লে ডি  চ্যা টা র্লী: তার প্রেম ও প্রেমিক

ডি এইচ লরেন্সের “লেডি চ্যাটার্লী’স লাভার“

এক
নিঃসন্দেহে সময়টা দুঃখের, তাই আমরা কোন রকম দুঃখে কষ্ট পাবো না। মহা প্রলয়ে তান্ডবলীলা ঘটে গেছে, আমাদের চারিপাশে ধ্বংসস্তুপ, ভগ্নাশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা, খোপে খোপে নতুন বাসা বুনছি, বুকে ধুকু-পুকু নতুন কিছুর স্বপ্ন। বলাটা খুব সহজ, কাজটা তেমন সহজ নয় মোটেই: আগামীর পথটা বন্ধুর: ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবো, প্রয়োজনে বুকে হেঁটে পার হবো সব চড়াই।বাঁচতে হবে, যতই আসুক ঝড়-ঝঞ্জা।
মোটামুটি ভাবে লেডি চ্যাটার্লীর অবস্তাও কম বেশী এই একরকমই, অন্য দশজনার মতই। যুদ্ধ যেন তার মাথায় বাজ ফেলে গেছে। শিক্ষা হলো বেশ, বেঁচে থাকার অর্থ ঠেকে ঠেকে শেখা। ১৯১৭-তে ক্লির্ফোড চ্যাটার্লীর সাথে তার বিয়ে, ছুটি নিয়ে মাসখানিকের জন্য তখন ক্লির্ফোড বাড়ী এসেছিল।গোটা মাসটাই কাটলো মধুচন্দ্রিমায়ে।তারপর ওর ফিরে যাওয়ার পালা, গেল ফ্ল্যান্ডারে : মাসছয়েক পরই তাকে ইংল্যান্ড ফেরৎ পাঠানো হলো।তখন ক্লির্ফোডের বয়স উনত্রিশ, আর তার স্ত্রী, কন্সট্যান্সের তেইশ বছর। অসম্ভব তার জীবনী শক্তি। মরতে মরতে বেচেঁ ফিরেছে সে, দু’জন আবার এক সাথে, কাছা-কছি সারাক্ষণ ।তবে পরের দুটো বছর চললো চিকিৎসা। তারপর এক সময় ডাক্টার ঘোষণা দিলেন, সে এখন পুরোপুরি সুস্থ্য, তবে নিম্নাঙ্গ মানে কোমরের নিচে পুরোপুরি নিসাড়।
সেটা ১৯২০। চ্যাটার্লী সপরিবারে এসে উঠলেন তাদের ‘বসৎ বাটি’ র্যা গবী হলে। ক্লির্ফোডের বাবা মারা গেছেন আগেই, ফলে ক্লির্ফোড চ্যাটার্লী এখন ব্যারোনেট , মানে স্যার ক্লির্ফোড চ্যাটার্লী আর তার স্ত্রী কন্সট্যান্স হলেন লেডি চ্যাটার্লী। ওরা এসে উঠেছে চ্যাটার্লীদের এই প্রায়-পরিত্যাক্ত রাজ্যপাটে, অপর্যাপ্ত আয়-রেজগারে সংসার গুছিয়ে-বসে দাম্পত্য জীবন যাপন করবার জন্য। ক্লির্ফোডের বোন আগেই এ বাড়ী ত্যাগ করে চলে গেছে দূরে, শহরে। বড় ভাই একটাছিল, সেও মারা গেলো যুদ্ধে । এখন এই ত্রিভূবনে তার আর কোন রক্তের আত্মিয় নেই। স্থায়ি পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছে ক্লিফোর্ড, সে আর কখনই কোন সন্তানের জন্ম দিতে পারবে না জেনেই ক্লিফোর্ড এই ধোয়াচ্ছন্ন মিডল্যান্ডে নিজ পিতৃ ভূমিতে ফিরে চলে এসেছে কারন যতদিন সে বেচেঁ আছে ততদিনই চ্যাটার্লী বংশের নাম স্থায়ী থাকবে।
ক্লিফোর্ড কিন্তু মোটেই বিষন্ন মনে বসে বসে দিন কাঠানোর মত মানুষ নন। হুউল চয়ারটায় বসে সারাদিনই সে ঘুরে বেড়ায়।ছোট্ট একটা মটোর লাগানো বাথ-চেয়ার আছে তার, সেটাতে বসে ধীরে ধীরে চালিয়ে বাগানে ঘুর ঘুর করে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে বেড়ায় সারিবদ্ধ বিপন্ন গাছে সাজানো বাগানটার মধ্যে।এই বাগানটা নিয়ে তার বড় গর্ব, যদিও তা নিয়ে মুখে কখনো কিছুই বলে না।
সহ্য করতে করতে সহ্যের মাত্রা তার ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে।তবু এখনো সে সাবলীল হাস্যোজ্জ্বল এবং প্রফুল্ল চিত্তের মানুষ।তার লালচে পুরুষালী চেহারা আর নীল ফ্যাকাসে জেদী জেদী চোখ দেখে যে কেউ তাকে একজন প্রানবন্ত মানুষই ভাববে।তার কাঁধ চওড়া বলিষ্ঠ, হাত জোড়া শক্তিশালী।খুব দামী দামী পোষাক আর বন্ড স্ট্রিট থেকে কেনা সুন্দর সুন্দর নেকটাই পরতো ক্লিফোর্ড। তারপরও ওর দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায় পঙ্গুত্বের জন্যে কোথাও যেন একটু শূণ্যতা তৈরী হয়েছে তার ভেতরে।
মৃত্যুর এত কাছা কাছি অবস্থান থেকে সে ফিরে এসেছে যে এখন বেচেঁ থাকবার প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে রোমাঞ্চকর রকমের মহা মূল্যবান। তার দৃষ্টির উজ্জ্বল উদ্বিগ্নতায় স্পষ্টত্বই বোঝা যায়, জীবন মরনের যুদ্ধে বেচেঁ বিজিত হবার গর্বে সে এখন গর্বিত।তবুও ভেতরে ভেতরে কোথাও যেন সে ধ্বংস হয়ে গেছে একেবারেই নিঃশেষ হয়ে গেছে তার কিছু কিছু অনুভূতী, বোঝে।অবচেতন মনে সেখানে শূণ্যতার শীতলতা টের পায়।
তার স্ত্রী, কন্সট্যান্সের গায়ের রং রাঙ্গা সাঝে মত, মাথা ভরা নরম বাদামী চুলে আর তার বলিষ্ঠ শরীরের গঠনে তাকে গ্রাম্য গ্রাম্য দেখাতো। হাটতোঁ ধীর পায়ে, বোঝা যায় তাতে অদম্য ক্ষমতা। চোখ জোড়া বেশ বড় বড়, বিস্মায়াবিষ্ট, কথা বলে মোলায়েম স্বরে নীচু গলায়ে, মনে হবে যেন এই একটু আগেই ও ওর গ্রাম থেকে এসে পৌছুলো এই শহরে। ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই ঠিক তা নয়।ওর বাবা, স্যার ম্যালকম রিড, এখন বৃদ্ধ, একসময়ে নামকরা আর এ ছিলেন। মা ছিলেন প্রাক-রাফায়েল যুগের একজন স্বনামধন্য ঝানু ফ্যাবিয়ান । শিল্পী আর সভ্য সমাজতান্ত্রিকদের মধ্যেই কন্সট্যান্স আর তার বোন হিলদা, যাকে বলে প্রচলিত প্রচীন রীতি কায়দার বাইরে সুন্দর একটা নান্দনিক পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছে।শিল্পের বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিতে ওদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্যারিসে, ফ্লোরেন্স এবং রোমের মত জায়গায়ে, অন্য দিকে ওদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে হেগ এবং বার্লিনে, সেখানে ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষির অকুতভয় বক্তাদের মুখে সমাজতান্ত্রিক আলাপ আলোচনা শোনবার জন্য।
এ সব কারনে, দু’বোনই, অন্তত শিল্প সংস্কৃতি আর আদর্শ রাজনিতীর ব্যাপারে একেবারে ছোটবেলা থেকেই সমৃদ্ধ। শিল্প আর রাজনিতীই ওদের আসল জায়গা।ওদের সত্ত্বার একদিক বিশ্বজনীনতা অপরদিক প্রাদেশিক, শিল্পের বিশ্বজনীন-প্রাদেশিকতা একসাথেই হাত ধরাধরি করে চলে বিশুদ্ধ সামাজিক আদর্শ।
সঙ্গীতসহ অন্যান্য বিষয়াদিতে শিক্ষা গ্রহনের জন্য পনের বছর বয়সেই তাদেরকে পাঠানো হল ড্রেস্ডেনে।সেই সময়টা কেটেছে ভালই। অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে ওরা ওখানে স্বাধীন ভাবে থাকতো, পুরুষরদের সাথে ওরাও দর্শণ, সমাজ আর শীল্প নিয়ে তর্ক জুড়ে দিতো, এসব ব্যাপারে পুরুষদের সমকক্ষছিল ওরা: মেয়ে বলেই তেমন প্রসংশা কেউ করতে চায়না। ওরা সব উঠতি প্রানোচ্ছাল যুবকদে সাথে হাঁটতে হাঁটতে বনাঞ্চলে ঘুরে বেড়াতো, হাতে থাকতো গিটার! ওয়ান্ডারভগের গান গাইতো, তারা মুক্ত, স্বাধীন।মুক্ত স্বাধীন! সে এক পরম আনন্দের জগৎ। মুক্ত বিহঙ্গের মত ঘুরে বেড়ানো, প্রভাতের বনাঞ্চল, সাথে যৌবন মদমুগ্ধ সু-কন্ঠী সঙ্গী, যা খুশী তাই করবার মত মুক্তি–সর্বোপরি–ইচ্ছে মত চলা ফেরা। ইচ্ছে মত মন খুলে কথা বলতে পারাটাই সব চাইতে বড় কথা।প্রেম ভালবাসা ব্যাপারটা এখানে বিন্দুসম গৌণ।
হিলদা আর কন্সট্যান্স, দু’বোনই আঠারো বছর বয়সে স্বভাবিক নিয়মেই পড়ে গেল অস্থায়ী প্রথম প্রেমে। যে ছেলেদের সাথে ওদের কথা বললে কথা আর শেষ হতে চাইতো না, গান গাইতে আকুল হয়ে উঠতো প্রান, প্রেমের টানে ইচ্ছে মতো স্বাধীনভাবে জঙ্গলের মধ্যে তাবু টঙ্গিয়ে থাকতে দ্বিধ্বা ছিলনা যাদের সাথে, প্রেম হলো তাদের সাথেই। মেয়েদের মন কিন্তু তখনও সিদ্ধান্তহীন টলমল, তবে ব্যাপারটা নিয়ে চারিদিকে এত কথা শুরু হয়ে গেল যে ফিরবার আর কোন ভিন্ন পথ থাকলনা। আর ছেলেগুলোও তখন অত্যন্ত নম্র,চরম ক্ষুধার্থ্য।মেয়েদের আত্মা কেন মহারানীদের মত দানশীল হয় না, সব কিছু অকাতরে বিলিয়ে দেবে, এমনকি নিজেকেও?
অতএব একসময়ে মেয়েরা, যার সাথে যে শুক্ষ্ম আলাপচারিতা পছন্দ করতো, যার কাছে যাকে বেশী আপন বলে মনে হতো তাকে নিজেদের সবকিছু উপহার দিয়ে দিতে দানছত্র খুলে বসলো। আলাপ-আলোচনা-বিতর্ক-সিদ্ধান্ত এ সবই আসল: দৈহিক-প্রেমাসক্তি, ভালবাসাবাসি নিছকই প্রাচীন আদিম পূর্ব-পুরুষদের কাছ থেকে রক্তে ভেসে আসা, উত্তরাধিকারি সূত্রে প্রাপ্ত উদ্দিপনা, পবর্তের মূষিকপ্রসব। একজনতো পরে ছেলেটাকে ভালবাসা দূরের কথা বরং ঘৃণা করতে লাগলো, যেন ছেলেটা ওর আপন ভূবনে বা স্বাধীনতার মধ্যে অনধিকার প্রবেশ করে ফেলেছে। একজন মেয়ে হিসাবে তার তাবৎ গৌরব এবং জীবনের মূল্য নির্ধারিত হয় সে প্রকৃত ভাবেই কতক্ষাণি নিরংকুশ, খাটি, পবিত্র এবং মহৎ স্বাধনিতা অর্জণ করতে পোরলো তার উপর ভিত্তি করে। তাছাড়া নারী জীবনের আর কীবা অর্থ থাকতে পারে? যত সব প্রাচীণ দাসত্বের সম্পর্কের বাধন ছিড়ে বেরিয়ে আসতে হবে।
যদিও দৈহিক-একাত্ব হবার ব্যাপারটা একেবারে প্রাচীনতম কাজ তবুও কেউ কেউ আবার এই দাসত্বে শৃংখলিত করবার নিকৃষ্ট বন্ধনটুকু নিয়ে ভাবাবেগে একেবারে ভাসিয়ে ফেলে নিজেকে। কবিগণ যারা ব্যাপারটাকে মহিমাম্বিত করে তুলেছেন, তাদের সিংহভাগই পুরুষ। নারীরা আগেই জানে এর চাইতে আরো উত্তম আরো মহত কিছু একটা অবশ্যই আছে। আর আজকের দিনে তারা নিশ্চিত ভাবে তা চিনে ফেলেছে।নারী জীবনে সুন্দরতম নির্ভেজাল স্বাধীনতাই হল যে কোন যৌনতাময় প্রেমের চাইতে হাজার গুন আনন্দের। শুধু দুঃখের কথা এই, যে পুরুষরা এই বিষয়ে কয়েক লক্ষ বছরে গুটি গুটি পায়ে নারীদের থেকে অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে। তাই কুকুরের মত যৌনতার কাজে উৎসাহিত করে ।
একজন নারীকে অবশেষে ধরা দিতেই হয়। পুরুষ মানুষ হল ক্ষুদার্থ শিশুর মত। নারীকে তার চাহিদার যোগান দিতেই হয় নইলে শিশুর মতই পুরুষরাও খুব নোংরা জেদী পথ ধরে এমন কি খুব সুন্দর মনমুগ্ধকর সম্পর্ক্যটাকেও দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নষ্ট করে ফেলে। কিন্তু নারী হয়তো পুরুষের কাছে আত্মসর্পন করে ঠিকই তবে তার অন্তররাত্মা ধরা পড়ে না কিছুতেই, মন স্বাধীন থাকে। নারী-পুরুষের সম্পর্কের গভীরতা বিষয়ে যারা কথা বলে বা কবি-সাহিত্যিকরা ব্যাপারটায় যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করে না। দৈহিক শক্তি সামান্যতম ব্যায় না করেই নারী তার পুরুষ সঙ্গীটার কাছে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারে। বরং এইসব কায়দা ব্যাবহার করেই নারীরা পুরুষদের উপর প্রভাব বিস্তর করতে সক্ষম হয়। নারীরা এভাবে নিজেকে দেহগত যৌনতা থেকে সামলে রেখে পুরুষদেরকে ক্রমে শিথিল এবং একেবারে নিঃশেষ হয়ে যেতে দেয়, নিজেরা মোটেই সঙ্কটাপন্ন হয় না: এভাবে সম্পর্ক্যটা দীর্ঘায়িত করে নিজের অন্তর্গত চরম পুলক যোগানোর যন্ত্রে পরিনত করে পুরুষকে।
দু’বোনই জীবনে প্রেমের আস্বাদ পেয়ে গেছে যুদ্ধ ঘাড়ে এসে হামলে পড়বার আগেই, শুরু হলো যুদ্ধ ওরাও দ্রুত বাড়ী চলে গেল। পুরুষ আর নারী দু’জন পাশাপাশি ঘনিষ্ট হয়ে বসে কথাবার্তা না বলতে পারলে: তাও যদি আবার এমন যৌবন কালে দু’জনের কথায় দু’জন ডুবে যেতে না পারলেতো প্রেম হয় না। আসোলেই কোন সুচতুর যুবা পুরুষের আবেগঘন কন্ঠে বলা কথা ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে, দিনের পর দিন মাসের পর মাস বসে বসে শোনা যে কতখানি চমকপ্রদ, অর্থবহ, এবং চরম রোমাঞ্চকর… তা ঘটনা ঘটবার আগ আবধি বোঝা সম্ভব হয়ে ওঠে না।যেন স্বর্গিয় নির্মল প্রতিশ্রুতী: অতপরঃ কথা বলিবার নিমিত্তে তুমি একজন পুরুষ সঙ্গী পাইবে!-এমন বার্তা কখনো উচ্চারিত হয়নি। প্রতিশ্রুতিটা কী তা বোঝবার আগেই পালন করা হয়ে গেল।
গভীর মর্মকথা ও আত্মা আলোকিত করা আলাপচারিতা এবং দৈহিক ব্যাপার স্যাপার গুলো সব শেষ হবার পরেও যদি উথলে ওঠা ঘনিষ্ঠতা তখনও কম বেশী অপরিহার্য মনে হতে থাকে, তাহলে থাকলো। অর্থাৎ এখানেই একটা অধ্যয়ের যবনিকা পতন। এর মধ্যে একধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতিও আছে: শরীরের ভেতরে অনাস্বাদিত এক সুসসুড়ি, নিজের ধারনায় শেষ ধাক্কা, যেন কোন লেখার শেষ শব্দটা, চরম উত্তেজনার প্রসমন, আর অনেকটা যেন ঠিক একটা অধ্যয়ের শেষ, বা কোন বিষয়বস্তুর একটা পর্যায় বোঝাতে, এক সারি তারকা চিহ্ণ বসানো হয়, তেমন।
কেউ কেউ যেমন বলে “প্রেমের মরা জলে ডোবে না” (L’amour avait possé par là) ওদের বাবা, ভদ্রলোক একজন পাকা জহুরী, অভিজ্ঞ মানুষ, জানে জীবন নিজ পথ নিজেই বেছে নেয়। জীবনের শেষের কয়েক মাস ওদের রং তামাসা দেখতে দেখতে ওদের মা স্নায়বিক দূর্বলতায় ভুগেছে। সে চাইতো তার মেয়ের ‘মুক্ত’ জীবন যাপন করুক, ‘ইচ্ছে মত জীবন কাটাক’ ব্যাস। সে নিজের জীবন কখনোই নিজের মত করে কাটাতে পারেননি: নিজেই কাটাননি স্বাধীন ভাবে। ঈশ্বর জানেন ইচ্ছে মত জীবন কাটালেন না কেন! ওর নিজেরই আয়-রোজগার ছিল ভালই আর ওর কোন কাজে কেউতো বাধা দিতনা। হ্যা,স্বামীকে সে দোষারোপ করতো। তবে খাটীঁ কথা হল, তা ঝগড়া ওছিলায়ে তবে মনে বশ্যতা স্বীকারের প্রাচীন মনোবৃত্তি পোষণ করতো নিজেই সে মানসিকতার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারতো না কোন মতেই। এতে স্যার ম্যালকমের কোন রকমের কোন ভূমিকা ছিল না, ভদ্রলোক মোটামুটি তার স্নায়বিক পিড়ায়ে পীড়িত তেজস্বীণী স্ত্রীর হাতে সংসারের শাসনদন্ডটা ছেড়ে দিয়ে, নিজে নিজের কাজে ব্যাস্ত থাকতেন।
‘অতএব কন্যাগণ প্রকৃতই স্বাধীন’, কিছুদিন পর ওরা ফিরে গেল ড্রেসডেনে, সেই সঙ্গীত, সেই বিশ্ববিদ্যালয়, সেই সব যুবক। যে যার নিজ নিজ যুবা পুরুষকে ভালবাসছে, আর যার যার যে মনের মানুষ তাকে তাকে মানসিক আকর্ষনের গভীর আসক্তি নিয়ে ভালবেসে চলেছে। যুবকগুলো যত যা সুন্দর সুন্দর কল্পনা করতো, লিখতো বা বলতো সব কল্পনা, লেখা বা কথা গুলো ঐ যুবতীদের ঘিরে। কনীর প্রেমীকটা সঙ্গীত জগতের মানুষ, হিলদার জন বিচরণ করে কারিগরী জগতের বাসিন্দা। তবে মনে হতো ওরা দুজনই বেচেঁ আছে নিছকই ওদের যুবতী প্রেমীকাদের জন্য। তাদের মানসীক অবস্থা আর মনের অধীরতায় ব্যাপারটা সে রকমই। ওরা জানেই না কিন্তু ওরা কোথাও যেন সামান্য ভাবে বাঁধা।
সুস্পষ্টতই যে প্রেম ওদের সত্তার গভীরে রন্ধে রন্ধে ছড়িয়ে পড়েছে: সেটা, দৈহিক অভিজ্ঞতার স্বাদ। ব্যাপারটা কৌতুহল উদ্দিপক স্মুক্ষ্মাতিস্মুক্ষ্ম, পুরুষ ও নারী উভয়ের শরীরেই চোখে পড়বার মত সুস্পস্ট কিছু পরীবর্তন ঘটে: নারীদের ক্ষেত্রে তারা আরো একটু ফুটে ওঠে, আরো সামান্য গোলগাল হয়ে ওঠে, নবীন স্তন যুগল কোমল হয়ে ওঠে, চেহারায় ফুটে ওঠে উদ্বিগ্নতা অথবা বিজয়িনীর হাব ভাব: পুরুষরা হয়ে ওঠে আরো গম্ভীর, বেশ অন্তর্মুখি, তাদের কাঁধ আর নিতম্ব পায় পুরুষালী দৃঢ়তা, খামক্ষেয়ালীপনা কমে মন স্থীতু হয়।
দেহে যৌনতার মূল রোমাঞ্চকর অনুভূতীটুকু উপলব্ধির পর, দু’বোনই পুরুষের একেবারে এই অজ্ঞাত অদীম ক্ষমতার হাতে নিজেদেরকে প্রায় বিলিন করে দিয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই তাদের হুশ ফিরে আসে, মুহূর্তটুকু ওদের ভাল অনুভূতী হিসাবেই গ্রহণ করে তারপর আবার স্বাধীন বিহঙ্গ। অন্যদিকে যুবকরা এই সুখানুভূতীর জন্য কৃতজ্ঞতা বশে নারীদের কাছে তাদের জীবন লুটিয়ে দিতেও এক পায়ে খাড়া। তবে পরে তাদেরকে দেখে মনে হলো যেন ষোল আনা খরচ করে ওরা মাত্র ছ’আনার মাল পেয়েছে। কোনীর প্রেমীকটি বেশ গম্ভীর প্রকৃতীর মানুষ আর হিলদার প্রেমীক বেশ রসীক। সব পুরুষের প্রকৃতি একই রকমের। কৃতঘ্ন এবং চিরকাল অতৃপ্ত। কেউ হাতে ধরা না দিলে ওরা তাকে ঘৃণা করে কারন মেয়েটাকে পেল না। কেউ হাতে ধরা দিলে তাকেও ঘৃণার চোখে দেখবে সে আর এক অন্য কারণ, বা একেবারে কোন কারণ ছাড়াই, তাছাড়াও, নারীরা যা করে করুক, পুরুষ মানুষ এবোরেই অবুঝ শিশু সভাবের, যা-ই সে হাতে পাক না কেন কোন কিছুতেই সে সন্টুষ্ট নয়।
সে যাক, ইতিমধ্য মে মাসে হিলদা আর কোনী, দু’বোন মায়ের ফিউনারেলে বাড়ী এসেছিল। পরপরই আবার যুদ্ধে শুরু হল, আবার ওরা বাড়ী আসতে বাদ্ধ হল। ১৯১৪ সালের ক্রিসমাসের আগেই ওদের দুইজনার প্রেমীকই মারা গেল, ওরা ছিল জার্মান: সংবাদ শুনে দু’বোন বুক ফাটিয়ে কাদলো, মনেপ্রাণে ভালকাসতে লাগলো, তারপর আস্তে আস্তে মন থেকে মুছে যেতে যেতে শেষে এক সময়ে তাদের আর কোন অস্তিত্বই থাকলো না মনোভূমে।
দুই বোনই বাবার কাছে, আসলে সেটা ওদের মায়ের বাড়ী, কেনসিংটনে বসবাস করতে লাগলো, আর মেলামেশা শুরু হল ক্যামব্রিজের যুব সমাজের সাথে। ক্যামব্রিজের যুব সমাজ ‘ব্যাক্তি স্বাধীনতার’ পক্ষে, ফ্ল্যানেল কাপড়ের ট্রাউজার্স পরে, ফ্ল্যানেল কাপড়ের সার্ট পরে তার গলা আদুল খোলা, সু-শিক্ষিত, এক রকমের নৈরাজ্যবাদী, ফিস ফিস করে কথা বলে, কন্ঠস্বর মিহি, সংঘাতিক অনুভূতিপ্রবণ। যাইহোক, হিলদা এখানে, হঠাৎ করেই এই ক্যামব্রিজ-সমাজের একজন প্রাক্তন ছাত্রকে বিয়ে করে বসলো, বয়সে তার চাইতে দশ বছরে বড়, প্রচুর অর্থ-সম্পত্তির মালিক, মোটের উপর সরকারী অপিসে উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওয় একটা ভাল চাকরী ছিল তার পকেটে: সে আবার দর্শনের উপর লেখালিখিও করে। ওয়েস্টমিনস্টারে ছোট্ট একটা বাড়ীতে ওরা থাকে, আর উচ্চ সমাজের মানুষদের সংশ্রবে মেলামেশ করে। উচ্চ সমাজের মানুষ মানে একেবারে সরকার চালানো লোকজন, তাঁরা সব নিছক শুধুই উচ্চ পর্যায়ের মানুষজনই নন, এদের মধ্যে কেউ কেউ বর্তমানে জাতী পরিচালনা করা মেধা, কেউ কেউ ভবিষ্যতের: তাদের কথাবার্তার ঠকমই আলাদা।
কোনী অতি অল্প বিস্তর যুদ্ধের-কাজে যোগ দিয়েছিল, সঙ্গী ছিল ফ্ল্যানেল কাপড়ের ট্রাউজার্স পরা ক্যামব্রিজ যুব সমাজেরই একজন, স্বভাবে একরোখা আর হালকা চালে দুনিয়ার যে কোন কিছুকেই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারতো অকপটে। তার এক ‘বন্ধু’ ক্লিফোর্ড চ্যাটার্লী, তখন বাইশ বছরের তরুন যুবক, বনে সে কয়লা-খনির প্রযুক্তিবিদ্য বিষয়ে পড়াশোনা করতে করতে সেখান থেকে দ্রুত বাড়ীতে। সে আগে দু’ বছর ক্যামব্রিজে কাটিয়ে গেছে এখন সে স্মার্ট রেজিমেন্টে ফ্যাস্ট লেফটেন্যান্ট , সে বরং নিজের ইউনিফর্ম পরা অবস্তায়ে সব কিছুকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারে।
ক্লিফোর্ড চ্যাটার্লী উচ্চবিত্তের মানুষ।আর কোনীরা উচ্চ-মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর মানুষ, তবে ক্লিফোর্ডরা অভিজাত। খুব বড় মাপের কিছু না, তবুও। তার পিতা একজন ব্যারনেট, আর মা একজন শেরিফের মেয়ে।
যদিও ক্লিফোর্ডরা বংশ মর্যাদায়ে এবং আভিয্যাত্বে অনেক উচু তলার সম্ভান্ত মানুষ, তবে মানুষটা মফস্বলীয় এবং বেশ ভীরু প্রকৃতির। সে তার ঐ জমিদারী সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজস্ব ছোট্ট গন্ডীবদ্ধ ‘আপন জগৎটাতেই’ স্বাছন্দ বোধ করতো। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তি আর বিদেশীদের সুবিশাল জনগোষ্টীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আসল বৃহৎ পৃথিবীটাতে চলাফেরা বা মেলামেশা করতে তার ভীষণ লজ্জ্বা, কুন্ঠা-দ্বিধ্বা। সত্য কথা বলতে, সে আসলে নিজ শ্রেণীর লোকজন ছাড়া বিদেশী কিম্বা মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত মানুষদের প্রকৃতিকে কিছুটা ভয়ই পেত। জীবনে ষোল আনা নিরাপত্তা ভোগ করা সত্বেও কোন এক অজানা কারনে, সে নিজেকে খুব অরক্ষিত মনে করে কেমন যেন সচকিত হয়ে পড়তো ভেতরে ভেতরে। এই কিংভুতকিমাকার মানসীকতাটুকুই আমাদের সময়কার অনন্যসাধারণ ব্যক্তির প্রকৃতি।
ফলে কন্সট্যান্ট রীডের মত মেয়ের মু্খের সামান্যতম প্রতিশ্রুতিই ক্লিফোর্ডকে মুগ্ধ করে ফেলেছিল। বাইরের হইচইয়ে ভরা জগতে মেয়েটা নিজে যত বড় কত্র্রী ছিল ক্লিফোর্ড মোটেই তত বড় কর্তা ছিল না।
সেও যে খুব একটা বাধ্য মানুষ তা নয়: নিজ শেণীতেই সে অবাধ্যই। হয়তো অবাধ্য শব্দটা এখানে বেশ শক্ত শোনাচ্ছে বা খুবই শক্ত শোনাচ্ছে। সমসাময়ীক সাধারন মানুষদের মধ্যে, বিষেশত যুবকদের মতো তার মাথাতেও প্রচলীত রীতি নীতির বিরুদ্ধে, যে কোন প্রুভুত্ব মূলক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধ চিন্তা চেতনা স্থান তৌরি করে নিতো। ওরা নিজেদের মধ্যে একরকমের একগুয়ে মতবাদ পোষণ করতো: নিজের পিতাকেও মনে হতো উপহাস্যপদ: এই ছিল তার দুর্দমনীয় ধারনার সর্বোতকৃষ্ট উদাহণ। সরকারে বসে আছে যত সব বুড়ো ভাম: ওদের ‘বসে বসে মাছি মারো আর নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমাও’ নীতি একথাই বলে। এমনকি এই যুদ্ধ-টুদ্ধ সবই পরিহসনীয় যদিও তাতে হাজারে হাজার মানুষ খুন হচ্ছে, ব্যপারটা দুঃখের।
আসলে সব কিছুই কেমন জানি কমবেশী নির্থক হয়ে উঠেছিল তখন: বিষেশত যে জায়গা গুলোতে আইনসম্মত অধিকার বলে প্রভুত্বে ফলনো সম্ভব, বিভিন্ন মাত্রায়, সে হোক সরকার বা সেনা বাহিনী বা বিশ্ববিদ্যালয়। বিষেশ করে শাসক শেণ্রীর লোকজনদের কেউ যখন শাসনের নামে ভন্ডামী করে তখনতো ভীষণ রকমের হাস্যকর মনে হতো ওর। স্যার জিওফ্রে, ক্লিফোর্ডের বাবা, তাঁকেও প্রচণ্ড ভন্ড একজন মানুষ মনে হতো ওর, নিজেস্ব জঙ্গলের শত শত গাছ কেটে উজাড় করে ফেলেছেন, নিজের কয়লা খনি থেকে মানুষজন ধরে সব খেদিয়ে খেদিয়ে যুদ্ধে পাঠিয়ে নিজে নিরাপদে বসে নিজে দেশ প্রেমীক বনে বসেছেন। অবশ্য, তিনি প্রচুর অর্থ খরচ করেছেন দেশের জন্য ঠিকই।
ওর বোন, মিস চ্যাটার্লী–ইমা–মাঝখানে কিছুদিন নার্সিং কাজে যোগ দিতে মিডল্যান্ড থেকে এসেছিল লন্ডন, স্যার জিওফ্রে আর তাঁর শখের দেশপ্রেম নিয়ে সেও মনে মনে হাসতো। বড় ভাই হার্বার্ট, অবশ্যই উত্তরাধিকারী, সেতো মুখের উপরই হাসতো, তাদের গাছগুলো কাটা হোতো ট্রেঞ্চের কাজে লাগাবার জন্য। কিন্তু ক্লিফোর্ডই শুধু সব দেখে শুনে নিরবে মুখ টিপে হাসতো। চারিদিকের সব কিছুই কেমন অর্থহীন,একেবারেই অর্থহীণ। এভাবে আপনার চারিপাশে যখন সব অর্থহীণ ঘটনা ঘটতে থাকবে, মানে আপনি যখন এত সব অনর্থক ব্যাপারের মধ্যে আশটে পিসটে জড়িয়ে আছেন, এরকম অবস্থায়ে আপনি নিজেও কি একজন অর্থহীণ হাস্যপদ ব্যাক্তিতে পরিবর্তন হয়ে যাবেন না …? কোনীর মত ভিন্ন শ্রেণীর একজন মানুষ অন্তত অন্য কোন ব্যাপারেতো আন্তরিক। ওরা অন্য রকমের কিছুতে বিশ্বাস করে।
তবে ওরা ইংরেজ সৈনিকদের ব্যাপারে বেশী বেশী আন্তরীক ছিল, বাধ্যতামূলকভাবে সৈন্যদলে যোগদানের জন্য তালিকাভুক্তর হুমকির ব্যাপারে, আর শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় চিনি এবং চকোলেট সংকটের ব্যাপারে। এই সবগুলো ব্যাপারেই কর্তৃপক্ষ কাজ কারবার চরম দোষোণীয় এবং অবশ্যই হাস্যপদ। ক্লিফোর্ডের কিন্তু সে সব নিয়ে তেমন মাথা ব্যাথা নেই। ও জনে কর্তৃপক্ষরা, এই সব সেনাবাহিনী বা চকোলেটের সংকট নিয়ে কী করবে, অনর্থক সেই থোড়-বড়ী-খাড়া আর খাড়া-বড়ী-থোড়ের খেলা।
১৯১৬, হার্বার্ড চ্যাটার্লী নিহত হলে, ক্লিফোর্ড হলো সব কিছুর উত্তরাধিকারী। তাতেও সে সন্ত্রস্ত। স্যার জিওফ্রের পুত্র, র্যা গবি বংশের সন্তান হিসাবে তার গুরুত্বের কথা তার মাথার মধ্যে এমন গভীর ভাবে গেঁথে বসে গেছে যে সে কোন মতেই এক পলকের জন্যেও কথাটা ভুলতে পারে না। সে কিন্তু আবার খুব ভাল ভাবেই বোঝে যে বিশাল এই জ্বজ্বল্যমান পৃথিবীর চোখে ব্যাপারটা ভীষণ ভাবে হাস্যপদ। এখন ক্লিফোর্ডই র্যা গবি পরিবারের একমাত্র উত্তরাধীকারী এবং ধারক। ধারক, মানে যাবতীয় দায় দায়িত্ব একমাত্র তার, ব্যাপারটা কি ভিতীপ্রদ নয়? সেই সাথে অবশ্যই চমকপ্রদ, এবং হয়তোবা কেমন জানি কিম্ভুতকিমাকার।
স্যার জিওফ্রে কিন্তু যেনতেন লোক ছিলেন না। চেহারাটা ফ্যাকাসে, গায়ের রং সামান্য কালো, সারাক্ষণ নিজের মধ্যে নিজে ডুবে থাকতেন, এবং নিজের এবং নিজের দেশের অবস্থান সুরক্ষায়ে সদা দৃঢ়চেতা মনোভাব পোষণ করতেন। [let it be Lloyd Georgeor who it might. So cut off he was, so divorced from the England that was really England, so utterly incapable, that he even thought well of Horatio Bottomley. Sir Geoffrey stood for England and Lloyd George as his forebears had stood for England and St George: and he never knew there was a difference. So Sir Geoffrey felled timber and stood for Lloyd George and England, England and Lloyd George.]
তিনি চাইতেন ক্লিফোর্ড একটা বিয়েশাদি করুক, তার বাচ্চাকাচ্চা হোক। আর ক্লিফোর্ড ভাবতো তার বাবা একজন সেকেলে বুড়োভাম। নিজেকে আর আশপাশের সব কিছুকে চরম অবহেলা করা আর সব কিছুতে দোষ খুজে বেড়ানো ছাড়া তখন ক্লিফোরর্ডের হাতে করবার মত আর কিবা কাজ ছিল? ভাল লাগুক আর নাই লাগুক বাস্তব অবস্থা হল এই যে, উত্তরাধীকার সূত্রে পাওয়া সেই ব্যারনেটের খেতাব আর বংশীয় সব সে অবশেষে গ্রহণ করলো।
মৃত্যু আর লাশের বিভিষিকায়ে যুদ্ধের সাময়ীক হুজুগে নেশা কেটে গেলো। অত্যধিক জীবন ক্ষয় আর আতঙ্ক। মানুষের জীবনে দরকার স্বস্তি আর অবলম্বন। মানুষ চায় একটা নিরাপদ পৃথিবীতে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে। পুরুষের জীবনে একজন স্ত্রীর প্রয়োজন।
চ্যাটার্লীরা, দু’ভাই আর এক বোন, জগতের সবার থেকে বিছিন্ন হয়ে, রাগবির মহালের মধ্যেই আবদ্ধ থেকে অদ্ভুত ভাবে একঘরে জীবন যাপন করায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বিচ্ছিন্নতার এই অনুভূতী ওদের মধ্যকার পারিবারিক বন্ধন আরো তীব্রতর করে ফেলেছিল, বংশ মর্যদা আর ভূ-সম্পত্তির মত সব কিছু থাকবার পরও বা ও সব থাকবার কারনেই ওদের মধ্যে অবস্থানের দুর্বলতার ধারনা, অরক্ষিত হয়ে পড়বার ধারনা ওদেরকে পিছু তাড়া করে নিয়ে বেড়াতো সারাক্ষণ। ফলে যে শিল্প এলাকা মিডল্যান্ডসয়ে ওরা গোটা জীবন কাটালো সেই মিডল্যান্ডসটাই জীবনে থেকে বাদ পড়ে গেল ওদের। উপরন্তু ওরা নিজের শ্রেণীর মানুষদের থেকেও একেবারে বিছিন্ন, কারন তাদের পিতা, স্যার জিওফ্রের না-খোস মেজাজ, একগুঁয়ে এবং নিরব থাকবার স্বভাব। পিতাকে নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি চলতো ঠিকই কিন্তু মনে মনে তাঁর ব্যাপারে ওরা ছিল প্রচন্ড সংবেদনশীল।
তিন ভাই বোন নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতো যে সারা জীবন ওরা এক সাথেই কাটাবে। কিন্তু হার্বার্র্টের অকস্মাৎ মৃত্যুর পর স্যার জিওফ্রে চাইছেন ক্লিফোর্ড এবারিএকটা বিয়ে করুক। স্যার জিওফ্রে খুবই কম কথা বলেন: সে শুধু একবার মুখে কোনভাবে উচ্চারণ করেছেন মাত্র। কিন্তু তাঁর সেই প্রায় নিঃশব্দ উচ্চারণের দৃঢ়তা অবহেলা করবার মত সাহস ক্লিফোর্ডের ছিল না।
ইমা, ক্লিফোর্ডের বড় বোন, বয়সে দশ বছরের বড়। সে বললো , না। তার মতে ক্লিফোর্ড বিয়ে করা মানে, এই পরিবারের সবচাইতে ছোট সদস্যদের নীতি থেকে পালিয়ে যাওয়া বা নীতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
তথাচ, ক্লিফোর্ড আর কোনীর বিয়ে হয়ে গেল, এবং সু-দীর্ঘ্য এক মাস মধুচন্দ্রিমায়ে কাটালো দুজন। সেইটা সেই ভয়ংকর ১৯১৭ সাল, ডুবতে থাকা ভাঙ্গা নায়ে দুটো মানুষ একাত্ম হল। বিয়ের আগ অবধি ক্লিফোর্ড একেবারেই ভারজিন: জীবনে কামের ভূমিকাকে সে মোটেই গুরুত্ব দিত না। ও সব বাদ দিয়েই ওরা দুটিতে বেশ অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছিল। পুরুষ মানুষটিকে ক্রমাগত ‘সন্তুষ্ট’ করবার জীবন থেকে কাম গন্ধহীন এই জীবনেই কোনীও বেশ পরমানন্দেই দিন কাটাছিল। জগৎ সংসারের অন্যান্য কিছু পুরুষদের মত, যে কোন কারনেই হোক, ক্লিফোর্ডো নিছক ‘আত্ম সন্তুষ্টি’ জন্যে হাপিতেশ করে মরতো না। না, ও সবের চাইতে একাত্ম হওয়াটাই বেশী ব্যাপক এবং গভীর। আর দেহগত যৌন কর্ম হল নিছকই এক ধরনের আকস্মিক ঘটনা বা বাড়তি পাওনা, এক প্রকার প্রাচীন কৌতুহল মাত্র, নিজেকে অভিজ্ঞ করবার তাগিদে নির্লস এক জৈবিক প্রচেষ্টা, তবে একেবারেই অপ্রয়োজনিয়। তবু, শুধুমাত্র তার ননদ ইমার বিরুদ্ধে ঢাল হিসাবে: কোনীর একটা সন্তান চাইই চাই।
কিন্তু নিয়তি, ১৯১৮ সালের গোড়াতেই ক্লিফোর্ডকে ফিরিয়ে পাঠানো হল ক্ষত অবম্থায়ে, তখনো তাদের কোন সন্তান সন্ততী হয়নি। স্যার জিওফ্রেও মারা গেলেন এই দুঃখ বুকে নিয়ে।

[চলবে]