সিচুয়ানের ভালো মানুষ

Der gute mensch von sezuan এর ভাষান্তর

নাটক: বের্টল্ড ব্রেখ্ট

চরিত্র

ওয়াং, একজন পানি বিক্রেতা বা পানিওয়ালা
তিনজন দেবতা
শেন টি / শুই তাই
ইয়াং সান, একজন বেকার/ কর্মহীন বিমানচালক
মিসেস ইয়াং, ইয়াং সানের মা
বিধবা শিন
আট জনের পরিবার
স্বামী
স্ত্রী
ভাইপো
ভাইঝি
ঠাকুদ্দা
ভাই
ভাই-বউ

কারখানার লিন
বাড়িওয়ালা মাই তেজু
পুলিশ
কার্পেট বিক্রেতা এবং তার স্ত্রী
বয়স্ক পতিতা
নাপিত শু ফের
বৌদ্ধ পুরোহিত
বেকার যুবক
ওয়েটার
একজন মানুষ-তাকে দেখা যাবে না

থিয়েটার

[সিচুয়ানের রাজধানী, এখন আধা-ইউরোপীয়]
সিচুয়ান প্রদেশের রূপক-কথকতা,
এখন সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই একই কাহিনি, মানুষ দ্বারা মানুষ শোষিত,
আজ আর এ ঘটনা কোন নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়।

প্র স্তা ব না

সিচুয়ানের রাজধানীর একটি রাস্তা

এখন সন্ধ্যা। ওয়াং, পানি বিক্রেতা, দর্শকদের কাছে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন।

ওয়াং:

এই সিচুয়ানের রাজধানী শহরে[1] আমি পানি বিক্রি করি। এ কিন্তু বড় যে সে সহজ কোন ব্যবসা না। গ্রীষ্মকালে, পানির আকালে আমাকে অনেক দূর ছুটতে হয়, পানি বয়ে আনবার জন্য। আর বর্ষায়ে পানি যখন সব জায়গায়ে থই থই, তখন আমার ব্যবসায়ে লালবাতি, পকেট গড়ের মাঠ। তবে আমাদের এই দেশে গরীব-দুঃখীর অভাব নেই। কথায় বলে  ঈশ্বর দেশটাকে এখনো টেনে নিয়ে চলেছে। গরু ব্যাপারীরা দেশময় চষে বেড়ায়, তাদের একজনের কাছে শুনলাম, উচ্চ পর্যায়ের ক’জন দেবতা আমাদের এই দেশের উপর দিয়েই যাবেন, শুনে অব্দি আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে বলে বোঝাতে পারবো না। অনেকেরই ধারনা এই সিচুয়ানের উপর দিয়েই তারা যাবেন। স্বর্গ রাজ্য নাকি আজকাল পৃথিবীর থেকে পাঠানো অভিযোগে অভিযোগে তটস্ত। গত টানা তিন দিন এ শহরে ঢোকার মুখে, বিষেশ করে এই সন্ধ্যার দিকটাতে আমি ওত পেতে বসে আছি যেন আমিই প্রথম তাদের যত্নআত্মি নিতে পারি। নইলে পরেতো আর ওনাদেরকে আমি আর ধরতেই পারবো না। শহরের সব মাথা মাথা লোকজন দেবতাদের ঘিরে ধরে থাকবে। ব্যাস্ত হয়ে পড়বে নিত্যদিনের চাহিদা নিয়ে। শুধু একবার যেন আমি ওনাদের চিনে উঠতে পারি ঠিক মত! ওনারা সব ক’জন যে এক সাথে আসবেন তেমনতো কোন কথা নেই। কেউ যেন তাদের চিনে না ফেলে এই চিন্তা করে ওনারা হয়তো সব আলাদা আলাদা আসবেন। ওই যে কিছু লোকজন, না না ওরা অবশ্যই নয়, দেখেতো মনে হচ্ছে ওরা সব দিনমজুর, কাজ করে বাড়ি ফিরছে। (কিছু দিনমজুর গোছের লোক মঞ্চ পার হয়, তাদের দেখে) মাল বইতে বইতে ওদের কাধ দুটো কেমন বেকেঁ ‘দ’ হয়ে গেছে। না না, এরা কেন মতে দেবতা হতেই পারে না। ঔ যে ওখানে দাঁড়িয়ে লোকটা, ওতো কিছুতেই কোন দেবতা হতেই পারে না, ওর আঙ্গুলে কালীর দাগ। বড়জোর ও ঔ সিমেন্ট ফ্যাকটারীর একজন কেরানীগোছের কিছু একটা হলেও হতে পারে। এমন কি ঐ যে ওখানে ঐ ভদ্রলোক গুলো (দুজন ভদ্রলোক হেটেঁ চলে যায়) ওদের দেখেও আমার কোন ভাবেই দেবতা-দেবতা মনে হয় না। ওদের দেখলে মনে হয় ওরা সারাক্ষণ কাউকে না কাউকে আচঁড়াচ্ছে, কামড়াচ্ছে, দেবতাদেরতো মোটেই ও সব করতে হয়না। কিন্তু ঐ তিনজনের দিকে একবার তাকিয়ে দেখো!  এক্কেবারে আলাদা জিনিস। খাই-দাইওয়ালা ঘরের মানুষ, চেহারায়ে ছেচড়ামিপানার কোন চিহ্ণ নেই, পায়ের জুতায়  ধুলাবালি ভরা, অর্থাৎ ওনারা অনেক দূর থেকে আসছেন। এইতো পেয়েছি এনারাই দেবতা। ধরা দাও, ধরা দাও, হে মহামহিম।

–তাদের সামনে সে ষষ্টাং প্রনামে শুয়ে পড়লো–

প্রথম দেবতা:

(সন্টুষ্ট চিত্তে)

আমাদের আসার আশায় ছিলে?

ওয়াং:

(ওদেরকে পানি পান করতে দেয়।)

কয়েক দিন ধরে বসে আছি। তবে আপনারা যে আসছেন, এ শুধু আমি একাই জানি।

প্রথম দেরতা:

বেশ, বেশ, তা এখন, আজ রাতটা কাটাবার মত একটা জায়গা আমাদের দরকার। তুমি কি আমাদের থাকবার মত একটা জায়গা জোগাড় করে দিতে পারো?

ওয়াং:

মাত্র একটা জায়গা? বলেন কি মুনিবর! এই গোটা শহর পড়ে আছে আপনার জন্য, এখানে যে কেউ আপনাকে বরন করে ধন্য হতে চাইবে, যে বাড়ীতে যেতে চাইবেন সে বাড়ীইতো আপনার! অসংখ্য বাড়ি আছে অসংখ্য।

–দেবতারা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে একে অপরের  দিকে দেখে নেয়–

প্রথম দেবতা:

হে পুত্র, কাছাকাছি কোন একটা বাড়ির খোঁজ করো। কাছাকাছি কোন একটা বাড়ি …পাওয়া যায় কিনা আগে তাই দেখো।

ওয়াং:

এখন আমার একটু একটু ভয় করছে, কোন একজনকে এই বিশেষ সুযোগটা করে দিয়ে আমি জানি আবার শহরের অন্য সব তাবড় তাবড় লোকের চক্ষুশূল না হয়ে পড়ি! একটামাত্র পরিবারকেই কিন্তু আমাদের কাজে লাগবে, ক্ষেয়াল করেছেন, অন্যান্য প্রায় কেউই আমাদের কোন কাজে লাগবেনা।

প্রথম দেবতা:

বেশ, তাহলে, আমরা না হয় তোমাকে আদেশ দিচ্ছি: যাও সব চাইতে কাছের বাড়িটাতে যাও।

ওয়াং:

এটাতো ফো সাহেবের বাড়ি! আপনারা এখানে একটু দাড়ান।

–ও ছুটে গিয়ে কাছের বাড়িটার দরজায়ে কড়া নাড়ে। কেউ একজন দরজাটা খোলে, বোঝা যায় যে সে অসন্মতি জানালো। ও ফিরে আসে, ইতস্তত–

ওয়াং:

দূর, যতসব ঝামেলা! ফো সাহেব এখন বাসায় নেই আর ওনার চারকটা কোন মতেই ওর সাহেবের অনুমতি ছাড়া কোন কাজ করবার সাহস পাচ্ছে না। সাহেবও জম্মের কড়া মানুষ। উনি এসে যখন শুনবেন তার ঘরের দুয়োর থেকে কারা সব ফিরে গেছে তখন সে মাথা ঘুরে পড়বে, কি বলেন তাইনা?

দেবতারা:

( মুচকিহাসে)

অবশ্যই, অবশ্যই!

ওয়াং:

আচ্ছা বেশ, আর দুটো মিনিট দাড়ান! পাশের বাড়িটা একজন বিধবা মহিলার, ওর নাম সু। আপনাদেরকে পেলে ওতো খুশীতে একেবারে পাগল হয়ে যাবে।

–ও পরের বাড়িটাতে দৌড়ে যায় এবং স্পষ্টতই বোঝা যায় সে বিফল হয়ে ফিরে আসে–

ওয়াং:

হুম, ওখানে গিয়েছিলাম, মহিলা বলে, ওর ঘরটা বেশ ছোট্ট, তেমন গোছ গাছও করা নেই। মনে হলো, বাড়ীটা আপনাদের জন্য তেমন উপযুক্ত নয় ভেবে বেশ লজ্জা পাচ্ছে। ঘর বাড়ী ঠিক-ঠাক গোছ-গাছ করে রাখতে না পারলে মহিলাদেরতো একটু লজ্জা পাবারই কথা। আমি একটু এক দৌড়ে  একবার ওই সচেং সাহেবের বাড়ী থেকে দেখে আসি।

দ্বিতীয় দেবতা:

আরে না না, ঘর ছোট-খাট হোক বা যেমনই হয় হোক, তাতে তেমন কোন অসুবিধা হবে না। ঐ মহিলাকেই গিয়ে বরং বলে আসো আমরা আসছি।

ওয়াং:

সে ঘরটা যে একেবারে নোংরা। মাকড়সার জালে আর কবুতরের গুয়ে ভরা। ওখানে আপনাদের পক্ষে থাকা সম্ভব হবে না।

দ্বিতীয় দেবতা:

তাতে কিছু যায় আসে না। মাকড়সা, কবুতর এ সবইতো ঈশ্বরের সৃষ্টি?

তৃতীয় দেবতা:

তা বেশতো। (ওয়াং-এর কাছ ঘেসে) তুমি একবার না হয় যাও সচেং সাহেবের কাছে। অথবা অন্য কোথাও দেখ, মাকড়সা তবু যাহোক একটু ঝেড়ে-ঝুড়ে নেওয়া যাবে, তবে ঐ কবুতরের বিষ্ঠার গন্ধ… না না তুমি অন্য কোথাও দেখ, বৎস।

–ওয়াং অন্যন্য দুয়েক বাড়ীর কড়া নেড়ে চেষ্টা করে ফিরে আসে–

একটা বাড়ী থেকে কন্ঠ ভেসে আসে:

আরে তোর দেবতাদের গুষ্টি কিলাই, আমার নিজের জ্বালায় আমি বাঁচি না। গোদের ওপর আবার বিষ ফোঁড়া। এখন যা ঘুতুতে দে, কাল আবার সক্কাল বেলা উঠে আমার অনেক কাজ।

ওয়াং:

(কাচু মাচু হয়ে ফিরে আসে)

মনে হলে সচেং সাহেবের মন মেজাজ আজ ঠিক তেমন ভালো না। তার ঘর ভরা মেহসার, আত্মিয়-স্বজন। মহামহিম, আপনাদের কথা শুনে সামনে এসে মুখ দেখাতেও এখন লজ্জ্বা পাচ্ছে। আমার ধারনা ওই বাড়ীর লোকজনের মধ্যেই কোন একটা ভীষণ খারাপ লোক আছে, যাকে সে আপনাদের সামনে আনতে চাইছে না। আসল কথা কী জানেনতো, ঐ সচেং নিজে কিন্তু আপনাদেরকে ভীষণ ভয়-ভীতি করে চলে, খুব ধার্মিক গোছের মানুষতো।

তৃতীয় দেবতা:

বলতে চাইছো, আমরা সব এককেক জন ভীষণ ভয়ংকর, কি বলো তাইতো?

ওয়াং:

খারাপ লোকের কাছে আপনারাতো অবশ্যই ভীষণ ভয়ংকর, কী তাই না?  সব্বাই জানে, কওয়ান[2] প্রদেশকে বছরের পর বছর কিভাবে পানির নিচে ডুবিয়ে রেখেছেন!

দ্বিতীয় দেবতা:

তাই নাকি? কেন, ডুবিয়ে রেখেছি বলতো?

ওয়াং:

আমি জানি, ওরা সব ধর্মহীন হয়ে পড়েছে, তাই।

দ্বিতীয় দেবতা:

ছাগল। ওরা নদীতে বাঁধ দেয়নিই, তাই[3]

প্রথম দেবতা:

দুৎ তারি! (ওয়াংকে বলে) হে বৎস বল, তুমি কি এখনো আশাবাদী?

ওয়াং:

কী বলছেন কী স্যার? আমাকে আর একটু দূরে কোন একটা বাড়ীতে যেতে হবে, এই আর কি। এখান থেকে একটু দূরে, আপনাদের জন্য থাকবার জায়গার কোন অভাব অছে নাকি, কত লোক জন সব ওখানে নিশ পিশ করছে আপনাদেরকে ঘরে রাখবার জন্য। তবে কিনা আজ বীধি হয়েছে বাম, বুঝলেনতো, সব কপাল কপাল। যাই, আমি একটু ও-দিকটা দেখে আসি গে।

–ওখান থেকে সরে একটু দূরে গিয়ে অনিশ্চিত ভাবে রাস্তায় দাড়িয়ে থাকে।–

তৃতীয় দেবতা:

আমার কিন্তু এখন সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে এ সব কপালের দোষ, ‘বীধি বাম’।

দ্বিতীয় দেবতা:

হ্যা, তা এই স্কুনে, কউনে আর সিচুয়ানে সব সময়ই কপালে দোষ দেখা দেয়, বীধি বাম হয়ে ওঠে প্রতিবার।সত্যি কথা বলতে কী, এসব জায়গায়, মনে হয়, কারো মধ্যেই আর ধর্মের বালাই বলে কিচ্ছু নেই।  আর আমরাও সে সবের মুখো মুখি হতে ভয় পাই। এখনো স্বিকার করেন না কেন যে আমাদের ‘মিশন’ বিফল।

প্রথম দেবতা:

যে কোন মুহূর্তেই আমরা কিছু ভালো মানুষ পেয়ে যাবো, ব্যপারটা এমন ছেলের হাতের মোয়া, এত সহজ ভাবাটা উচিৎ নয়।

তৃতীয় দেবতা:

কিন্তু রেজুলেশনে স্পষ্ট কলে বলা আছে: “পৃথিবীটা আগের মতই চলতে দেওয়া যেতে পারে যদি দেখা যায় যে অধিকাংশ মানুষই মানুষের কল্যাণকর কাজের জন্য জীবন যাপন করছে।” সিধে-সাদা কথায় যায় মানে, ভালো মানুষের সংখ্যা বেশী হলেই বিশ্বটাকে টিকিয়ে রাখা যায়, অন্যথ্যায় নয়। আমি যদি তেমন মারাত্মক ভুল না করে থাকি, তো বলতেই পারি, এই পানিওয়ালা মানুষটা তেমনই একজন ভালো মানুষ।

–কথাটা বলে সে এগিয়ে যায় পানিওয়ালা যেখানে এখনও দাড়িঁয়ে আছে সেখানে–

দ্বিতীয় দেবতা:

মহা ভুল, মহা ভুল।  ঐ পানিওয়ালা যখন ওর পানি মাপা চোংটা দিয়ে আমাদের জন্য পানি ঢেলে ঢেলে দিচ্ছিল, তখন একটা ব্যাপার আমার চোখে পড়ে।  এই যে সেই চোং। (চোংটা বের করে প্রথম দেবতাকে দেখায়।)

প্রথম দেবতা:

এতো দেখি দোতলা চোং।

দ্বিতীয় দেবতা:

মহা চুরির ব্যবস্থা।, প্রতারক।

প্রথম দেবতা:

তা বেশ, ভালো মানুষের নামের তালিকা থেকে ওর নামটা কেটে বাদ দাও। এটা মানুষ পূতিগন্ধময় হলে কি এসে যায়? আমাদের বিচারে ভালো এমন অনেক মানুষই খুজে পাওয়া যাবে। আমাদেরকে খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে, এই যা। দু’হাজার বছর ধরে ওরা গলা ফাটিয়ে চলেছে, ‘ না না, পৃথিবী আর মোটেই এভাবে চলতে পারে না; মানুষ আর নিজেরাও মানূষ নেই, অন্য কাউকে মানুষের মত থাকতে দেয় না।” আর এখন এই শেষ-মেষ আঙ্গুলের গাট গুনে বলা যাবে পৃথিবীর ক’জন মানুষ ধর্মের অনুশাষণ মেনে চলছে।

তৃতীয় দেবতা:

(ওয়াংকে)

রাতটা কাটাবার মত একটা জায়গা পাওয়া গেল না, না।

ওয়াং:

আপনার পক্ষে কঠিন নয় কিছুই! কী ভাবছেন, স্যার?  আমি আসলেই একটা আস্ত গাধা, ঠিক-ঠাক ভাবে একটা থাকবার জায়গাও খুজে বের করতে পারি না।

তৃতীয় দেবতা:

না না তা হবে কেন

–সে পেছনে সরে যায়–

ওয়াং:

ওনারা কিন্তু এর মধ্যেই সব কিছুই বুঝতে পারছেন। ( একটা ভদ্রলোকের সাথে কথা বলে) কিছু মনে করবেন না ভাই, আপনাকে এই রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে কথা বলছি, ভুল বুঝবেন না, আসলে, গোটা সিচুয়ান জুড়েই গত কয়েক বছর ধরে লোক মুখে জনা কয় উচ্চ শ্রেণীর দেবতাদের আগমনের কথা শোনা যাচ্ছিল, ওনারা আজ সত্যি সত্যিই এসে পড়েছেন এই একটু আগে। তা, শুধু আজ রাতটুকু ওনাদের একটা থাকবার ব্যবস্থা দরকার, শুধু আজকের এই রাতটুকু।কী হলো, চলে যাচ্ছেন? নিজের কথাটা একবার চিন্তা করে দেখুন। আপনার লোকসান হবে না। একবার ভেবে দেখুন, এতে আপনারই লাভের ওপর লাভ। গোটা জীবনের সাধনা, নিজের ঘরের একই ছাদের নিচে বসে সরা সরি দেবতাদের কাছে নিজের ভবিতব্য জেনে নেবার এমন চরম সুযোগ।সহজে পাওয়া যাবে না, স্যার। ভেবে দেখুন এমন সুযোগ সবার কপালে জোটে না!

–ভদ্রলোক পাশ কাটিয়ে চলে যায়–

ওয়াং:

(অন্যজনার দিকে তাকিয়ে)

স্যার, আপনিতো সব নিজর কানেই শুনলেন। আপনি কি পারবেন, হয়তো পারবেন, আপনার বাড়ীটাতে বাড়তি কোন রুম যদি থাকে। না মানে রাজভবনের দরকার নেই, যেমন তেমন থাকবার একটা জায়গা হলেই হয়। এতে কিন্তু সোয়াব-ও হবে।

লোকটা:

ও ভাই, তোমার কাছে কেমন সব দেবতারা এসে ভিড় করেছে তা’ আমি জানবো কেমন করে, বলো তো? কোন মানুষকে নিজের ঘরে নিয়ে জায়গা দিতে হলে একটা কিছুতো পেতে হবে, নাকি?

–লোকটা একটা তামাকের দোকানে যায়। ওয়াং দৌড়ে যায় দেবতাদের কাছে–

ওয়াং:

শেষ-মেষ একজনকে খুজে পেয়েছি, সে অবশ্যই আপনাদেরকে তার ঘরে নিয়ে যাবে।

–ওয়াং মাটিতে তার পানি মাপার চোংটা দেখতে পায়। ভয়ে ভয়ে একবার দেবতাদের দিকে ফিরে তাকায়। আবার দৌড়ে চলে যায় আগের জায়গায়।–

প্রথম দেবতা:

ওর কথায় কিন্তু তেমন জোর পাওয়া গেল না।

ওয়াং:

(যেই না লোকটা দোকান থেকে বেরিয়ে এলো।)

আচ্ছা বেশ, তা রুমের ব্যাপারে কি যেন বলছিলেন?

লোকটা:

আপনার কেন একবারও মনে হলো না যে আমি নিজেই কোন হোটেলে জীবন কাটাই!

প্রথম দেবতা:

আহারে, ওর একুল ওকুল দু’কুল গেল! আচ্ছা, এত ঝামেলা ঝঞ্ঝাট না বাড়িয়ে, আমরাতো লিস্ট থেকে এই সিজৎচুয়ানের নামটা কেটে বাদই দিতে পারি, না কি?

ওয়াং:

স্যার, আসলেই কিন্তু ওনারা তিন জন খুব উচ্চ শ্রেণীর দেবতা, সত্যি!  মন্দিরে মন্দিরে ওনাদের নামে নিয়মিত পূজা-অর্চ্চনা হয়ে চলেছে। আপনি যদি একবার একটু কষ্ট করে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে ওনাদেরকে নিজের ঘরে আমন্ত্রন জানান, তাহলে ওনারা হয়তো না করবেন না।!

লোকটা:

(হাসে)

আরে ভাই, তোমার হাব ভাব দেখে মনে হচ্ছে, তুমি কোন জেল পালানো ফেরারী জোৎচোরদের থকবার জন্য একটা আস্তানা খুজে বেড়াচ্ছে! (চলে যায়)

ওয়াং:

(লোকটাকে গালাগলি করে)

শয়োরের বাচ্চা, আমি জোৎচোরদের জন্য জায়গা খুজছি! খান….(বলতে গিয়ে থেমে যায়, দেবতাদের উপস্থিতির কথা মনে পড়ে যায়) ধম্ম-কম্মেরতো নাম নেই, দেখে নিস আজকের এই অবগেরাজ্জির জন্য তোরা কত শত বছর নরকের ফুটন্ত তেলে বেগুন ভাজা হোস, কুত্তার বাচ্চারা। আসল সোনা ফেলে পাথরে দুধ ঢালো, মন্ডা মিঠাই গেলও, গাধার বাচ্চারা। মরলে হাড়ে হাড়ে টের পাবি, নরকেও তোদের ঠাই হবে না। চোদ্দ গুষ্টি, সরকারী হাসপাতালের করিডোরের মতই, নরকের করিডোরে পড়ে পড়ে মরবি। তোরা এই দেশের কলংক। (সামান্য থামে) এখন শুধু ওই একঘর, নাচুনে মাগী, শেন টির বাড়ীটাই বাকী, আর কোন ইপায়ও নেই। সে অবশ্যই না বলতে পারবে না!

— উপর দিকে তাকিয়ে ‘শেন টি’ কে ডাকে, শেন টি দোতলার জানালায় এসে বাইরে উকি দেয়।–

ওয়াং

এই যে ওনারা সব ওদিকে। বলছিলাম যে, ওরা শুধু আজকের এই রাত টুকু থাকবে, আমিতো আর কোন জায়গা ফিট দিতে পারলাম না, তা তুমি যদি একটু দয়া করে… মহামান্য তিনজন.., শুধু আজকের রাতটুকু?

শেন টি:

কী বলছো কি। আমি আরো ভাবলাম আমার সেই  পিরিতের নাগরটাই বুঝি ডাকছে।  এ আবার কী সব উঠকো ঝামেলা; অন্য কোন জায়গা পেলে না?

ওয়াং:

তোমাকে এখন আর কি বলে বোঝাবো বল। শালার এই দেশটা আর দেশ নয় আস্ত একটা আস্তাকুড়ে হয়ে গেছে!

শেন টি:

আচ্ছা, তাহলেতো ও আসলে আবার আমাকে একটু লুকিয়ে পড়তে হবে। আমাকে না পেয়ে ও অন্য কোথাও গিয়ে মুখ মারতে বসবে জানি। তবে কিনা আজ আমাকে নিয়ে একটু বের হবে বলেছিল… সে যাকগে।

ওয়াং:

তাহলেতো এখনই আমরা উপরে চলে আসতে পারি?

শেন টি:

বেশতো, তবে কিন্তু চুপটি করে মুখ বন্ধ করে বসে থাকতে হবে কিছুক্ষণ। তা’ ওদের সাথে একটু মন খুলে খোলা মেলা আলাপ করতে পারবো তো, নাকি?

ওয়াং:

খবরদার, ওনারা যেন মোটেই তোমার কাজকামের ব্যাপারে কিছু টের পেতে না পায়। না না, থাক, আমরা বরং ততক্ষণ এই রাস্তায় অপেক্ষা করি। তুমি কিন্তু আবার  ঐ  নাগরের সাথে চলে যেওনা। বুঝলেতো?

শেন টি:

তুমিতো সব জানোই, আমার হাতের অবস্থাতো তেমন একটা ভালো না, টানা টানির মধ্যেই কষ্টে সিষ্টে জীবন চালাই।  কাল আবার আমার বাড়ীওয়ালা আসবার কথা, ভাড়া দিতে না পারলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে।

ওয়াং:

আচ্ছা, এই কী তোমার  গীত গাওনের সময়।

শেন টি:

না না এমনি বলছি, মাথা যার ব্যাথা তার। মহারাজের বিয়ের ভোজেও পেট কামড়াতে পারে, বুঝলে। ঠিক আছে ঠিক আছে চিন্তা করো না, ওরা আজ রাতটা আমার এখানেই থাকবে, সমস্যা হবে না। (তাকে আলো নিভিয়ে দিতে দেখা গেল ।)

প্রথম দেবতা:

ওর উপরতো আর ভরসা করা যায় না!

–ওরা ওয়াং-এর দিকে এগিয়ে আসে।–

ওয়াং:

(পেছনে ওদের দেখে বলতে শুরু করে)

একটা জায়গা অবশ্য পাওয়া গেছে। (কপালের ঘাম মোছে।)

দেবতারা:

পাওয়া গেল? চল চল গিয়ে দেখি তাহলে।

ওয়াং:

এত তাড়া হুড়োর কিছু নেই। ধীরে সুস্থে চলেন। রুমটা একটু গোছ-গাছ করছে, করে নিক।

তৃতীয় দেবতা:

ঠিক আছে, ততক্ষণ আমরা না হয় এখানে একটু বসে জিরিয়ে নিই।

ওয়াং:

আমার দুশ্চিন্তা, কিছুক্ষনের মধ্যেই না আবার এখানে মানুষের জটলা লেগে যায়। বরং ভালো হয় যদি একটু কষ্ট করে ওপাশটায় গিয়ে আপনারা রেস্ট করেন।

দ্বিতীয় দেবতা:

আরে ভাই, আমরাতো মানুষ জনের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেই এ ধরা ধামে এসেছি। ওদের সাথে দেখা না হলে হবে কী করে?

ওয়াং:

সে জন্যতো একটা উপযুক্ত সময় লাগে….নাকি?

দ্বিতীয় দেবতা:

আমরা অবশ্য এত তাড়াতাড়ি কাবু হইনি।

ওয়াং:

তার মানে আপনারা চাইচ্ছেন সিচুয়ানটা আপনাদেরকে একটু ঘুরিয়ে দেখাই আজ রাতেই, নাকি? চলেন তাহলে একটু হেঁটে হেঁটে ঘুরে ফিরে আসি।

তৃতীয় দেবতা:

আজকে এর মধ্যেই আমরা যথেষ্ট হাটাহাটি করে ফেলেছি। (হাসি হাসি মুখে) তারপরেও যদি তুমি আমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে চাও, তো ঠিক আছে, আমরা যেতে পারি।

–ওরা পেছন দিকে চলে যায়–

তৃতীয় দেবতা:

এখন চলবেতো, কি বলো?

–দেবতারা একটা দোরগোড়ায় গিয়ে বসে। ওয়াং তার সামান্য দূরে গিয়ে মাটির উপরে বসে পড়ে।–

ওয়াং:

(গভীর একটা স্বাস নিয়ে)

আপনাদের থাকবার ব্যবস্থা করা হলে একটা অবিবাহিত মহিলার সাথে। এই সিজৎচুয়ানের মধ্যে—সব চাইতে ভালো মানুষ—এই মহিলা।

তৃতীয় দেবতা:

তা বেশ

ওয়াং:

(দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলে)

একটু আগে যখন আমি ঐ আমার পানি মাপার চোংটা তুলে নিলাম, ওনারা আমার দিকে এমন অবাক হয়ে দেখছিল, যে কি বলবো। ওনারা কি আমার উল্টা-পাল্পা কিছু বুঝতে পেরেছেন, নাকি?  তার পর থেকে আমি কেন জানি ঠিক করে তাকাতে পারছিনা ওনাদের দিকে।

তৃতীয় দেবতা:

তুমি বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছো।

ওয়াং:

ঐ একটু দৌড়-ঝাপ গেলতো।

প্রথম দেবতা:

এখানে মানুষ জনের জীবন বেশ কষ্টের মধ্যেই কাটছে মনে হয়?

ওয়াং:

হ্যা তা বলতে হবে, ভালো মানুষদের জীবন কষ্টের মধ্যেই কাটছে।

প্রথম দেবতা:

(গম্ভীর ভাবে)

তোমার নিজের জীবনের কথা বলো।

ওয়াং:

আমি কিন্তু ঠিকই বুঝতে পেরেছি আপনারা কি বলতে চাইছেন! আমি নিজে তেমন একটা খুব ভালো মানুষ নই ঠিকই। তবে আমার জীনবটাও কিন্তু কম কষ্টের মধ্যে কাটছে না।

–এমন সময় একজন ভদ্রলোক এসে শেন টির জানালার নীচে দাড়িয়ে কয়েবার জোরে জোরে শীষ বাজায়। প্রতিবারই ওয়াং চমকে উঠে–

তৃতীয় দেবতা:

(মোলায়েম কন্ঠে ওয়াংকে বলে)

মনে হয় ও চলেই গেল।

ওয়াং:

(বিভ্রান্তের মত বলে।)

তাইতো মনে হলো।

–কাঁধ থেকে পানির মসকটা নামিয়ে রেখে, ওয়াং উঠে দৌড়ে গেল মোড়ের দিকে। এর মধ্যে লোকটা চলে যায়, শেন টি দোর খুলে বেরিয়ে এসে মৃদু কন্ঠে ডাকে ‘ওয়াং!’ খুঁজতে দূরে চলে যায়। ওয়াং-ও এবার মৃদু কন্ঠে ডাক দেয় ‘শেন টি!’ কোনো সাড়া শব্দ পায় না।–

ওয়াং:

আমাকে এমন বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে মাগীটা চম্পট দিল!! ও ঔ ওর ভাড়ার টাকার জোগাড়েই গেছে মনে হয়, অর্থাৎ এই মান্যবর অতিথীদের রাখবার মত কোন জায়গা খুঁজে বের করবার আর কোন উপায় আমার হাতে নেই। ওনারা ক্লান্ত তবু  আমার কথায় ভরসা করে এখনো অপেক্ষা করে আছেন। এখন আবার তাদের সামনে ফিরে গিয়ে যে বলবো  কোন কাজ হলো না সে মুখ আমার নেই। আমার নিজেরই থাকবার জায়গা, মানে সোয়ারেজের একটা অব্যাবহারিত পাইপ, সেখানে তাদের নিয়ে রাখবার কথাতো কল্পনাও করা যায় না। তাছাড়া, দেবতারা নিশ্চয় এমন কোন ঠগ মানুষের সাথে রাত কাটাতে চাইবেন না যাকে কিনা মাপে চুরি করতে হাতে-নাতে ধরে ফেলেছেন নিজেরাই। না বাবা আমি আর কোন মতেই ওদিকে ফিরে যাচ্ছিনা। তবে আমার পানি বওয়া মশকটা যে আবার ওখানে ফেলে এসেছি, এখন কী করি?  না ওটা আনতে যাওয়ার জন্য ওখানে ফিরে যাওয়ার মত বুকের পাটা আমার নেই। যে সব দেবতাদের আমি এত মান্নি করে আসছি, আমি যখন তাদেরই কোন কাজে লাগতে পারলাম না, তখন  সিচুয়ান ছেড়ে অন্য কোথাও , ওদের চোখের বাইরে চলে যাবো।

–ও চলে যায়। শেন টি ফিরে এসে খুঁজতে থাকে ওয়াংকে। অন্য পাশে এসে দেখতে পায় দেবতাদের–

শেন টি

আপনারাই বুঝি সেই মহামান্য অতিথী তিন জন? আমি শেন টি। আপনারা আমার সামান্য কুঠিরে যদি রাতটা কাটান, তাহলে আমি ধন্য হব

তৃতীয় দেবতা:

তা সেই, পানি বিক্রেতা ছেলেটা গেল কোথায়?

শেন টি

কোথায় যে গেল, চলে আসবে নিশ্চয়।

প্রথম দেবতা:

ও মনে হয় ভেবে নিয়েছে, তুমিও আর আসছো না, তাই আর এখানে ফিরে আসবার সাহস হয়নি।

তৃতীয় দেবতা:

(মসকটা তুলে নেয়)

এটা তোমার বাড়ীতেই তুলে রেখে দিও। ওর কাজের জিনিস এটা।

–শেন টির পিছু পিছু ওরা ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। আধার নেমে আসে, আবার আলোকিত হয়ে ওঠে, এখন ভোর সকাল। আবার, শেন টির হাতে ধরা কুপের আলো অনুসরণ করে,  দোর পেরিয়ে ওরা সবাই ঘর খেকে বের হয়ে আসে বাইরে। এবার ওদের বিদায় নেবার পালা–

প্রথম দেবতা:

শেন টি, তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। তোমার এই আতিথেয়তায় আমরা সত্যি মুগ্ধ, তোমার এই সদাচরনের কথা আমরা সর্বদাই মনে রাখবো। মসকটা ওই পানি বিক্রেতাকে ফিরিয়ে দিও আর একটা ভালো মানুষ খুঁজে বের করে দেওয়ার জন্য ওকেও আমাদের হয়ে ধন্যবাদ জানিও ।

শেন টি

না না, ভাই, আপনারা ভুল বুজছেন। আমি কোন ভালো মানুষ নই। আসল কথাটা তাহলে খুলেই বলি: ওয়াং যখন প্রথম আপনাদেরকে রাখবার কথা বললো তো তখন আমি একটু দোনোমোনো করেছিলাম।

প্রথম দেবতা:

যার শেষ ভালো তার সব ভালো, দোনোমোনো করাতে কিছু যায় আসে না। মনে রেখ, শুধুমাত্র একটা রাত থাকবার জায়গা নয়, তার চাইতেও অনেক বেশী কিছু তুমি আমাদের দিয়েছ। অনেক দেবতাগণ সন্দেহ পোষণ করেন – এমন কী আমাদের মধ্যেও কোন কোন দেবতা –সন্দেহ পোষণ করেন, যে পৃথিবীতে এখন আর কোনই ভালো মানুষ নেই। সেই প্রশ্নের সদুত্তর খুঁজে পাওয়াটাই আমাদের এবারকার মর্ত্তলোক ভ্রমনের মূল উদ্দেশ্য। এখন আমরা তোমার মধ্যে সেই ভালো মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছি। ব্যাস এখন আমাদের কাজ শেষ, সানন্দে ফিরে যাবো। ভালো থাকো।

শেন টি:

হে মহামহিমগণ, একটু দাড়ান। আমি কিন্তু আসলেই জোর গলায় বলতে পারছি না যে আমি একজন ভালো মানুষ। তবে আমি অবশ্যই ভালো হয়ে জীবন কাটাতে চাই, কিন্তু তাতে কি আর আমি আমার ঘরের ভাড়া দিতে পারবো? আচ্ছা তাহলে আপনাদের সামনে আমি স্বিকার করছি: বেঁচে থাকবার জন্য আমি প্রতি দিনই  আমাকে বিক্রি করি, তারপরও কিন্তু আমি স্বচ্ছল নই। আরো অনেকে আছে আমার মতই, আমি যে একা এমন তা নয়। আমিও অন্য সবার মতই কিছু না কিছু কাজ করে বেঁচে থাকতে চাই! আমিও সত্য কথা বলতে চাই, আমার মা বাবার মুখ উজ্জ্বল করবার মত কাজ করে গৌরব কুড়াতে চাই। আমি জানি প্রতিবেশীর সাজানো সংসার দেখে  লোভ করা কোন ভালো কথা নয়। একটা পুরুষের কাছে বিস্বস্ত থেকে, তার সাথে জীবনটা কাটিয়ে দেওয় ভীষণ শান্তির। আমিও কাউকে নষ্ট-ভ্রষ্ট করতে চাই না, চাইনা অসহায় কোন মানুষকে সুযোগে পেয়ে লুট-পাট করে খেতে। কিন্তু কীভাবে? প্রশ্ন একটাই, কীভাবে? আমি ভালো মানুষ হবো কী ভাবে।

প্রথম দেবতা:

তুমি এতক্ষণ যা বললে, শেন টি, এই সব প্রশ্নই কিন্তু একটা ভালো মিানুষের আত্মার কথা।

তৃতীয় দেবতা:

শেন টি, এখন তাহলে চলি! আর হ্যা, পানিওয়ালাকে ধন্যবাদ জানিও। তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে, সে খুব ভালো একজন বন্ধুর মতই কাজ করেছে।

দ্বিতীয় দেবতা:

আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ও ঠিক এ সবের উপযুক্ত মানুষ নয়।

তৃতীয় দেবতা:

তাহয়ে আসি, ভালো থেক!

প্রথম দেবতা:

সব কথার শেষ কথা, ভালো হয়ে থাক, শেন টি, এবার তাহলে আসি!

–দেবতারা চলে যাবার জন্য ঘুরে দাড়ায়, হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাতে থাকে–

শেন টি:

(উদ্বিগ্ন)

এই যে, মহামহিমগণ,  আমি কিন্তু এখনো  আমার ব্যপারে দ্বিধাগ্রস্ত! সব কিছু এমন অগ্নি মূল্য  এর মধ্যে ভালো থাকবো কি ভাবে, কী জানি!

দ্বিতীয় দেবতা:

এ ব্যাপারে আমাদের কিছুই করবার নেই, অর্থনীতিতে নাক গলানো আমাদের কাজ নয়!

তৃতীয় দেবতা:

আচ্ছা আচ্ছা, এক মিনিট,  হয়তো একটু ধনী হলে ও আর এমন ভালো মানুষ থাকবে না!

দ্বিতীয় দেবতা:

কিন্তু তাকেতো আমরা কোন কিছু দিয়ে যেতে পারবোনা। ওপরে গিয়ে কিন্তু আবার সব হিসাবপত্র মেলাতে পারবো না।

প্রথম দেবতা:

তা পারবো না কেন?

–তিনজন কানে কানে কথা বলে কিছু একটা ঠিক করে নিল–

প্রথম দেবতা:

(শেন টির সামনে বিব্রত)

তুমি বলছিলে, তুমি নাকি ঘরভাড়াটাও দিতে পারোনি। আমরাতো আর একেবারে চেয়ে মেঙ্গে খাওয়া পার্টি নই,  তোমার ঘরে আমরা ছিলাম, তা তার একটা ভাড়া টারা দেব না, তা কি করে হয়। (দেবতা তাকে কিছু টাকা দেয়) তবে মা, অন্য কাউকেই বলিস না, খারাপ মানুষ নোংরা কথা ছড়াতে পারে, খবরদার, সাবধান!

দ্বিতীয় দেবতা:

তাতো বলতেই পারে!

প্রথম দেবতা:

না না, এটা চলে, অনুমোদিত! সন্দেহের কিছু নেই, ঘর ভাড়া হিসাবেতো আমরা দিতেই পারি। বিধানের নিয়মেও এতে কোন দোষ নেই। বেশ, তাহলে এখন আমরা আসি!

–দেবতা তিন জন দ্রুত চলে যায়–

[1] নাট্যকার সিচুয়ানের রাজধানীর কথা বলেছেন, তবে সে শহরের নাম উল্লেখ করেননি। সিচুয়ান প্রদেশের রাজধানী শহর চেঙতু [chengdu]

[2] চায়না বা চীন দেশে কওয়ান [Kwan] নামে কোন প্রদেশ নেই, এই রকম কাছাকাছি উচ্চারনের কিছু শহর আছে।

[3] দ্বিতীয় দেবতার অন্তঃদৃষ্টি অপেক্ষাকৃত প্রখর।  পরে তিনিই ওয়াংয়ের মগের চুরিটাও ধরে ছিলেন।

[এখানে আংশিক প্রকাশ করা হলো। প্রয়োজনে যোগাযোগ করেন।]