু গুণমানের কারণেই তাকে এভাবে বলা, বা এমন মনে করা। ঠিক তেমনই হাজার,পনেরো-শ শব্দের মধ্যে একটা কাহিনী গড় গড় করে বলে দিতে পারলেই তো আর ছোটগল্প হয়ে ওঠে না।

ছটা ইংরেজি শব্দ দিয়ে হেমিংওয়ে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন। আবার হেনরি উইলিয়ামসন ২,৪৩৬,২৪ শব্দে ১৫ খন্ডে লিখেছিলেন -আ ক্রনিক্যাল অফ এনসিয়েন্ট সানলাইট- নামে একটা উপন্যাস। বাংলায় প্রকাশিত এমন অনেক উপন্যাসের তকমায় ২০/২৫ হাজার শব্দের ছোটগল্প এবং বড় গল্প আছে। আবার ছোটগল্প মনে করেই লেখক সাত-আট পৃষ্ঠায় লিখে ফেলছেন সম্পূর্ণ একটা উপন্যাস।

মোদ্দা কথা  যে কোনো দৈর্ঘ্যেই সাহিত্য রচনা চলতে পারে। দৈর্ঘ্য মেপে ধরণ নির্ধারণের এই নিয়ম সম্ভবত তৈরি হয়েছে পত্র পত্রিকার স্থান সংকুলনের কথা বিবেচনা করে।  কারখানাগুলোর কাগজে নির্দিষ্ট মাপ, প্রকাশকদের বিচার-বুদ্ধি আর ব্যক্তিগত অ-বিজ্ঞান সন্মত বাজার গবেষণার ফলেও তেমন ছাপা বইয়ের আকারে স্থবিরতা।

তাই ছোটগল্প লিখতে বসলে লেখককে আগেই চিন্তা করে নিতে হয় কোন কাগজে বা পত্রিকায় কখন তার গল্পটা দেওয়া হবে। পত্রিকা ভেদে তো শব্দ সংখ্যার তারতম্য রয়েছেই, সময় বিবেচনাটাও একটা ব্যাপার। রেগুলার সংখ্যা নাকি ঈদ সংখ্যা।

উপন্যাস ছাপানোর ক্ষেত্রেও প্রকাশকের অনুরোধ মাথায় রাখতেই হয়। দু-তিন ফর্মার বই বেচে পোষায় না। আবার দশ-বারো ফর্মার বড় হলে, যা দাম পড়ে তাতে ক্রেতা কমে যায়।

পাঁচ-সাত বা আট-দশটা বা সত্যজিত রায়ের জ্ঞাণলব্ধ ‘এক-ডজন‘ ছোটগল্প নিয়ে একটা নয়-দশ ফর্মা বই বের করলেই সব দিকে ঠিক থাকে। লেখকের লাঠিও ভাঙ্গ না, আবার প্রকাশকের সাপটাও মরে। আজকাল ডিজিটাল নেট-ম্যাগে এই শব্দ সংখ্যার বাধ্যবাধকতা টিকিয়ে রাখবার কোনো দরকার নেই, আমার ধারণা।

তাই আমি চেষ্টা করি ছোটগল্পের বই থেকে গল্প পড়ার। সেখানেই লেখক অনেক সাচ্ছন্দ্যে হাত-পা ছড়িয়ে সাহিত্য সাধনার সুযোগ পায়।

পড়ছিলাম‘রূপডাঙ্গার সন্ধানে‘। সুস্বাস্থকর চেহারার ন-ফর্মার বই। সাতটা মেদহীন, জিরো ফিগারের গল্প, কাজী রাফির রচনাশৈলীর সুশৃঙ্খল বিন্যাসে সজ্জিত। রূপডাঙ্গার সন্ধানে নিজেই যেমন একাই চুয়াল্লিশ পৃষ্ঠা ব্যাপ্তি নিয়ে উপন্যাস হয়ে বসে আছে তেমনই অন্যান্য গুলো ছোটগল্পের শব্দ শৃঙ্খলের  তোয়াক্কা না করে ছাপা হয়ে আছে নিজের প্রয়োজনীয় স্থান টুকু দখল করে নিয়ে।

কথা বলবো, কাজী রাফির তেরো-সাড়ে তেরো শ শব্দে গেঁথে তোলা একটা ছোটগল্প, গন্তব্যের কথা। অদ্ভুদ ভাবে উপন্যাসিক কাজী রাফির কলমে সেটা উপন্যাস হতে হতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা মহৎ ছোটগল্প হয়েই রয়ে গেছে।

রেপ আমাদের বর্তমান সভ্যসমাজের একটা নিত্যনৈমিত্তিক সংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের, মানে এখানে আমি কেবল আমার বাংলাদেশের কথাই বলছি না, বলছি আমাদের গ্লোবাল ভিলেজের কথাই। আবার হ্যাস ট্যাগ মি টু আন্দোলনে বেরিয়ে আসলো আরো কল্পনাতিত মানুষজনের অকল্পনীয় কলঙ্কের কথা। অর্থাৎ রেপটা আজ আসলেই একটা বিদ্যমান আর্ন্তজাতিক সমস্যা।

গন্তব্যের -আসল পথ, সেটা তুলে ধরা। প্রতিদিন কাগজে আর স্ক্রিনে দেখা অসংখ্য ধর্ষণের সংবাদ দেখে শুনেও এত কষ্ট, এত মারমুখি হয়ে ওঠে নি হৃদয় যতটা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে ‘গন্তব্য’ পড়ে। এখানেই ধরা পড়ে সাংবাদিক আর সাহিত্যিকের কলমের ফারাক।

ঝিনুকে গন্তব্য

সেটা কিন্তু মোটেই দোষের নয় সাংবাদিকদের জন্য। সাংবাদিকরা হলেন ঘটে যাওয়া ঘটনার ডাক্তার। ওষুধ, অপারেশন, ময়নাতদন্তই তার কাজ। আর সাহিত্যিক হলেন ঘটনার অকুস্থলের বাসিন্দা। ঘটে যাওয়া ঘটনা তাকে বসে বসে দেখতেও হয় আবার বাড়ির দ্বয়িত্বশীল বড় হওয়ার কারণে অন্যদের স্বান্তনাও দিতে হয়। ঘটনা ঘটার আগে বাড়ির লোকজনকে সচেতন করতে হয়, সাবধানে রাখতে হয়।

তবে যারা সাংবাদিকও নয় আবার সাহিত্যিকও নয় অথচ লেখে, তারা কী। তারা নিছকই লেখক। সমাজের আপামর জনগনের মতো দর্শক।

গন্তব্যের তিশা একজন নেহায়েতই কৈশোর ছেড়ে সবে যৌবনে পা রাখা মেয়ে। তার মধ্যে সমাজ সম্পর্কে আদর্শ ধারণাগুলো এখনও পেঁকে ঝুনো হয়ে ওঠে নি। কাজী রাফির কলমের মুনশিয়ানায় মেয়েটা হাজার হাজার মানুষের মধ্যেও কীভাবে একা হয়ে ফিরছে জীবনের একটা মাত্র প্রতিরক্ষাহীন রাতে সেটাই ফুটে উঠেছে।

সব ভালোর বিশ্বে তার পরিবেশ, পরিস্থিতিই তাকে নিয়ে চলেছে মৃত্যুর দুয়ারে। ‘অসংখ্য সাদা বক পাখির ভারে নুয়ে আসা তার গ্রামের পাকুড় গাছটা থেকে যে বিষ্ঠা গন্ধ ছড়ায়…‘ সেই গন্ধময় জীবন থেকে বেরিয়ে এসে একা একা বন্ধুর পথ বেয়ে চলা অসম্ভব হয়ে ওঠে যেনো। তবু চেষ্টা। কারো গাড়িতে লিফ্ট নেওয়াও যায় না। তাতে হয় গাড়িওয়ালা সুযোগ নেবে, না হলে গাড়িওয়ালার সাথের নারীই তাকে বেশ্যা বলে সরিয়ে দেবে।

এই মহাসংকটের হাত থেকে সমাজকে মুক্ত করবার উপায় হয়তো লেখক নিজেই খুঁজছেন। ঝড় ঝঞ্ঝা – প্রকৃতি স্বয়ং এগিয়ে আসে, গাছ তাকে পথ দেখায়। অথচ মৃত্যু কোনো কথা বলে না, সে নিরব থেকে যায়। অসম্ভব এক মেধার স্ফুরণ ঠের পাই এখানে। লেখকের মস্তিষ্ক প্রকৃতির উপর ছেড়ে দিয়েছে তিশাকে তথা সমাজকে। রক্ষাও সে করে, শিক্ষাও সে-ই দেয়। আমরাও বসে আছি অপেক্ষায় সে কী বলে তাই শোনার জন্যে। এখানেই -শেষ হয়ে হইল না শেষ।

নাটকের আদলে লেখা গল্পটা একেবারেই মেদবর্জিত – জিরো ফিগার। অনেক ভিড়ের মধ্যেও তিশাকেই চোখে পড়ে -সে কাউন্টারে টিকিট চায়, তার গন্তব্যটাও বলে। অতি সাধারন চাওয়া। এক চাওয়া থেকেই জীবনের চরম বাস্তবতা শুরু হয়ে যায় তিশার জীবনে।

রূপক, গোটা গল্পটা কবিতার মতোই, যা বলে তার চাইতে অনেক বেশী বুঝিয়ে দেয়। অনেকক্ষণ পর্যন্ত মনে হবে হয়তো নাটকই। শেষ পর্যন্ত এটা নাটকের আদল নিয়েই চূড়ান্ত পরিনতির পথে এসে পৌঁছায়; তবু শেষে মৃত্যুই যখন চরিত্র হয়ে এসেও নির্বাক থেকে যায়, তখন স্পস্ট হয়ে ওঠে যে আমরা এতক্ষণ ধরে একটা ছোটগল্প পড়ছি।

Leave a Reply