মারিয়া

আলেকজান্ডার পুশকিন

আমার আব্বা, আন্দ্রেই পেত্রোভিচ গ্রিনভ, যুবক কালে কাউন্ট মুনিখের বাহিনীতে চাকরি করে ১৭– সাল নাগাদ সিনিয়র মেজর পদে বহাল থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেন। তারপর থেকে গোটা জীবনটাই এই সিমবির্স্ক গ্রামে। এখানেই এক দরিদ্র বনেদী পরিবারের জ্যেষ্ঠ কন্যা, আভদোতোয়া ভিসিলয়ভনা ইউকে বিয়ে করে ঘর সংসার। তাদের নয় ছেলে মেয়ের মধ্যে একমাত্র জীবিত সন্তান আমি, বাকী গুলো সব মারা গেছে অকালে।
আমি তখনো মায়ের গর্ভে, আমাদের এক নিকটাত্মিয়, গার্ড বাহিনীর মেজর প্রিন্স বানোজিকের আনুকূল্য আমাকে সেমিনোফস্কি রেজিমেন্টে সার্জেন্ট পদে নথিভুক্ত করা হয়ে গেল। কপাল ফেরে আমার মায়ের পেটে তখন কোন মেয়ে জন্মালে কি হতো, আমার আব্বা খবর পাঠিয়ে দিতেন যে সে সার্জেন্ট মারা গেছে, ব্যাস তাহলেই ব্যাপারটা ওখানেই চুকে-বুকে শেষ হয়ে যেত। তারপর এমন করে আমার ছুটি মঞ্জুর করে নেওয়া হয়েছে যাতে লেখাপড়াটা শেষ করতে পারি। সে কালে আমাদেরকে লেখা পড়া শিখিয়ে মানুষ করে গড়ে তোলা হতো একেবারে অন্য ভাবে, আজকালকার মত নয়।
পাঁচ বছর বয়সেই আমাকে সপেঁ দেওয়া হলো শিকারী সাভেলিচের তত্বাবধানে। তার একাগ্রতা আর সুবিবেচনার গুনে ক্রমে সে-ই আমার একান্ত পরিচারক হয়ে ওঠে। মানুষটাকে ধন্যবাদ জানাই, বারো বছর বয়সেই আমি লিখতে এবং পড়তে শিখে ফেললাম, তাছাড়া বার্জোই কুকুরের একজন অভিজ্ঞ বিচারক হিসাবে বিবেচিত হয়ে উঠলাম। ঠিক এমন সময়ে, আমার আব্বা, আমার লেখাপড়ায় পূর্ণতা আনবার জন্য একজন ফরাসী মানুষ, মসিঁয়ে বেয়াপ্রেকে ভাড়া করে আনলেন। প্রয়োজনিয় বার্ষিক মদ আর প্রোভঁস তেলের সাথে সাথে তাঁকেও মস্কো থেকে আমদানী করা হলো। তবে তার আগমনে মনখুন্ন হলো সাভেলিচ।
“কপাল, ছেলেটাকে নাইয়ে-ধাইয়ে, কাপড় চোপড় পরিয়ে, খাইয়ে-দাইয়ে বসিয়ে রেখেছি, এখন ধরে আনা হলো একজন মহা পন্ডিত। একজন‘মসিয়ো‘ নিয়ে এসে এভাবে টাকা পয়সা নষ্ট করার কী কোন মানে হয়? এ মুলুকে যেন চাকর বাকরের বড় আকাল পড়ে গেছে?“
বেয়াপ্রে, স্বদেশে পেশায় ছিলেন নাপিত, তারপর প্রুশিয়ায় গিয়ে হলেন সৈনিক, তারপর এসেছেন রাশিয়ায়, পরিস্কার ভাবে ‘পোউর এতেরা মাস্টার‘ শব্দের মানেও জানেন না, হয়ে বসেছেন শিক্ষক। [পোউর এতেরা, ফরাসী শব্দ, অর্থ, হতে এসেছে] মানুষ হিসাবে সে মন্দ নয়, তবে স্বভাবে ভীষণ হঠকারী এবং উড়নচন্ডী। প্রেমে পরিচ্ছন্ন যৌনতার প্রতি সে চরম দূর্বল। না, তার ভাষ্য মতে সে একজন বোতলে বিমুখ মানুষ, কথাটা ভুল; আবার আমরা যেমন রাশিয়াতে বলে থাকি, সে বোতল আসক্ত মানুষ, সে আসলে তাও নয়। আমাদের বাড়ীর রিতী অসুসারে শুধুই টেবিলে, খাওয়ার পর নিছকই এক গ্লাস সুরাসার-সদৃশ মিষ্টি মিষ্টি কড়া এক প্রকার পানীয় পরিবেশন করা হতো, তবে তাও আবার ‘মাস্টার মশাইকে‘ খাবার সাথে ওসব ছাইপাশ দেওয়া সাজে না, ফলে আমার ‘মাস্টার মশাই‘ অতি শীঘ্রই নিজেকে রুশ ব্রান্ডিতে অভ্যস্থ করে ফেললেন। শেষমেষ নিজের দেশের সমস্ত মদের চাইতেও হজমের জন্য তিনি এই দেশীয় মদে অনুরক্ত হয়ে পড়লেন। আমরা বেশ ভালো বন্ধু হয়ে উঠলাম। চুক্তি অনুসারে, তাকে আনা হয়েছিল আমাকে ফরাসী ও জার্মান ভাষা সহ বিজ্ঞানের সব কিছু পড়াবার জন্যই, তবে তার বেশী পছন্দ নির্বিকার চিত্তে আমার সাথে রুশ ভাষায় বকবক করা। আমরা যে যার মত নিজের নিজের কাজেই মদমত্ত, বন্ধত্ব আরো দৃঢ় হতে থাকলো, আমি আর এর চাইতে বিজ্ঞ এবং বিস্বস্ত কোন পরামর্শদাতা চাই না। তবে নিয়তিঃ কেন বাধ্যতে, কপাল আমাদেরকে বেশী দিন এক সাথে থাকতে দিল না, সেই ঘটনাটাই এখন বলছি।
পোলাস্কা, আমাদের ধোপিনী, মোটা সোটা, বসন্তের ফোঁটা ফোঁটা দাগ গোটা মুখ; আর এক-চোখ কানা গোয়ালিনী, আকাউলকা, একদিন সকালে আমার মায়ের কাছে একটা গল্প নিয়ে এসে উপস্থিত। গল্পটার খলনায়ক আমাদের ‘মসিয়ো‘, যাকে বললেন, সে এসব মসকরা মটেই পছন্দ করেন না, এবার তিনি নালিশটা গিয়ে জানালেন আব্বাকে, আমার আব্বা চট-জলদি মাথা গরম করা মানুষ, সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন ‘ ফরাসী বদমাইশটাকে‘ ডেকে আনবার জন্য। সে সবিনয়ে এসে জানালো ‘মসিয়ো‘ এখন আমাকে পাঠ দান করছেন। আব্বা নিজে দ্রুত চলে আসলেন আমার কামরায়। বেয়াপ্রে তখন নিজের বিছানায় কিছুক্ষণের জন্য একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছিলেন। আর আমি তখন গভীর মনোনিবেশে নিজের একটা জবর কাজে ডুবে আছি। আমার শিক্ষার জন্য মস্কো থেকে একটা মানচিত্র আনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সেটা টাঙ্গানোছিল দেয়ালে, কখনোই তা শিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়নি। ওইটার কাগজের আকার এবং মান আমাকে অনেক দিন যাবৎ কাছে টানছিল। শেষে একদিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, ওটা দিয়ে আমি ঘুড়ি বানাবো। আজ বেয়োপ্রের দিবানিদ্রার সুযোগ নিয়ে, সেই জবর কাজেই আমি তখন ব্যাস্ত।
যখন সবে আমি এক বুক আশা নিয়ে আমার ঘুড়িতে লেজ জুড়ছি, ঠিক তখনই ঘরে এসে ঢুকলেন আমার আব্বা।
ভূগোল শিক্ষায় আমার ঐ মনযোগ দেখে তিনি খপাৎ করে আমার একটা কান ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে গেলেন বেয়োপ্রের বিছানার দিকে, তাকে নির্মম ভাবে ডেকে তুলে, মুহূর্মুহ আক্রমন করে চললেন নিন্দায় আর ভর্সনায়। বেয়োপ্রে এই হঠাৎ আক্রমন এবং ভেবাচেকা অবস্থা কাটিয়ে উঠে বিছানায় উঠে বসতেই পারছিলেন না। বেচারা ‘মাস্টার মশাই‘ তখনো মদের নেশায় টং। আব্বা তার কোটের কলার ধরে টেনে তুলে পশ্চাৎদেশে পদাঘাৎ করে ঘর থেকে বের করলেন। দিনে দিনে বিদায়। সাভেলিচতো মহা খুশী।
এখানেই আমার শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি।
খাই-দাই-ঘুরে বেড়াই, তখন এই আমার জীবন। ছাদে পায়রা পুষে সময় কাটাই; চাষা-ভূসার ছেলেদের সাথে চাড়ার-লাফ খেলে বেড়াই। এই ভাবে কেটে গেলো আমার ষোল বছর বয়সটা। তবে এবার আমার জীবনে এলো বড় সড় একটা বাঁক।
শরৎ এসে গেছে, আমার মা নিজ ভূবনে বসে মধুর-জ্যাম বানাছিল, পাশে বসে আমি জ্বিব চাটচ্ছি, জ্যাম তৈরির কায়দাটা আমি দেখছিলাম আর মাঝে মধ্যে সেই ফুটন্ত তরলটা চেখে দেখতে হচ্ছে। আব্বা, জানালার কাছে বসে সবে ‘সরকারী বর্ষপঞ্জীটা‘ খুলেছেন, ওটা সে বছর বছর পায়। বইটা তার ভারী পছন্দ। বইটা পড়বার সময়ে তিনি বরাবরই গভীর মনযোগ সহকারে পড়তেন । তবে বইটার এমনই গুন যে, পড়তে পড়তে চট করে তার মেজাজ খারাপ হয়ে যেত। আমার মা আব্বার নাড়ী-নক্ষত্র বুঝতো, তাই সচরাচর ঐ হতছাড়া বইটাকে লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা করতো। ফলে কখনো সখনো সারা মাস ভর ঐ ‘সরকারী বর্ষপঞ্জীটা‘ পড়ে থাকতো আব্বার চোখের আড়ালে। কোন মতে বইটা একবার তার হাতে গিয়ে পড়লে, ঘন্টা খানিকের আগে সে আর ওটা ছাড়তেন না। এখন তিনি বইটা পড়ছেন, ঘন ঘন তার কাঁধ দুলছে, নাতি-উচ্চৈ স্বরে বিড়বিড় করে বিদ্রুপ করে চলেছেন অনাবরত।
“জেনারেল! আমাদের কোম্পানীতে ও ছিল একজন সার্জেন্ট। নাইট অফ দ্য ওয়ার্ডারস অফ রাশিয়া! কত বছর হয়ে গেল …..“
অতঃপর আব্বা ‘বর্ষপঞ্জীটা‘ ছুড়ে ফেললেন সোফার উপর, আনমনা বসে থাকলেন বেশ কিছুক্ষণ। এ কিন্তু ভালো কিছুর পূর্বাভাস নয়।
“এভডোতিয়া ভাসসিলিয়াভা,“ আব্বা একেবারে সুস্পষ্ট ভাবে আমার মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “পেত্রাউশার বয়স কত হলো?“
“সবে পড়লো সতেরোতে“ আমার মা উত্তর দিল। “আমার খালা আনাসতাসিয়া গারাসিমোফনার চোখ নষ্ট হয়ে অন্ধ হলেন যে বছরে সে বছরেই জন্মালো পেত্রাউশা, আর হ্যা….“
“হয়েছে,“ আব্বা আবার তার নিজের কথার খেই ধরলেন; “এইতো ওর সময় কাজ করবার। এখন ওকে ধেই ধেই করে মেয়েদের পেছন ঘোরা ঘুরি আর পায়রার খোপে খোপে চড়ে বেড়ানো বন্ধ করতে হবে।“
আগত বিচ্ছেদের চিন্তা আমার মায়ের মনে ছাপ ফেলে গেল, তার হাতের চামুচটা পড়ে গেল সেই সসপ্যানে, চোখ দুটো ভরে উঠলো পানিতে। আমার কথা বলতে গেলে বলতে হয়, আমার মনে তখন যে আনন্দের ফল্গুধারা বইছে তা ভাষায় বলে বোঝানো মুশকিল। আমার মগজে মেশানো, চাকরী মানে অপার স্বাধীনতা, পিটার্সবার্গ শহরের নাগরীক জীবনের আনন্দ। আমি এর মধ্যেই নিজেকে গার্ড রেজিমেন্টের একজন অফিসার হিসাবে দেখতে শুরু করে দিয়েছি, আমার ধারনায় সেটাই মানব জীবনের চূড়ান্ত সুখের সর্বোচ্চ স্তর।
আমার আব্বা তার পরিকল্পনায় কোন রকমের কোন রদবদল যেমন পছন্দ করেন না তেমন পছন্দ করেন না পরিকল্পনা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোন রকমের গাফিলতি। অর্থাৎ ততক্ষনাৎ আমার যাত্রার দিন নির্ধারন করা হয়ে গেল। যাত্রার আগের দিন সন্ধ্যায় আব্বা আমায় ডেকে বললেন যে তিনি আমার ভাবী-ঊর্ধতন কর্মকর্তার কাছে একটা চিঠি লিখে দেবেন তাই আমাকে পাঠিয়ে দিলেন কাগজ আর কলম আনতে।
“আন্দ্রেজ পেত্রোভিচ, মনে রেখ“ আমার মা বললো, “প্রিন্স বানোজিককে আমার কথা মনে করিয়ে দিও; তাকে বোলো আমি আশা করি, আমার পেত্রোউশার জন্য যা যা ওর পক্ষ্যে করা সম্ভব তা ও করবে।“
“যত্তসব আহমুকের দল!“ বিদ্রুপ করে আব্বা খেকিয়ে উঠলেন। “তুমি কি বলো পিন্স বানোজিকের কাছেও আমি একটা চিঠি লিখবো এখন?“
“তুমিই না এখনি বললে পেত্রোউশার ভাবী-ঊর্ধতন কর্মকর্তার কাছে একটা চিঠি লিখে দেবে!“
“তো? তাতে কি?“
“প্রিন্স বানোজিকইতো পেত্রোউশার ঊর্ধতন কর্মকর্তা। তুমিতো বেশ ভালে করেই জানো সে-ই সেমিনোফস্কি রেজিমেন্টের প্রধান।“
“প্রধান! সে প্রধানই হোক বা অপ্রধান হোক, তাতে আমার কী যায় আসে? পেত্রোউশা মোটেই পিটার্সবাগে যাচ্ছে না! ওখানে গিয়ে ও শিক্ষবেটা কী? টাকা পয়সা ওড়ানো আর বদমাইশী করা! না ও সৈন্যদলে যোগ দেবে, বারুদের গন্ধ নেবে, সৈনিক হয়ে উঠবে নাকি ওখানে গিয়ে হবে অকর্মন্য পাহারাদার, ওর গায়ে উঠবে সৈনিকের পোশাক গোলা বারুদের ঝোলা বাঁধা থাকবে শরীরে। ওর কাগজপত্র সব কই? দাওতো দেখি আমার হাতে।“
মা উঠে গেলো ও গুলো নিয়ে আসতে, সে নিজেই একটা বাক্সোর মধ্যে সযত্নে আমার নামকরণের পোশাকের সাথে ঐ কাগজপত্র গুছিয়ে রেখেছিল। এখন সে তা এনে আব্বার হাতে ধরিয়ে দিল, আমার মায়ের হাত তখনো কাঁপছে থির থির করে। আব্বা মনযোগ দিয়ে ভালো করে সে সব পড়ে নিয়ে টেবিলে নিজের সামনে রাখলন। তারপর শুরু করলেন চিঠি লেখা।
আমি উত্তেজনার তুঙ্গে।
“আমায় পাঠানো হচ্ছে কোথায়,“ চিন্তা করছি, “পিটার্সবুর্গে নয়?“
আব্বা অতি ধীরে সুস্থে কাগজের উপর কলম চালিয়ে চলেছেন, আমার চোখ আর কিছুতেই সেই কলমের আগা থেকে সরছে না। অবশেষে একসময়ে ওনার চিঠি শেষ হলো। আমার কাগজপত্রের সাথে একই খামে তা ঢোকানো হলো। এবার আব্বা চোখের চশমাটা খুলে রেখে আমাকে ডেকে বললেন–
“চিঠিটা লিখলাম আন্দেজ কার্লোভিচ র-কে, আমার পুরাতন বন্ধু এবং সহকর্মী। তুমি যাচ্ছে ওরেনবুর্গে, ওখানে ওনার অধীনস্ততায় কাজ করবে।“
ফট্টাস করে আমার যাবতীয় রঙ্গিন স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। পিটার্সবুর্গের আনন্দোচ্ছল-চনমনে জীবন বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে ধপ্পাস করে ফেলে দেওয়া হলো দেশের দূরবর্তী প্রান্তের কোন এক জংলা অঞ্চলের রস-কস হীন জীবনে। কয়েক মুহূর্ত আগেও আমার কাছে সেনাবাহিনীর এই চাকরিটাকে মনে হচ্ছিল পরম রমনীয় এখন ওটাকেই মনে হচ্ছে চরম শাস্তী। তবে পদত্যাগ ছাড়া এর আর কোন ভিন্ন গত্যন্তর নেই। পরের দিন সকালে দেখা গেল আমাদের দরদালানের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা যাত্রাপযোগী –কিবিতকা–। তাতে চাঁই করে বোঝাই করে রাখা একটা ট্রাংক আর একটা বাক্সে চায়ের আয়োজন, আর কিছু রোমালে বোঝাই করে বাঁধা খাবার-দাবার আর ছোট ছোট পিঠা, এই এতক্ষণে বাড়ীর আহ্লাদীপনার একটু পরশ পেওয়া গেল
মুরুব্বিরা দোয়া করে দিলেন, আর আব্বা বললেন–
“পিটর, খোদা হাফেজ; যার আনুগত্য শ্বিকার করে নেবে তার কাছে সর্বদাই বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করবে ; উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মেনে চলবে; কখনোই অনুগ্রহ আশা করবে না; কাজ নিয়ে কোন গোলযোগ করবেনা, যা বলবে তাই করবে, যা বলবে না তা করার দরকার নেই। একটা প্রবাদ মনে রেখো, নতুন জামার যন্ত নাও, জোয়ান কালে মান বাঁচাও।“
আমার মা, তার কান্না আর থামে না, অনুনয় বিনয় করে আমাকে বললো যেন স্বাস্থ্যের অবহেলা না করি, সাভেলিচকে আদেশ করে বললো যেন ওনার সোনামানিকের দিকে ও খুব ভালো করে খেয়াল রাখে। আমার পরনে খরগোশচামড়ার একটা খাটো –টোউলওপ– তার উপর পা অবধি লম্বা শেয়ালচামড়ার পুরু আলখাল্লার মত একটা জ্যাকেট। আমি –কিবিতকায়– সাভেলিচের সাথে উঠে বসলাম। রওনা হলাম আমার গন্তব্যের দিকে। কাঁদছি প্রচন্ড।
রাতে গিয়ে পৌছালাম সিমবির্স্কে, এখানে থাকতে হবে চব্বিশ ঘন্টা, সাভিলিচের ঘাড়ে বেশ কিছু কাজের দ্বায়িত্ব ন্যাস্ত করা আছে, সে সব ওকে করে ফেলতে হবে। আমি পড়ে থাকলাম সরাইখানায়, সাভিলিচ চলে গেল দ্বায়িত্ব পালনে। জানালার বাইরে তাকিয়ে তাকিয়ে নোংরা এদো একটা গলি দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে শেষে, সরাইয়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম। গিয়ে পৌছালাম বিলিয়ার্ড খেলার ঘরে। সেখানে গিয়ে দেখি একজন পেল্লায় লম্বা ভদ্রলোক, বয়স বছর চল্লিশেক, ঘন কালো গোফ, গায়ে ড্রেসিং গাউন, তার হাতে বিলিয়ার্ড খেলার কিউ, মুখে একটা পাইপ। বিলিয়ার্ড খেলায় দুই খেলোয়াড়ের মধ্যস্থতাকারী কে বলা হয় মার্কার, কাউকে না পেয়ে সেই মার্কারের সাথেই সে খেলছে। সর্ত জিতলে এক গ্লাস ব্রান্ডি আর হারলে টেবিলের নিচ দিয়ে ব্যাঙের মত চার হাত-পায়ে বসে টেবিলটা পেরোতে হবে। দাঁড়িয়ে গেলাম খেলা দেখতে। ওদের খেলা যত বাড়ে, ব্যাঙের মত চার হাত-পায়ে বসে টেবিল পেরোনোর প্রর্দশনীও তত বাড়ে। শেষকালে সেই মার্কার বেচারা টেবিলের নিচেই পড়ে থাকলো। ভদ্রলোক তখন জব্বর কড়া কয়েকটা কথা শোনালো, কবর দেয়ার পর যে সব দোয়া দরুদ পড়া হয়, তাই আর কি। তারপর আমাকে আহ্বান জানালো খেলার জন্য। জানালাম আমি বিলিয়ার্ড খেলতে পারি না। মনে হলো ব্যাপারটা তার কাছে কেমন আস্বাভাবিক ঠেকলো। আমার দিকে কেমন জানি একটু কৃপার দৃষ্টিতে তাকালো। তবে কথা চালিয়ে গেল। জানলাম তার নাম ইভান ইভানোভিচ জাওরিয়ান, সে –তম অশ্বারোহী বাহিনীর ক্যাপ্টেন, সবে সিবির্স্কে এসেছেন লোক নিয়োগ দেয়ার কাজে আর নিজে গেড়ে বসেছেন আমাদের এই একই সরাইখানায়। জাওরিয়ান দুপুরে ওর সাথে খাওয়ার আমন্ত্রন জানালো, সৈনিকের খাবার, আমরা যেমন বলি, খোদা যা খাওয়ায়। সানন্দে সম্মত হলাম; আমরা গিয়ে বসলাম খাওয়ার টেবিলে, জাওরিয়ান পান করে ফেলেছে অনেক, আমাকেও সাধা সাধি করছে মদ্য পানের জন্য, বলছে যেমন চাকরী তেমন অভ্যসে গড়ে তুলতে হবে নিজেকে। বেশ ভালো করে গল্প বলতে পারে লোকটা, শুনতে শুনতে আমি হাসিতে ফেঁটে পড়ছিলাম। খাওয়া দাওয়া সেরে আমরা টেবিল থেকে উঠে পড়লাম, দু‘জন ভাল বন্ধু। এবার সে আমাকে বিলিয়ার্ড শেখাবার প্রস্তাব দিল।
“শোন ভায়া,“ ও বললো, “আমাদের মত সৈনিকদের জন্য এ বড় প্রয়োজনিয় জিনিস। মনে করো, কথার কথা, তোমাকে পাঠানো হলো কোন ছোট্ট এক শহরে; কী করে বেড়াবে সেখানে? সারাক্ষণতো আর ইহুদী খুঁজে খুঁজে খুঁচিয়ে বেড়ানো যায় না। ছোট্ট করে বলতে গেলে, কোন সরাইখানায় যাও এবং সেখানে বিলিয়ার্ড খেলো, ব্যাস। তা খেলাটাতো তেমার শেক্ষা থাকতে হবে, নাকি?“
কথাটা আমার মনে ধরলো, অতিব উৎসাহে আমি খেলাটা শিখতে ঊঠে পড়ে লেগে গেলাম। জাওরিয়ান চিৎকার করে করে আমার উৎসাহ বাড়াচ্ছে, শিক্ষায় আমার দ্রুত উন্নতী দেখে ও বেশ অবাক। আরো কয়েক বার প্রাক্টিস করে নেবার পর ওর প্রস্তাব এলো পয়সা দিয়ে খেলা উচিৎ, সামান্য মাত্র এক –গ্রোচ– [দুই কোপেক] বাজি। না কোন জুয়া-টুয়া নয়, একেবারে এমনি এমনি খেলবার চাইতে ভালো, অযথা খেলা করা, ওর মতে, বদঅভ্যাস।
মেনে নিলাম কথাটা, এবার জাওরিয়ান ডাক দিয়ে বলে দিল পাঞ্চ দিতে, পাঞ্চ– চিনি, পানি আর ফলের নির্জাসে ফোটানো রাম দিয়ে তৈরি এক জাতের মদ্যপ পানীয়। উপদেশ দিলো তা খেতে। বার বার সেই কথা, যেমন চাকরী তেমন অভ্যসে গড়ে তুলতে হবে নিজেকে।
“তাছাড়া,“ ও বলে উঠলো, “পাঞ্চ ছাড়া এই চাকরী মানে লবন ছাড়া তরকারী“
পরামর্শটা মেনে নিলাম। খেলা চলছে, গলায় যত ঢালছি, সাহস তত বাড়ছে। ক্রমাগত আমার বলগুলো উড়ে উড়ে গিয়ে পড়ছে বাইরে। আমার রাগ বাড়ছে। মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে, যে মার্কার আমাদের স্কোর লিখছে, তার উপর। বাজি বাড়িয়ে চলেছি; মানে, সবে স্কুল পেরোনো বাচ্চা ছেলেদের মত আমার অবস্থা। সময় চলিয়া যায়- / নদীর স্রোতের প্রায়, / যে জন না বুঝে, তারে ধিক্ শত ধিক। শেষে জাওরিয়ান তাকিয়ে দেখলো ঘড়ির দিকে। হাতের কিউটা রেখে দিল। আমায় বললো, আমি হেরেছি এক শত রুবল। এবার সব তালগোল পাকিয়ে ফেললাম, একেবারে যাচ্ছেতাই, হতবুদ্ধ অবস্থা। আমার সব টাকা পয়সাতো সাভেলিচের হাতে। আমায় বিড় বিড় করতে দেখে জাওরিয়ান বললো–
“এত চিন্তার কি হলো; আরে ভায়া পরে দিলেই হবে। এখন চলো আরিনুসকার কাছে যাবো।“
কী চাইছেন? দিনের সকালটা যেমন বলদের মত শুরু হলো, রাতটাওকি শেষ হবে ওভাবে। ঐ আরিনুসকার সাথেই রাতের খাওয়া-দাওয়া হলো। জাওরিয়ান সারাক্ষণই আমার গ্লাস পূর্ণ করে চলেছে, আর সেই একই কথা, যেমন চাকরী তেমন অভ্যসে গড়ে তুলতে হবে নিজেকে।
টেবিল ছেড়ে উঠে বুঝলাম তখন আর আমি নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াবার মত অবস্থায় নেই। মাঝ রাতে জাওরিয়াই আমাকে সরাইখানায় পৌছে দিয়ে গেল।
সাক্ষাৎ সাভেলিচের সাথে সাক্ষাৎ দোরগোড়ায়।
“তোমার ঘটনা কি?“ আহত কন্ঠে বললো আমাকে, সৈনিক হয়ে গড়ে উঠবার জন্য আমার প্রবল আগ্রহ আর অবিসংবাদিত প্রচেষ্টার স্পষ্ট লক্ষণ দেখে বলে উঠলো, “এতক্ষণ কোথায় বসে মুখে চুন-কালী মাখালে? ওহ খোদা! এমন অঘটন আগে কখনোই ঘটেনি।“
“মুখ সামলে কথা বল, বুড়ো,“ আমি বলে বসলাম, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। “মনে হয় মাল খেয়েছো। যাও শুয়ে পড় গিয়ে। তার আগে একটু আমাকে বিছানার কাছে নিয়ে যাও।“
পরের দিন সকালে আমার ঘুম ভাংলো, মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা। গত সন্ধ্যার ঘটনা গুলো এলো মেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্মৃতির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমার ধ্যান ভাঙ্গালো সাভিলিচ, ও কামরায় এসে ঢুকলো এক কাপ চা হাতে। “ পিতার আন্দ্রিজচ, বেশ তাড়াতাড়ি স্বাধীন হয়ে যাচ্ছ“ মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কথাটা বললো আমাকে, “বেশ, তা এ তুমি পেলে কোত্থেকে? আমার যতদূর জানা তোমার আব্বা বা দাদাজান কেউই মদ্যপ ছিলেন না। তোমার মায়ের কথাতো চিন্তাই করা যায় না, আজন্ম সে –কভাসেস –ছাড়া আর কোন কিছু এক ফোঁটা জ্বিভে দিয়ে চেখেও দেখেনি। তাহলে এ বদ খাইসলত পেলো কোথা থেকে? কার শিক্ষা আবার, ওই ধাপ্পাবাজ –মসিয়ো– বেশ ভালো শিক্ষাই দিয়েছে, কুত্তারবাচ্চা, এই দাসের জন্য যে এ কত বড় এক মুসিবৎ! [and well worth the trouble of taking a Pagan for your servant, as if our master had not had enough servants of his own!]
এবার আমি সত্যি সত্যি লজ্জ্বা পেলাম। পাশ ফিরে শুয়ে ওকে বললাম–
“এখান থেকে যাও, আমি এখন চা-টা খাবো না।“
উপদেশ, উপদেশ, উপদেশ, একবার শুরু করে দিলে ধর্মোপদেশ, সাভেলিচকে আর থামায় সাদ্ধি কার বাপের।
“পিতর আন্দ্রিজচ, এখন বুঝতে পারছোতো,“ ও বললো, “পাপ ছাড়ে না বাপকেও? খুব যন্ত্রণা হচ্ছে মাথায়, তাই না; কিচ্ছু খেতে ইচ্ছে করছে না। মানুষ গুলো সব আকামে কেন যে মদ-টদ খায়। নাও নাও আধা গ্লাস ব্রান্ডি বা মধু আর জারান শশা খেয়ে নিলে বেশ সুস্থ লাগবে। নাও খেয়ে ফেলো, কী ভাবছো কি?“
এই সময়ে ঘরে এসে ঢুকলো একটা অল্প বয়স্ক ছেলে, জাওরাইন আমার কাছে একটা লিখে চিরকুট পাঠিয়েছে ওর হাতে। খুললাম, পড়লাম, তাতে লেখা–
প্রিয় পিতর আন্দ্রিজচ,
আশা করি অনুগ্রহ করে গতকাল বাজিতে হেরে যাওয়া এক শত রুবল বাহকের হাতে পাঠিয়ে দিয়ে আমায় বাধিত করবে। আমি অসম্ভব অর্থকষ্টে আছি।
একান্তই তোমার
ইভান জাওরাইন।
যেন কিছুই হয়নি। উদাস উদাস ভাব ধরলাম, সাভেলিচকে ডেকে বললাম, ছেলেটার হাতে এক‘শ রুবল দিয়ে দিতে।
“কী–কেন?“ অবাক হয়ে ও আমার কাছে জানতে চাইলো।
“আমি ওর কাছ থেকে ধার নিয়েছিলাম,“ যথা সম্ভব ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলাম
“ তুমি ধার নিয়েছো ওর কাছ থেকে!“ সাভোলিচ কথাটা ফিরিয়ে দিল, এবার আরো বেশী অবাক হলো। “ হঠ করে তুমি এই টাকা ধার করবার সময় পেলে কখন? অসম্ভব কথা। যা ইচ্ছে কর, বাপজান, ও টাকা আমি দেব না।“
এবার চিন্তা করে দেখলাম এই সন্ধিক্ষণে যদি এই একগুঁয়ে বুড়োটাকে আমার কথা মানাতে না পারি তাহলেতো আর ভবিষ্যতে কখনোই ওর অভিভাবকত্ব ছাড়িয়ে স্বাধীন হতে পারবো না। ভিরিক্কি নজরে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম–
“আমি তোমার মুনিব, তুমি আমার চাকর। টাকা আমার, আমি খরচ করেছি আমার ইচ্ছা। এখনো বলছি, মটেই ফোঁস ফোঁস না করে আমার আদেশ পালন কর, যাও।“
আমার কথা শুনে সাভেলিচতো ‘থ, হাতে হাত জড়িয়ে একেবারে হতবাক নিথর।
“ওখানে ওমন গাছের মত দাঁড়িয়ে আছো যে?“ রাগে তেঁতে উঠে বললাম।
সরভেলিচ জুড়ে দিল কান্না।
“আহারে, বাপ, পিতর আন্দ্রিজচ,“ কাঁপা কাঁপা গলায় সে ফুপিয়ে উঠলো; “এর চাইতে তুমি যদি আমাকে মেরেও ফেলতে। ওহ্! সোনা, বলি কি ঐ ডাকাতটাকে লিখে পাঠাও যে তুমি ইয়ার্কি করছিলে, এত টাকা আমাদের কাছে কেত্থেকে আসবে। এক ‘শ রুবল বলে কথা! ওরে আল্লা বলে কী! বলে দাও তোমার মা বাবা এ সব আজে বাজে খেলা ধুলা করতে একেবারে কঠোর ভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন“
“একদম চুপ“ ঝটিতে ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম। “টাকাটা দিয়ে দাও, নইলে এখুনি এখান থেকে তোমায় লাত্থি মেরে খেদাবো।“
সাভেলিচ আমার দিকে গভীর মনঃকষ্ট নিয়ে তাকালো, তারপর গেল আমার টাকা বের করে আনতে। ভেতরে ভেতরে বুড়ো মানুষটার জন্য আমারও ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। নিজেকে বোঝাছিলাম এই না হলে প্রমান করা যাবে না যে আমি বড় হয়ে গেছি। জাওরাইন ওর এক ‘শ রুবল পেয়ে গেল।
সাভেলিচ এই অশূভ সরাইখানা থেকে আমাকে সরাবার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল; এসে জানালো যে গাড়িতে ঘোড়া জোতা হয়ে গেছে। আমি বিবেক-হিনতার মর্মপীড়া নিয়ে সিমর্বিস্ক ছেড়ে চললাম, হৃদয়ে অনুতাপ, এমনকি আমার প্রথম প্রশিক্ষকের কাছে বিদায় নিতেও পারলাম না। কিছুক্ষণের জন্য একবার মনেও হয়েছিল যে আমাদের আর কখনোই দেখা হবে না।
অগ্রদূত
যাত্রাকালে আমার মনের অবস্থা তেমন ভালো নয়। সে-কালের বাজার দর হিসাব করলে আমার কিন্তু কম গচ্ছা দিতে হলোনা। আমার অবস্থা সাপের ছুঁচো গেলার মত, গিলতে পারেনা দুর্গন্ধ বলে ছাড়তে পারেনা সাপের দাঁত ভেতরের দিক বাঁকা বলে; কাউকে বলতেও পারছিনা আবার সহ্য করতেও কষ্ট হচ্ছে: গতকালকে সিমবির্স্কের সরাইখানায় বড় আহম্মকিপনা করে ফেলেছি। সাভেলিচের সাথে দুর্ব্যবহার করার জন্যএখন ভীষণ খারাপ লাগছে। সব মিলিয়ে আমার চরম উদ্বিগ্ন অবস্থা। বুড়ো মানুষটা গোমরা মুখে নিশ্চুপ স্লেজগাড়িটার সামনের দিকে চালকের পাশে, মুখ ওদিকে ঘুরিয়ে বসে, মাঝে মধ্যেই খুক খুক করে কাশছে। আমি অধীর আগ্রহে চিন্তা করছি কি ভাবে ওর সাথে মিলমিশ করে নেওয়া যায়, শুরু করবো কিভাবে তা-ই বুঝে উঠতে পারছি না। শেষমেষ ওকে বললাম—
“দেখো, সাভেলিচ, যা হয়েছে তাতো হয়েই গেছে, এসো এবার ও সব বাদ দিই, আর রাগা রাগিতে কাজ নেই।“
“হ্যারে বাপ, পিতর আন্দ্রিজচ,“ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও উত্তর দিলো, “আমার নিজের উপরই আমার রাগ, সব দোষ আমার। আমার কেমন আক্কেল, তোমায় একা একা ঐ সরাইখানায় ফেলে রেখে চলে গেলাম কেন? কী আর করবো, কপালই খারাপ, না হলে কেনই বা আমাদের ধর্মযাজোকের বউয়ের সাথে দেখা হয়ে যাবে আর কেনই বা আমি গপ্পে বসে যাবো। কথায় বলে, বাঁশ মরে ফুলে, মানুষ মরে ভুলে৤ হায় হায় কি কপাল আমার, কি কপাল, এখন এই মুখ আমি আমার মালিক আর মালকিনকে দেখাবো কিভাবে? ওরা যখন শুনবে ছেলে মাতাল, জুয়াড়ী, তখন আমি তার উত্তরটা দেব কি?
বেচারা সাভেলিচকে সান্তনা দেবার জন্য কথা দিলাম যে ভবিষ্যতে আর কখনোই ওর কথা ছাড়া আর এক পয়সাও খরচ করবো না। বুড়ো আস্তে আস্তে শান্ত হলো তবে ক্ষাণিকখণ পর পর মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বিড় বিড় করে চলেছে—
“এক শ রুবল,মুখের কথা!“
ছুটে চলেছি গন্তব্যস্থানের দিকে। চারিদিকে বিস্তৃত নিরস জংলা প্রান্তর। তাতে ছোট খাট পাহাড় আর গভীর অগভীর গিরিখাত কিছুটা বৈচিত্র জুড়ে দিয়েছে। সবটা বরফে ঢাকা। সূর্য ডুবতে বসেছে। আমাদের –কিবিতকা– ছুটে চলেছে একটুকরো চিকন রাস্তার ধরে। বলা চলে এ গাঁয়ের কোন লোকের স্লেজ যাওয়া দাগ বেয়ে চলেছি। হঠাৎ করেই আমাদের ড্রাইভা সাহেব চারি দিকে দেখে নিয়ে ঝট করে ঘুরে আমাকে বললো–
“বাবু,“ নিজের মাথা থেকে টুপিটা খুলে নিয়ে বললো, “কি বলেন, গাড়ি ঘুরিয়ে নেবো নাকি?“
“কেন?“
“আবহাওয়ার গতিতো বেশী ভালো ঠেকছে না। হালকা বাতাস ছাড়ছে। ঐ যে দেখতে পারছেন না, মাটি থেকে কেমন বরফ উড়ছে।“
“হ্যা তো তাতে হলোটা কি?“
“ আরে ঐযে ঐদিকটা দেখতে পাচ্ছেন না?
হাতের চাবুকটা উচিয়ে পূব দিকে ঈঙ্গিত করে দেখালো।
“আমিতো শুধুই পরিস্কার আকাশ আর স্বেত শূভ্র প্রান্তর দেখতে পারছি।“
“ঐযে ঐযে, দেখেন, চোখে পড়েনা, এযে ছোট একটা মেঘ!“
দেখতে পেলাম, দিগন্তের কাছাকাছি সাদা এক দলা মেঘ, ভেবেছিলাম অনেক দূরে কোন পাহাড় টাহার হবে। আমাদের কোচোয়ান সাহেব আমাকে বোঝালো, ঐ ছোট দলা পাকানো মেঘটাই এখানকার তুষারঝড়ের পূর্বলক্ষণ। এ অঞ্চলের তুষারঝড়ের বৈশিষ্টের কথা আমি আগেই শুনেছি, অনেক সময়ে এমন আস্ত আস্ত গাড়িও নাকি ভয়ঙ্কর তুষারপাতে ডুবে যায়। সাভেলিচও কোচোয়ান সাহেবের সাথে একমত, আমায় ফিরে যাবার পরামর্শ দিচ্ছে, তবে আমার মনে হলো না যে বাতাস মোটেই অনেক জোরে বইছে। বরং আশা করছি আমরা সময় মত আমাদের পরবর্তী গন্তব্য অব্দি পৌছে যেতে পারবো। তাড়া দিলাম দ্রুত গাড়ি চালিয়ে তাড়াতাড়ি গন্তব্যে পৌছুবার জন্য। সেও পূব দিকে বারবার তাকাতে তাকাতে ঘোড়া গুলো দাবড়ে নিয়ে চললো। বাতাস দ্রুত বেড়ে গেল, ছোট দলা পাকানো মেঘটা চড়চড় করে বেড়ে বড় আর ঘন হয়ে একেবারে গোটা আকাশটা ঢেকে ফেললো। হালকা তুষারপাত শুরু হয়ে গেল তবে অল্প কিছুক্ষনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল ভীষণ তুষারপাত। এখন আর বাতাস নিছক বইছে না ছুটছে, গজরাচ্ছে। নিমেশে ধূসরবর্ণ আকাশটা হারিয়ে গেল তুষারের ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে। পৃথিবীর বুক থেকে দমকা বাতাস উঠে এসে আমাদের চারিপাশটা আধাঁর করে ফেললো।
“ দেখেনতো বাবু, কেমন হতভাগা আমরা,“ কোচোয়ান সাহেব গলা ফাটিয়ে বলে ওঠে, “পড়েছি—বাওরান–এর পাল্লায়।“
মাথা বের করলাম –কিবিতকার– বাইরে, চারিদিক আঁধারাচ্ছন্ন বিভ্রান্তিকর, বাতাসে যেন পাশবীক শক্তি।
তুষার ঝরছে আমাদের চারিদিক, ঘোড়া গুলোর পক্ষে হাঁটা ছাড়া ভিন্ন কোন উপায় নেই, একটু পরে হাঁটাও বন্ধ হয়ে গেল।
“তুমি যাচ্ছো না কেন?“ কোচোয়ান সাহেবকে আমি ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললাম।
“তা যাবোটা কোন দিকে?“ স্লেজ থেকে নেমে সে আমায় উল্টো প্রশ্ন করলো। “আল্লাই জানে আমরা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে। আরতো কোন পথ ঘাট দেখি না। তাছাড়া আঁধার নেমে গেছে।“
ওকে বকা বকি করতে লাগলাম। তবে সাভেলিচ কথা বলছে তার পক্ষ নিয়ে।
“তুমি আগেই ওর কথা শুনলে না কেন,“ ও বললো আমাকে, কন্ঠে রাগ। “আস্তানায় ফিরে যেতাম, একটু চা-টা খেয়ে, সকাল পর্যন্ত টানা একটা লম্বা ঘুম দিয়ে উঠতে পারতে। ততক্ষণে ঝড় ঝঞ্জা সব শেষ, ব্যাস আমরা আবার রওনা হতাম। এত তাড়া হুড়া কিসের? তুমি কি বিয়ে করতে যাচ্ছ!“
সাভেচিনের কথাই ঠিক। এত জলদি জলদি পৌছে করবোটাই বা কি? তুষার অনাবরত পড়েই চলেছে– বরফের ঢিবি উচু হয়ে উঠছে –কিবিতকার– চারপাশে। ঘোড়া গুলো নিথর নিরব, মাথা ঝুলে পড়েছে, মাঝে মধ্যেই থির থির করে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
কোচোয়ান নীচে নেমে হাঁটা হাঁটি করছে ঘোড়া গুলোর চারিপাশে, জিন ঠিক ঠাক করে দিচ্ছে, যেন ওর আর এখন তেমন কিছুই করার নেই। সেভিলিচ বকবক করেই চলেছে। আমি বড় আশা নিয়ে ইতি-উতি তাকিয়ে তাকিয়ে খোঁজবার চেষ্টা করছি যে কোন দিকে কোথাও কোন বাড়ি ঘর বা রাস্তা-ঘাটের চিহ্ণ দেখা যায় কি না। চারিদিকে শুধুই তুষারপাত আর এলো মেলো ঝড় ঝাপটা।
মনে হলে হঠাৎ করেই কালো মতো কি যেন একটা জিনিস আমার চোখে পড়লো।
“এই যে কোচোয়ান ভাই,“ আমি চেচিয়ে উঠলাম, “ ঐ যে ওখানে কালো মত জিনিসটা কী বলোতো?“
আমাদের কোচোয়ান সাহেব সে দিকে কিছুক্ষণ বেশ ভালো করে তাকিয়ে দেখলো।
“আল্লাহই জানেন,“ নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে বসে কথা গুলো সে বললো আমাকে।
“ওটা কোন স্লেজ গাড়ি নয়, কোন গাছ-টাছও নয়, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে ওটা নড়ছে। নিশ্চই কোন নেকড়ে নাহলে মানুষ।
ওকে বললাম ঐ অজানা জিনিষটার দিকে এগিয়ে যেতে, মনে হলো ওটাও আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। দু‘মিনিটের মধ্যে পরিষ্কার দেখতে পেলাম একটা মানুষ, দেখা হলো ওর সাথে।
“এই যে ভালো মানুষের ছা‘,“ আমাদের কোচোয়ান তাকে ডাক দিল, “শোন, এখানকার রাস্তা ঘাট কিছু চেনো তুমি?“
“এ যে এইতো রাস্তা,“ পথিক উত্তর দিল। “আমিতো শক্ত পোক্ত মাটির ওপর দাঁড়িয়ে; তা রাস্তার হদিস জেনে এখন আর কী হবে?“
“এই যে চাষা ভাই, শোন,“ আমি ওকে বললাম, “দেশের এই অংশ সম্পর্কে তোমার জানা আছে? তুমি কি আমাদেরকে পথ দেখিয়ে এমন কোথাও একটা নিয়ে যেতে পারো যেখানে কোন মতে আমরা আজকের রাতটুকু কাটাতে পারি?“
“এই দেশটা আমি চিনি কি না? হায় খোদা,“ অচেনা লোকটা আরো বললো, “কখনো ঘোড়ার পিঠে আবার কখনো পায়ে হেঁটে হেঁটে এ অঞ্চলটার দূর সুদূর প্রান্তর অবধি আমি চষে ফেলেছি। এখন আবহাওয়ার যা অবস্থা! পথের হদিস জেনেও কোন লাভ নেই, কুল কিনারা পাওয়া যায় না। তার চাইতে ভালো এখানে বসে বসে অপেক্ষা করো; এক সময়ে এই ঘূর্ণিঝড় থেমে যাবেই, আকাশ পরিষ্কার হয়ে ইঠবে, আমরা সবাই তখন তারার মিটিমিটি আলোতেই পথ খুঁজে বের করে নেব।“
লোকটার ধি শক্তি আমায় সাহস যোগালো। আমি মনোস্থির করে ফেললাম, এই উন্মুক্ত প্রান্তরেই রাতটা কাটিয়ে দেব, দৈবের হাতে নিজেকে সর্মপন করে দিলাম, হঠাৎ করেই সেই পথিক উঠে বসলো কোচোয়ান সাহেবের সিটের পাশে, বললো—
“আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া, এই দিকে কাছা কাছি কোথাও কোন একটা বাড়ি আছে। ডান দিকে যাও ডান দিকে।“
“কেন, তা আমি ডান দিকে যাবো কেন?“ আমাদের কোচোয়ান সাহেব মুখ ভেংচি কেটে বললো।
“তুমি জানলে কী ভাবে রাস্তা কোন দিকে, কথা একটা বললেই হলো, অন্যের ঘোড়া, অন্যের জিন–চাবুক ঘোরাবার তুমি কে হে!“
মনে হলো ড্রাইভারের কথাই ঠিক।
“কেন, ও দিক কেন,“ বললাম অজানা লোকটাকে, “তোমার কি মনে হয় অদূরে কোথাও ঘর বাড়ি আছে?“
“ও দিক দিয়েই বাতাস বয়ে আসছে,“ ও উত্তর দিল, “বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ পেলাম, অর্থাৎ ও দিকে কাছা কাছি কোথাও একটা না একটা বাড়ি-ঘর আছেই।“
ওর বুদ্ধিমত্তায় এবং গন্ধ বিচারের সূক্ষ্মপারদর্শিতা দেখে আমি আশ্চর্যান্বিত না হয়ে পারলাম না। ও যে দিকে বলছে সেই দিকেই যেতে বললাম আমাদের কোচোয়ানকে। ঘোড়া গুলো তুষারের চাইয়ের মধ্যেই লাঙ্গলের ফলার মত নিজেদের পা টেনে টেনে পথ বের করে নিচ্ছে। আমাদের –কিবিতকাটা– ধিরে ধিরে এগিয়ে চলেছে, কখনো কখনো বরফের চাঁইতে ঠেলে ওঠে , কখনো বা কোন ঢাল বেয়ে হিড় হিড় করে নেমে যায়, এপাশ ওপাশ দুলছে।এ যেন অনেকটা ঝড়ো সমুদ্রে নৌ যাত্রা।
সাভেলিচেএকটু পর পরই আমার গাঁয়ে উপর পড়ে গোঁ গোঁ করে ওঠে। গাড়ির পর্দাটা নামিয়ে দিলাম, গায়ের ঢিলে ঢালা পোশাকটা ভালো করে জাপটে ধরে জড়িয়ে নিলাম। ঝড়ের গোঁগোঁয়ানী ঘুমপাড়ানী গান আর গাড়ী দুলনীতে আমি কখন যেন ঘুমিয়ে পড়লাম। এই অবস্থায় আমি একটা স্বপ্ন দেখলাম, জীবনে কখনই আমি সে স্বপ্ম ভুলবো না। তার মধ্যে আজো আমি আমার ভব্যিষৎবানীর ঈঙ্গিৎ খুঁজে পাই। ওটাই আমার জীবনের সব চাইতে অদ্ভুত ঘটনা। পাঠকগণ, এমন ঘটনা হয়তো আপনাদের জীবনেও ঘটে থাকতে পারে, আমাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। সবাই অবশ্যই মেনে নেবেন, শত ঘৃণা থাকা স্বত্বেও একেবাবে সংস্কার মুক্ত মানুষেরও মনের কোন গভীরে কোথাও না কোথাও অনুমাত্র কু-সংস্কার বাসা বেঁধে থাকে, সেটাই স্বাভাবিক।
আমি তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ের সেই স্তরে পৌছে গেছি যখন সত্য আর কল্পনা মিলে মিশে একাকার, একসাথে চলে। মনে হলো তুষার ঝড় চলছে, আমরা সেই বরফের মরুর মধ্যে চরে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ করেই মনে হলো যেন আমি একটা সিংহদ্বার দেখছি, ভেতরে ঢুকলাম, আমাদের বাড়ির উঠান। আমার মাথায় তখন প্রথম চিন্তা, ভয়, না বলে কয়ে এভাবে বাপের ছাদের নিচে ফিরে আসায় আমার আব্বা নিশ্চয়ই ভীষণ রেগে যাবেন, মনের করবেন এটা আমার পূর্বপরিকল্পিত অবাধ্যতার লক্ষণ। অস্বস্তি। আমি –কিবিতকা থেকে বেরিয়ে পড়লাম, দেখলাম মা আচ্ছে আমার দিকে, তাক মনমরা মনে হলো।
“শব্দ করো না,“ সে আমাকে বললো, “তোমার আব্বা মৃত্যুশয্যায়, তোমার কাছে বিদায় নিতে চায়।“
প্রচন্ড ভয় পেলাম, তার পিছু পিছু গেলাম শোয়ার ঘরে। চারিদিক চেয়ে দেখছি, ঘরটাতে আলো কম। বিছানার পাশে কিছু লোকজন দাঁড়িয়ে দেখছি সবাই মর্মাহত, মাথা ঝুকিয়ে দাঁড়িয়ে। আমি দাঁড়ালাম গিয়ে পায়ের কাছে। মা পর্দা সরিয়ে বললো—
“ আন্দ্রেজ পেত্রোভিচ, প্রেত্রুশকা ফিরে এসেছে; তোমার অস্বুস্থতার কথা শুনে ও ফিরে আসলো। ওকে দোয়া করে দাও।“
আমি মাথা ঝোকালাম। অবাক হয়ে দেখি বিছানায় আমার আব্বার জায়গায় কালো দাড়িওয়ালা একজন কৃষক, বেশ আমুদে দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। আমি চরম বিস্ময়ে ঘুরে তাকালাম মায়ের দিকে।
“এর মানে কী?“ আমি চিৎকার করে উঠলাম। “এতো আমার আব্বা নয়। আমাকে তাহলে এই কৃষক লোকটার দোয়া নিতে বলছো কেন?“
“ব্যাপারটাতো এক, পেত্রোশা,“ আমার মা বললো। “উনি তোমার উকিলবাপ। ওনারে হস্ত-চুম্বন করো, ওনার দোয়া নাও।“
আমি একমত হতে পারলাম না। এবার কৃষকটি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে বসলো, চট জলদি কোমরের বেল্ট থেকে নিজের কুড়ালটা খুলে নিয়ে দশ দিক ঘোরাতে লাগলো। আমি উড়ে যাবার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। কামরাটা হঠাৎ করেই লাশে লাশে ভরে উঠলো। আমি সে সবের গায়ে গায়ে ধাক্কা খাচ্ছি, পড়ে যাচ্ছি; রক্তের বন্যায় আমার পাপ পিছলে যাচ্ছে। সেই ভয়ংকর কৃষক খুবই শান্ত ভাবে আমাকে ডেকে বললেন–
“ভয় কী, আমার কাছে আসো; এসো আমি তোমায় দোয়া করে দিই।“
ভয়ে আমার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেতে বসেছে।
ঠিক সেই মূহুর্তে জেগে উঠলাম। ঘোড়া গুলো থেমে গেছে, সেভিলিচ আমার হাত ধরে নাড়া দিয়ে ডাকছে।
“বেরিয়ে এসো, খোকাবাবু,“ ও আমায় ডাকছে; “এইতো আমরা চলে এসেছি।“
“কোথায় এসেছি?“ চোখ কচলাতে কচলাতে জানতে চাইলাম।
“রাতটা থাকার মত একটা জায়গায় পাওয়া গেছে। আল্লাহ মেহেরবান; একেবারে হঠাৎ একটা বাড়ির বেড়ায় এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। বেরিয়ে এসো, খোকাবাবু, দেখিতো ঝটপট বেরিয়ে এসে ঘরে ঢুকে একটু ওম পোহাও।“
–কিবিতকা– থেকে বেরোলাম। তুষারঝড়ের তর্জন-গর্জন তখনো থামেনি, দাপট কমেছে। কুচ কুচে কালো অন্ধকার রাত, নিজের হাতটাও পরিস্কার দেখা যায় না। গৃহ কর্তা নিজেই আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে গেল দরজার কাছ থেকে, গায়ে ঢোলা-হাতা জামার ঘেরের তলে হাতে লন্ঠন। নিয়ে গেল একটা ঘরের ভেতর, ছোট তবে চমৎকার পরিপাটি। ঘরে গাছের ডালের মশাল জ্বলছে, এ গুলোকে বলা হয় –লওউরচিনা–। দেয়ালে ঝুলছে একটা লম্বা নলের বন্দুক আর একটা কসাকদের উচু টুপি।
গৃহকর্তা নিজে একজন ইয়াক কসাক, কৃষক, বয়স প্রায় ষাইট, এখনো সতেজ, বলিষ্ঠ শরীর। সাভেলিচ চায়ের আয়োজন নিয়ে ঢুকলো এ ঘরে। একটু আগুন চাইলো আমার জন্য দু এক কাপ চা বানাবে বলে, এখন চা-ই চাই, তবে আগে কখনোই চা আমাকে এমন করে টানেনি। গৃহকর্তা দ্রুত চলে গেলো ব্যবস্থা নিতে।
“আমাদের অগ্রদূতের অবস্থা কী? সে কোথায়?“ সাভেলিচের কাছে জানতে চাইলাম।
“এই যে, গুরু“ ওপর থেকে একটা কন্ঠ শোনা গেল।
চোখ তুলে চেয়ে দেখলাম সোটভের ওপরটা, দেখি এক গাল কালো দাড়ি আর জ্বলজ্বলে দুটে চোখ।
“বেশ, তা আপনার খুব শীত লাগছে মনে হয়?“
“শীত না লেগে পারে,“ ও উত্তর দিল, “এইতো গায়ে মাত্র একটা ঢিলে ঢালা একটা ক্যাফতান তাও শতছিন্ন? আমার একটা –টোউলোউপ– ছিল বটে, তবে, ওতে শরীর ঢাকা যেত না, গতকাল ওটা ব্রেন্ডির দোকানে বন্দক দিয়ে এসেছি। তখন মনে হয়নি এবার শীত এত কাবু করতে পারবে।“
ঠিক এই সময়ে গৃহকর্তা ফিরে এলো অত্যন্ত সজ্জিত রুশ দেশীয় চায়ের ভান্ড, –সামোভার– নিয়ে, তাতে ফুটন্ত চা।
আমি সেই অগ্রদূতকে এক কাপ চা খাওয়ার আমন্ত্রন জানালাম। সে লাফ দিয়ে নিচে নামলো।
আমি তাকে আপদমস্তক দেখে মোহিত হয়ে গেলাম। গোটা চল্লিশেক বছরের মধ্যম উচ্চতার রোগাটে পুরুষ, কাঁধ চওড়া। গালের কালো দাঁড়িতে সাদা ছোপ ধরেছে, চঞ্চল রড় রড় চোখ দুটো অবিরত চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চেহারার অভিব্যাক্তিতে আকর্ষণীয় ভাবের সাথে সাথে শয়তানীপনার ছোয়া স্পষ্ট। মাথার চুল ছোট করে ছাটা। গায়ে দিয়েছে ছোট একটা ছেড়া –আরমাক–, মানে খাটো–ক্যাফটান– আর পরনে তাতারদের চওড়া পাজামা।
আমি তাকে এক কাপ চা খেতে বলেছি; একটু চেখে মুখটা বিকৃত করে ফেললো
“আমাকে একটু মাফ করবেন, গুরু,“ আমাকে বললো, “এক ঢোক ব্রান্ডি খেলে ভালো হতো; আমাদের কসাকদের আবার সাধারনত ঐ চায়ে টায়ে চলে না।“
আমি সদিচ্ছায় তার আকাঙ্ক্ষা মেনে নিলাম। গৃহকর্তা তার আলমারীর একটা তাক থেকে একটা জগ আর একটা মগ বের করে আনলো। ওর দিকে যাওয়ার সময় ভালো করে ওর চেহারার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললো–
“ ও, আচ্ছা আচ্ছা,“ সে বললো, “তারমানে তুমিই আবার আমাদের দুনিয়াতে। আল্লাহরওয়াস্তে, এবার আসলে কোত্থেকে, বলতো?“
আমাদের সেই পথপ্রর্দশক অর্থবহ ভাবে চোখ টিপে অতি প্রচলিত একটা লোককথায় উত্তর দিল–
“একটা চড়ুই উড়ছিল বাগিচায়, খুঁটে খুঁটে খাচ্ছিল শণবীজ; দাদী ফিকে মারলো ছোট্ট একটা ঢিল, সেটা ওটার গায়ে লাগেনি। তারপর, তোমরা সবাই আছো কেমন?
“আমরা সবাই আছি কেমন?“ আমাদের গৃহকর্তাও যোগ দিলো, প্রবাদ প্রবচনে। “সন্ধ্যা নেমেছে, প্রার্থনার ঘন্টা বেজে উঠেছে, তবে যাজকের বউ বাধা দেয়, যাজক গেছে বাইরে কাজে, শয়তানগুলো আজ পরবাসী গির্জার চত্বরে।“
“চুপ করো চাচা,“ ভবঘুরে লোকটা প্রতিউত্তর করে, “বৃষ্টি নামলেই মাসরুম গজাবেই, আর মাসরুম পেলে ঝুড়িও খুঁজে পাবে, মাসরুম রেখো। আর এখন“ (আবার একবার চোখ মেরে ঈশারা করে) “তোমার কুঠারখানা লুকিয়ে রাখো। শিকারভূমির রক্ষক এখন বাহিরে। গুরুর স্ব্স্থ্য কামনায়।“
এই বলে মগটা নিলো, ক্রুশ চিহ্ণ এঁকে নিয়ে, এক ঢোকে ওর মগের ব্রান্ডিটুটু গিলে ফেললো, তারপর, আমার দিকে মাথা ঝুকিয়ে সন্মান জানিয়ে, স্টোভের ওপর ওর ডেরায় ও ফিরে গেল।
আমি তখন ওদের সেই চোরা-গোপ্তা কথার একটা বর্ণও বুঝিনি। অনেক পরে আমি বুঝতে পারি সবে, ১৭৭২ সালের যে বিদ্রোহ দমন করা হয়েছে, ওরা সেই সব ইয়াক সেনাদের ব্যাপারে কথা বার্তা বলেছিল।
সাভেলিচ ওদের কথা শুনছিল ভীষণ বিরক্ত হয়ে, সন্দেহজনক দৃষ্টিতে কখনো ও দেখছে গৃহকর্তাকে আবার কখনো কখনো দেখছে সেই গাইডকে।
এই যে এখানে যে বাড়িটাতে আমরা আশ্রয় পেয়েছি ওটা বিস্তৃন্ন স্টেপভূমির মাঝখানে পড়ে আছে, রাস্তা ঘাট থেকে অনেক দূর, আসে পাশে কোন জন বসতি বা বাড়ি-ঘর নেই। এটা ডাকাতদের আস্তানা ভাবতেও তেমন কোন সমস্যা নেই। আমরা আর কী-ই বা করতে পারি। এখনতো আর চলে যাওয়াও সম্ভব নয়। সাভেলিচের অস্বস্তি আমার কাছে বেশ একটা আমোদের ব্যাপার। বেঞ্চটার উপরই হাতপা ছড়িয়ে দিলাম। আমার বৃদ্ধ পরিচারক শেষ মেষ ঠিক করলেন স্টোভের উপরেই উঠে শোবেন, আমাদের গৃহকর্তা মেঝেতেই শুয়ে পড়লেন। অতি শিঘ্রই সকলের নাসিকার গর্জান শোনা গেল। আমি নিজেও কিছুক্ষণের মধ্যেই মরার মত ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে উঠলাম একটু দেরি করে। দেখি, ঝড় শেষ। সূর্য্য উজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে। যতদূর চোখ যায় শুধু তুষারের ঝকঝকে চাদর পাতা সুদূর প্রান্তর অবধি। গাড়িতে ঘোড়া জোতা শেষ। গৃহকর্তার পাওনা বুঝিয়ে দিলাম। সে এতই কম ভাড়া চাইলো যে সাভেলিচ, দরাদরি যার স্বভাবে, সেও কোন কথা বললো না। গত সাঝে সে যেমনটা সন্দেহ করেছিল এখন আর মনে সে সব নেই। আমাদের জন্য গাইড বেচারা যা করলো সে জন্য ওকে কাছে ডেকে, ধন্যবাদ জানালম। সাভেলিচকে বললাম অর্ধেকটা রুবল উপহার হিসাবে ওকে দিতে।
সাভেলিচের ভ্রুজোড়া কুঁচকে উঠলো।
“অর্ধেকটা রুবল!“ ও খেঁকিয়ে উঠলো। “কেন? অর্ধেকটা রুবল উপহার কেন দিতে হবে? ঝড়ের রাতে কন কনে শীতের মধ্যে ওকে তুমি পথ থেকে তুলে এনে এ আরাম আয়েশে রাখবার ব্যবস্থা করে দিয়েছে তাই? আমি তোমাকে মান্যি করে চলি, খোকাবাবু, কিন্তু অর্ধেকটা রুবল নষ্ট করবার মত অবস্থা আমাদের নেই। আর যদি সবাইকে এভাবে বখশীশ দিতে দিতে যাও তাহলে আমাদের কিন্তু শেষে না খেয়ে মরতে হবে।“
এ ব্যাপারে আমি আর সেলভিচের সাথে তর্ক করতে চাই না। পুরোটাই আমার টাকা, কথা মত, তার কাছে গচ্ছিত রাখা। এবার আমার বিরক্ত লাগছে, একটা মানুষ আমার উপকার করেছে, হয়তো প্রাণনাশক কোন বিপদের মত অত বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়ে আনেনি তবে যথেষ্ঠ সংকটাপন্ন অবস্থার মধ্যেতো পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তাকে আমি ইচ্ছা মত একটু উপহারও দিতে পারবো না!
“বেশ,“ সাভেলিচকে ঠান্ডা মাথায় বললাম, “ঠিক আছে তুমি যদি ওকে অর্ধ্যেকটা রুবল না দিতেই চাও, ওকে অন্তত আমার গায়ের একটা পুরাতন কোর্ট দিয়ে দাও; ওর গায়ের কাপড়টা দেখ কী পাতলা। ওকে না হয় আমার খরগোশ চামড়ার –টাউলাউপটা– দিয়ে দাও।“
“কি বলছো কি তুমি, বাপ, পিটর আন্দ্রেজচ!“ অবাক বিন্ময়ে চিৎকার করে উঠলো সাভেলিচ। “তোমার গায়ের –টাউলাউপ– দিয়ে ও কি করবে? একটু পরেই সামনে প্রথমে যে সূড়িখানা পাবে সেখানেই বন্দক দিয়ে মদ গিলবে ঐ কুকুরটা।“
“তা এই যে বুড়ো ভাম, সেটা দেখার কাজ তোমার নয়,“ ভবঘুরে লোকটা মুখ খুললো, “ওটা দিয়ে আমি মদ খাই বা না খাই। গুরু ওনার নিজের গায়ে দেওয়ার কোর্টটা আমায় উপহার দিতে চেয়েছেন। মানে ওটা গুরুর ইচ্ছা এখন দাসাদিদাস হিসাবে তোমার দায়িত্ব ওনার কথা অমান্য না করে তা প্রতিপালন করা।“
“তোমার মনে কি আল্লা-খোদার ভয় নেই, ডাকাত কোথাকার,“ সাভেলিচ তেতে উঠে বললো। “দেখতে পাচ্ছ ছেলেটা এখনও বাচ্চা তাছাড়া বোকার হদ্দ। তুমি লুটতরাজ শুরু করে দিয়েছো। ও যে দিতে চাচ্ছে তাতেইতো তোমার খুশী হওয়া উচিৎ। তুমি ঐ ভদ্রলোকদের গায়ে দেওয়ার –টাউলাউপ– নিয়ে করবেটা কী? তোমার যা শরীর ওটাতো ঠিক ভাবে তোমার গায়েও লাগবে না, ছোট হবে।“
“কথার প্যাচ- ঘোর আর ভালো লাগছে না,“ আমার সহযাত্রীবে বুঝিয়ে বললাম। “কাপড়টা নিয়ে এসো জলদী।“
“হায়! আল্লাহ!“ সাভেলিচ বিড় বিড় করতে থাকে। “খরগোশ-চামড়ার –টাউলাউপ–, এখনো নতুন! তাও আবার দিচ্ছে কাকে?–না একটা মাতাল ফকিরকে।“
যাইহোক –টাউলাউপটা– আনা হলো। সেই ব্যাটা ভবঘুরেতো সরাসরি ওটা গায়ে চড়াতে লেগে গেলো। –টাউলাউপটাতো– এমনিতেই আমার গায়ে একটু ছোট হয়ে গেছে, ওর গায়েতো আসলেই এক্কেবারে আটোসাটো। তবু কোন মতে জোরজার করে গায়ে দিল সেইটা। সেলাই করা জায়গা গুলো সব ছেড়ে ছেড়ে অবস্থা। কাপড়টা চড় চড় করে উঠলো দেখে সাভেলিচ চাপা গলায় চিৎকার করে ওঠে।
আর ভবঘুরে লোকটাতো আমার উপহার পেয়েই মহা খুশী। সে আমাকে –কিবিতকা– পর্যন্ত এগিয়ে দিলো, মাথাটা সন্মান দেখাতে একটু ঝুকিয়ে বললো “ধদ্যবাদ, গুরু, আপনি ভালো মনের মানুষ, আল্লাহ অবশ্যই আপনার ভালো করবেন। যত দিন বেঁচে আছি আমি কখনোই আপনার এই মেহেরবানির কথা ভুলবো না।“ ও চলে গেল নিজের পথে, আমরা রওনা দিলাম। সাভেলিচ মুখ গোমরা করে আছে, সেদিক নজরই দিলাম না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তুষার-ঝড়, ঐ গাইড আর আমার খরগোশচামড়ার –টাউলাউপ–, সব উবে গেলো মাথা থেকে।
ওরেনবুর্গে পৌছানো মাত্র চলে গেলাম রজেনারেলের কাছে। দেখলাম একজন উচু লস্বা মানুষ, বয়সের ভারে বাঁকা, মাথায় লম্বা লম্বা চুল বেশ সাদা; পরনের পুরোনো ইউনিফর্ম মনে করিয়ে দেয় যে তিনি জার আন্নির সময়কালের কোন সৈনিক। তার উচ্চারনে বেশ স্পষ্টতঃ জার্মান টান। ওনার হাতে আব্বার লেখা চিঠিটা দিলাম। উপরে নিজের নামটা পড়ে নিয়ে চট করে একবার আমার দিকে তাকিয়ে দেখে নিলেন।
“ আহ্!,“ বললেন, “এইতো সে দিন আন্দ্রেই পেত্রোভিচ তখন বয়সে তোমার মতই হবে, আর এখন তার তত বড়ই একটা সুপুত্র। বেশ, বেশ–সময় বুঝলে সময় বহিয়া যায়, নদির স্রোতের প্রায়।“
উনি চিঠিটা খুললেন, জোরে জোরে পড়ছেন, সেই সাথে অনর্গল নিজেস্ব মতামত নিক্ষেপ করে চলেছেন।–
“‘জনাব, মহামান্য আশা করি‘– এসব আবার কী, আরে শিষ্টাচার? লজ্জ্বা লজ্জ্বা, এ ভাবে লিখতে ওর লিখতে লজ্জ্বা করলো না! অবশ্যই সবার উপর নিয়মানুবর্তিতা, তবু একজন পুরাতন সহকর্মীর সাথে আবার এত শিষ্টাচার কিসের? ‘মহামান্য জনাব, আপনার কি মনে পড়ে..‘ উ্ম! ‘আর যখন মরহুম ফিল্ড মার্শাল মুনিচের অধনস্ততায় অভিযানকালে, আবার ছোট ক্যারোলিনা‘–ই!–ই –ব্রুডার–! তা আমাদের সেই সব পুরাতন দিনের ইয়ার্কি মশকরা ওর সবই মনে আছে তাহলে, অ্যা? ‘এখন কাজের কথা বলি। আমার হতচ্ছাড়াটাকে পাঠালাম‘—হুম্! ‘ওকে শজারু চামড়ার হাত মোজা দিয়ে ধরবেন‘— মানে, শজারু চামড়ার হাত মোজা মানে কী?‘ মনে হয় রুশ ভাষার কোন প্রবাদ।
“ওকে শজারু চামড়ার হাত মোজা দিয়ে ধরবেন‘, এ কথার মানে কী?“ আমার দিকে ফিরে, জানতে চাইলেন আমার কাছে।
“মানে,“ চেহারা একেবারে নিরিহ সাদা সিদে করে ওনাকে বললাম, “কাউকে অতি যন্ত্রের সাথে লালন পালন করা, কড়া কড়ি না করা, শজারুর মত মুক্ত স্বাধিন ভাবে ছেড়ে দেওয়া।“
“হুম বুঝতে পারছি।“
“‘কোন রকমে কোন স্বধিনতা দেবার প্রয়োজন নেই‘–না; শজারু চামড়ার হাত মোজা দিয়ে ধরা মানে অন্য কিছু। ‘ওর কাগজপত্র সাথে দিয়ে দেওয়া হলো‘ –কোথায় কাগজপত্র কোথায়? আহ এই যে —‘সিমেনোফেস্কি রেজিমেন্ট-এ‘–আচ্ছা ঠিক আছে; সব হয়ে যাবে। ‘আমার অভিবাদন গ্রহন করবেন, আয়েজন ছাড়াই এক সৈনিককে জানাই আরেক পুরাতন বন্ধু আর সহকর্মী সৈনিকের স্যালুট‘আহ! ওর অন্তন সব কিছু মনে রেখেছে,“ ইত্যাদি ইত্যাদি।
“বেশ, আমার বাপ,“ পড়া শেষ করে, আমার কাগজ-পত্র আর চিঠিটা এক পাশে সরিয়ে রেখে বললেন, “ সব হয়ে যাবে, তুমি —তম রেজিমেন্টের অফিসার পদে নিযুক্ত হলে, কাল তোমাকে চলে যেতে হবে বেলোগোর্স্ক দূর্গে, সেখানে তোমাকে কাজ করতে হবে কমান্ড্যান্ট মিরোনোফের অধিনে, বেশ সাহসী এবং যোগ্য মানুষ। সেখানে তুমি আসলেই কাজ করার সুযোগ পাবে, নিয়ম কায়দা-কানুন শিক্ষতে পারবে। ওরেনবুর্গে তোমার জন্য ভালো হবে না; চিত্তরঞ্জন যুবকদের জন্য মারাত্মক অনিষ্ঠকর। আজ তোমাকে খাওয়ার আমন্ত্রন জানাচ্ছি, আজ আমার সাথে খাওয়া দাওয়া কর, সকালে উঠে রওনা দিও।“
“খারাপের শেষ সীমায় এসে পৌছালো মন মেজাজ,“ নিজে নিজেই ভাবছি। “মায়ের কোলে কোলে থাকা অবস্থায় হয়ে গেছিলাম গার্ড রেজিমেন্টের সার্জেন্ট, তাতে লাভটা হলো কী? শেষে এসে ঠেকলাম কোথায়, না —তম রেজিমেন্টে, কিরগিজ-কাইসা স্তেপ এলাকা সীমান্তে পড়ে থাকা এক দূর্গে!“
আন্দ্রেজ কার্লোভিচের সাথে রাতে খেলাম, সাথে ছিলেন তার পুরানো এডিকং। তার টেবিলে একেবারে জমপেশ জার্মানী মিতব্যয়িতার নিদর্শন পাওয়া গেল। মনে হচ্ছে পাছে ওনার স্ত্রী বর্জিত জীবনে, খাওয়ার টেবিলে ঘন ঘন অতিথী হয়ে আসতে পারি এই ভয়ে আমাকে তড়িঘড়ি করে সুদূর সেনাছাউনিতে পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলেন।
পরের দিন জেনারেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
কেল্লা
বেলোগর্স্কির কেল্লা ওরেনবুর্গ থেকে প্রায় চল্লিশ ভায়োর্স্ট (প্রায় সাড়ে ছাব্বিশ মাইল) দূরে। এই নগরী থেকে ইয়াক নদীর বন্ধুর পাড় ধরে একটা পথ চলে গেছে। নদি এখনো জমতে শুরু করেনি, সেই সীসা-রঙ্গা পানির ঢেউ গুলো দেখে মনে হয় কালো, কূলের জমে থাকা সাদা তুষারের সাথে একাবারে বিপরীত। চোখের সুমুখে বিস্তৃর্ণ কিরগিজ প্রান্তর। অমি ঢুবে আছি ভাবনায়, দিবাস্বপ্নে শুধুই হতাশা আর নৈরাজ্যের টুকরো টুকরো দৃশ্য। সেনানিবাসের জীবন আমাকে কখনোই খুব বেশী টানে না। আমার ভাবী প্রধান কমান্ডার মিরোনোফ কেমন মানুষ হতে পারে তাই ভাবছি। আমার অন্তর চক্ষু মেলে দেখছি একজন কঠোর, রুক্ষ বৃদ্ধকে, কাজ ছাড়া যে আর কিছুই বোঝে না জীবনে, সামান্যতম হেলাফেলার জন্য সে আমাকে গ্রেপ্তার করে জেলে পুরে রাখার ব্যবস্থা নেয়।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে; আমাদের গাড়িটা ছুটছে জোরেই।
“কেল্লা আর কত দূর?“ ড্রাইভারের কাছে জানতে চাইলাম।
“এইতো, এখান দিয়েই দেখা যাচ্ছে।“ ও বললো।
আমি চারিদিক দেখছি, মনে মনে ভাবছি হয়তো চোখে পড়বে একটা সুউচ্চ বুরুজ, প্রাচীর, সামনে গভীর পরিখা। কিছুই না চোখে পড়লো একটা ছোট গ্রাম, ছুঁচালো গোঁজের বেড়া দিয়ে ঘেরা। এক পাশে তিন চারটে খড়ের গাদা, তাও অর্ধ্যেকটার মত তুষারে ঢাকা; ও পাশে একটা ডিকবাজি খেয়ে পড়ে থাকা উইন্ডমিল, লেবু গাছের মোটা খসখসে বাকল দিয়ে তৈরি ডানা, অলস ভাবে ঝুলে পড়ে আছে।
“তা তোমার কেল্লাটা কই?“ অবাক বিস্ময়ে আমি জানতে চাইলাম।
যে গ্রামটায় এইমাত্র গাড়ি ঢুকলো সেইটা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে ড্রাইভার বললো, “এইতো এটাই।“
ঢোকবার মুখে দেখলাম পুরানো একটা লোহার কামান রাখা। আঁকা বাঁকা সরু রাস্তা, কৃষকদের ঘর-বাড়ি গুলো সবই প্রায় খড়ে ছাওয়া ছোট ছোট কুঠীর। ওকে বললাম কমান্ড্যান্টের বাড়ি নিয়ে যেতে। সামান্য একটু পরেই আমাদের –কিবিতকাটা– সরাসরি গিয়ে দাঁড়ালো একটা কাঠের বাড়ির সামনে, বাড়িটা গির্জা কাছাকাছি একটি উচু জমির উপর তৈরি, গির্জাটাও কাঠের।
কেউ এগিয়ে এসে নিতে এলো না। কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে আমিই ঢুকে পড়লাম বাইরের ঘরে। একজন অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ সে ঘরে টেবিলে বসে বসে সবুজ একটা ইউনিফর্মের কনুইয়ে নীল একটা তপ্পি সেলাই করার কাজে ব্যাস্ত। তাকে বললাম আমার আসবার কথাটা ভেতরে জানাতে।
“চলে আসো, চলে আসোরে বাবা,“ সে বললো, “বাড়িতে এখন সব্বাই আছি।“
ঘরের ভেতর ঢুকে গেলাম, পরিস্কার ঘরটা বেশ ঘরোয়া ঢংয়ে গোছানো। এক কোনে তৈজসপত্র সাজানো একটা আলমারী। দেয়ালে টাঙ্গানো একজন অফিসারের পরিচয়পত্র, ফ্রেমে বাঁধানো চকচক করছে। –লৌবচনয়িয়া– এক রকম অল্প দামের রংচঙ্গে ছবি, কোনটায়, ‘কিস্ত্রিন এবং ওচাকভ অধিগ্রহণ‘, কোনটায় ‘কনে বাছাই‘, অন্যটায় ‘বিড়ালের কবর‘। জানালার কাছে কান-মাথা রোমাল দিয়ে ঢেকে, শাল গায়ে জড়িয়ে বসে একজন বয়স্ক মহিলা। সে সুতো গোটাতে ব্যাস্ত, অন্য প্রান্তটা হাত বাড়িয়ে ধরে রেখেছেন অফিসারের ইউনিফর্ম গায়ে, ছোট-খাট, এক চোখ কানা একজন বৃদ্ধ লোক।
“কী চাও, বাবা?“ হাতের কাজ করতে করতেই মহিলা বললেন।
উত্তরে বললাম যে এই কেল্লায় সেনা বাহিনীতে যোগদানের জন্য আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তাই এখানে সেনানায়কের কাছে হাজির হওয়ার জন্য আমি অতি দ্রুত এসে উপস্থিত হয়েছি। এই সব কথা বলে শেষ করে, ছোট-খাট, এক চোখ কানা বৃদ্ধ লোকটাকে সেনানায়ক মনে করে আমি ওনার দিকে ফিরলাম। তবে সেই ভদ্রমহিলা আমার সমস্ত পূর্ব পরিকল্পিত কথাবার্তায় বাঁধ সাধলেন।
“ইভান কুজমিচতো এখন বাড়িতে নেই,“ উনি বললেন। “সে ফাদার গেরাসিমকে দেখতে গেছেন। তাতে কোন অসুবিধা নেই, আমি ওনার স্ত্রী। সেনা নিবাসের তরফ থেকে এখানে সুস্বাগতম, আন্দময় হয়ে উঠুক আমাদের একসাথে পথচলা। বসুন।“
তিনি একজন কাজেরলোক ডেকে বললেন –ওরিয়াডনিক– মানে, কসাক কনস্টবলকে ডেকে নিয়ে আসতে। ছোট-খাটো বৃদ্ধ মানুষটি এক চোখেই মহা আগ্রহ ভরে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
“কয়েকটা কথা জানতে চাইবো, কিছু মনে করবেন নাতো?“ সে বললো, “কোন রেজিমেন্টে যোগ দেবেন বলে ভাবছেন?“
তার আগ্রহ নিবারণ করলাম।
“আর একটা কথা,“ তার কথা শেষ হয়নি, “তা আপনি গার্ড রেজিমেন্ট ছেড়ে আমাদের এই কেল্লায় নেমে আসলেন কেন?“
উত্তরে জানালাম যে কর্তৃপক্ষের আদেশানুক্রমে আমি এখানে এসেছি।
“গার্ড অফিসারের অনুপযুক্ত কোন কাজ করে ফেলেছিলেন বোধ হয়, নাকি?“ সেই নাছোড়বান্দা প্রশ্নকর্তা আবারো একটা প্রশ্ন যোগ করলেন।
“এসব আজে বাজে কথা বাদ দিয়ে আপনি একটু চুপ করে বসবেন?“ এবার কমান্ড্যানেটর স্ত্রী কথাগুলো একচক্ষু-ছোট-খাটো লোকটাকে বললেন। “দেখতেইতো পারছেন বেচারা এতটা দূরের পথ ঠেঙ্গিয়ে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আপনার ঐ প্রশ্নের পর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চাইতেও এখন ওনার অন্য কিছু কাজ আছে। হাতটা ভালো করে ধরে রাখুন। আর এই যে বাবা আপনি,“ আমার দিকে ফিরে কথা চালিয়ে গেলেন, “একেবারেই মন খারাপ করবেন না, কখনোই মনে করবেন না যে একটা গাওঁ গ্রামে আপনাকে আমাদের সাথে ঠুসে দেওয়া হয়েছে, মনে রাখবেন, এখানে আপনিই প্রথম এসেছেন, তা নয়; এবং আপনিই শেষ, আপনার পরে আর কেউ আসবে না তাও নয়। ‘কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে / দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?‘ মনে রাখবেন প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হতে পারে, একটু সহ্য করতে শিখে নিলে, তখন দেখবেন এখানে জীবন কেমন শান্তির। ধরা যাক, স্ভাব্রিন, আলেক্সি ইভানিচ, ওকে চার বছর আগে এখানে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে খুন করার অপরাধে। আল্লাহ জানেন, ওর কপাল এমন মন্দ হলো কি ভাবে। এক দিন হলো কি, ও শহরে ঘুরতে বেরোলো, সাথে এক লেফ্টেন্টেন্ট, দু‘জনেই তলোয়ার হাতে নিয়ে বেরিয়েছে, দু’জন দুষ্টামি করে এ ওকে ও এর সাথে খোচাঁ খুচি করছিল, আলেক্সি ইভানিচ ধুম করে লেফ্টেন্টের বুকে বসিয়ে দিল তার তলোয়ারটা, মেরে ফেললো, সেখানে দু‘চারজন স্বাক্ষীও পাওয়া গেল। হলোতো, কপালের আর দোষটা কি।“
এই সময় ঘরে এসে ঢুকলো একজন সুপুরুষ কসাক যুবক, কনস্টবল।
“ম্যাক্সিমিচ,“ কমান্ড্যানেটের স্ত্রী তাকে বললেন, “ একটা পরিস্কার, পরিচ্ছন্ন একটা কোয়ার্টার দেখে শুনে এই নতুন অফিসারের থাকবার ব্যবস্তা কর দাওতো।“
“এখনি করছি, ভাসিলিসা ইয়গরোভনা,“ উত্তর দিল সেই কসাক কনস্টবলটি, “স্যারের জন্য ইভান পলেজাভের পাশে থাকবার ব্যবস্থা করে দিলে কেমন হয়?“
“ম্যাক্সিমিচ, তুমি কি আস্ত একটা বোকা,“ ঝট করে বললেন কমান্ড্যানেটের স্ত্রী, “পলেজাভের ওখানে জায়গা এমনিতেই কম; ওর ওখানেই আমরা গালগপ্পো করি, তারপরও কিন্তু ও একবারের জন্যেও ভোলে না যে আমরা ওর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ভদ্রলোককে তুমি–,তা বাবা আপনার নামটা যেন কী?“
“পিতর আন্দ্রিজিচ।
“পিতর আন্দ্রিজিচকে তুমি নিয়ে যাও সিমিয়ন কাউজোফের ওখানে। আমার তরকারি-বাগানে ওর ঘোড়া ঢুকে পড়েছিল, বদমাইশটা আটকায়নি। কি সব কিছু ঠিক ঠাক চলছেতো, ম্যাক্সিমিচ?
“ আল্লাহর রহমতে সব ঠিক ঠাকই চলছে,“ কসাক সৈনিকটি উত্তর দিল, “শুধু ঐ জুনিয়র কমান্ডার প্রোকোরোফ গোসলের ঘরে ওউসটিনিয়া পিগোউলিনা নামের এক মহিলার সাথে এক বালতি গরম-পানি নিয়ে গন্ডোগোল বাঁধিয়ে দিয়েছিল।“
“ইভান ইগনাতিচ,“ একচক্ষু ছোট-খাটো লোকটাকে কমান্ড্যানেটের স্ত্রী বললেন, “আপনি অবশ্যই প্রোকোরোফ আর ওউসটিনিয়ার এই ঝামেলার বিচার করবেন, তবে শাস্তী দেবেন দু‘জনকেই; আর এই যে তুমি, ম্যাক্সিমিচ, আল্লাহর ওয়াস্তে এবার যাও! আন্দ্রিজিচ আপনি যান ম্যাক্সিমিচ আপনাকে আপনার কোয়ার্টারে নিয়ে যাবে।“
আমি বিদায় নিলাম। সেই কসাক সার্জেন্ট আমাকে নিয়ে এলো কেল্লার সুদূরতম প্রান্তরে নদীর খাঁড়াই পাড়ের ওপর একটা কাঠের বাড়িতে। বাড়িটার অর্ধ্যেকটায় বসবাস করছে সিমিয়ন কাউজোফের পরিবার, বাকি অর্ধ্যেকটা এখন দেওয়া হলো আমাকে। মাঝ বরাবর পার্টিশন দিয়ে দু ভাগ করা, আমার ভাগের অংশটা বেশ পরিচ্ছন্নই।
সাভেলিচ ইতিমধ্য ব্যাগ-বোঁচকা খোলাখুলি শুরু করে দিয়েছে, আর আমি এক চিলতে জানালাটা দিয়ে বাইরেটা দেখছি। চোখের সামেনে বিস্তর ধূ ধূ উন্মুক্ত প্রান্তর; তার এক পাশে ক‘টা ছোট ছোট ঘর বাড়ি। কিছু হাস মুরগী রাস্তায় চরে বেড়াচ্ছে। দেখছি একটা বৃদ্ধা মহিলা হাতে একটা ভান্ড নিয়ে একটা বাড়ির দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কয়েকটা শুকরছানাকে কাছে ডাকছে, শুয়োর গুলোও বেশ মানব বান্ধব ঘোৎ ঘোতানি শব্দ তুলে প্রতিউত্তর করছে।
আর এই হলো সেই দেশ যেখানে আমার যৌবনভর বনবাসে কাটাবার জন্য পাঠানো হয়েছে।
বিস্বাদময় তিক্ত অনুভূতি নিয়ে জানালা কাছ থেকে সরে এসে, সাভেলিচের শত আপত্তি সত্ত্বেও বিছানায় পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম অভুক্ত। সে একনাগাড়ে আত্ম কন্ঠে বলেই চলেছে:
“ও কপাল! খোকাবাবু কোন কিছু না খেয়ে শুয়ে পড়লো। ছেলে না খেয়ে খেয়ে অসুখে পড়লে তখন আমার বিবি-সাহেব আমাকে বলবেটা কী?“
পরের দিন আমার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সবেমাত্র পোশাক গায়ে দিয়েছি, কপাট খুলে ঘরে ঢুকলো একজন যুবক অফিসার। খর্বাকৃতি, অদ্ভূতুড়ে দৈহিক বৈশিষ্ট সত্ত্বেও তার তামাটে চেহারায় চোখে পড়ার মতোই প্রফুল্লতার অভিব্যক্তি লেগে আছে।
“কিছু মনে করবেন না,“ ফরাসি ভাষায় সে বললো, “কোন রকম কোন ভদ্রতার তোয়াক্কা না করেই এমন হুট করে চলে আসলাম আপনার সাথে পরিচয়টা সেরে ফেলার জন্য। কালকেই শুনেছি আপনি এসেছেন, আর তিষ্টতে পারলাম না, শুনেই মনে হলো গিয়ে দেখে আসি সেই মানব সন্তানকে যে অবশেষে এসে পড়েছে আমারই অবস্থানে। কিছু দিন এখানে থাকলেই আমার কথার অর্থ হাড়ে হাড়ে ঠের পাবেন!“
অতি সহজে আঁচ করে ফেললাম ডুয়েল-দ্বন্দের অপরাধে এই অফিসারটিকেই গার্ড রেজিমেন্ট থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
আমরা পরিচিত হয়ে উঠলাম। স্ভাব্রিন বেশ রসিক মানুষ, কথাবার্তায় তুখোড়, এবং বলার ঢংও আকর্ষনীয়। বেশ উদীপ্ত এবং আড্ডার মেজাজে ও আমার কাছে কমান্ড্যান্টের পরিবার, কেল্লার সমাজ মানে ছোট করে বলতে গেলে, ভাগ্য আমায় যেখানে এনে ফেলেছে সেই গোটা দুনিয়াটার গপ্প শোনাতে লাগলো।
আমিও বেশ মনপ্রান খুলে হাসছি, এমন সময়ে দেখি যে লেকটাকে কমান্ড্যান্টের বাইরের ঘরে বসে বসে ওর ইউনিফর্মে তালি মারছিল সে এসে ঢুকে পড়ে জানালো ভাসিলিসা ইয়গরোভনা খাবারের জন্য আমাকে নিমন্ত্রন্ন জানিয়েছেন।
স্ভাব্রিন বলে উঠলো সেও আমার সাথে যাবে।
কমান্ড্যান্টের বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখি বাড়িতে ঢোকবার মুখের সামনের মোড়ে প্রায় জনা বিশেক সবে বৃদ্ধ হওয়া অবসরপ্রাপ্ত লোকজন, তাদের মাথায় লম্বা বিনুনি, তার উপর তেকোণা টুপি। তাদেরকে সারি সারি করে দাঁড় করানো। সামনে দাঁড়িয়ে কমান্ড্যান্ট, বেশ লম্বা বয়স্ক মানুষ, স্বাস্থ্যবান, পরনে ড্রেসিং-গাউন আর মাথায় তুলোর রাতটুপি।
আমাদের আসতে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই উনি এগিয়ে আসলেন, আমার সাথে দু‘চারটে কথা বলে ফিরে গেলেন কুচকাওয়াজে। আমরা ওখানে দাঁড়িয়ে পড়ে একটু মহড়া দেখতে চাইছিলাম, তবে উনি আমাদেরকে অনুরোধ করে বললেন এখুনি ভাসিলিসা ইয়গরোভনা কাছে যেতে, কথা দিলেন সেও পেছন পেছন আসছেন। “এখানে,“ উনি বললেন “আসলেই তেমন দেখবার মতো কিছু নেই।“
ভাসিলিসা ইয়গরোভনা বেশ সরল -সহৃদয় ভঙ্গিতে আমাদেরকে আমন্ত্রন জানালেন, আমার সাথে ওনার ব্যবহার দেখে মনে হয় না জানি আমার সাথে কত দিনের পরিচয়। ইউনিফর্মে তালি মারা সেই লোকটা আর পলাশকা দু‘জনে মিলে টেবিলে কাপড় বিছিয়ে দিল।
“আমার ইভান কাউজমিচ আবার আজ কার পাল্লায় পড়ে এত লম্বা সময় ধরে ওর বাহিনীকে কুজকাওয়াজ করাচ্ছে?“ কমান্ড্যান্ট পত্নীর মন্তব্য। “পলাশকা, যাতো ওকে ধরে নিয়ে আয় খাওয়ার টেবিলে। আর মাশার আবার হলো কী?“
মুখের কথা তখনো মুখে লেগে, বছর ষোল বয়সের একটা মেয়ে ঘরে এসে ঢুকলো। পরিস্কার, গোল গাল মুখ, মাথার চুলগুলো পরিপাটি ভাবে কানের পেছনে আচড়ে আটকে রাখা, বিনয় আর লজ্জ্বার বশে সে কান দুটো লাল হয়ে আছে। প্রথম দেখায় তাকে আমার মটেই আকর্ষণীয় মনে হলো না, ওর সম্পর্কে আমার আগেই একটা ধারণা তৈরি হয়ে ছিল, এখন তাকালাম তা মিলিয়ে দেখতে। সেনাপ্রধানের মেয়ে, মারিয়া সম্পর্কে সভাব্রিন আগেই বিস্তারিত অনেক কিছু বলেছে, শুনে মনে হয়েছে মেয়েটা নিরেট একটা হাবা। সে এসে বসে পড়লো এক কোণে, বসে হাতে তুলে নিলো সেলাইয়ের কাজ। এবার সূপ বেড়ে দেওয়া হলো। ভাসিলিসা ইয়গরোভনা, ওনার স্বামী তখনো ফিরে আসেন নি দেখে পলাশকাকে দ্বিতীয় বার আবার পাঠালো তাকে ডেকে নিয়ে আসতে।
“কর্তাকে গিয়ে বলো অতিথীরা সব বসে আছে, সূপ ঠান্ডা হয়ে যোচ্ছে। খোদার দোহাই, কুচকাওয়াজতো আর কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে না। পরে গিয়ে যতো ইচ্ছে লেফ্ট-রাইট করে গলা ফাঁটাক, অনেক সময় পড়ে আছে।
এবার কমান্ড্যান্ট তাড়া হুড়া করে চলে আসলেন, সাথে সেই এক চক্ষু ছোট-খাট লোকটা।
“কিরে বাবা, এ সব কী? ওনার স্ত্রী বললেন ওনাকে। “খাওয়া দাওয়া সব জুড়িয়ে যাচ্ছে আর তেমার এ দিকে আসবার কোন নাম নেই।“
“তুমি দেখছো না, ভাসিলিসা ইয়গরোভনা,“ ইভান কাউজমিচ জবাব দিলেন, “আমার বাচ্চা সৈনিকদের কুচকাওয়াজ নিয়ে আজ আমি মহা ব্যাস্ত।“
“মহা বোকা,“ তার স্ত্রীর উত্তর, “শুধু হামবড়াই, ওরা সব অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক, আর তুমিওতো ঐ বিষয়টা তেমন ভালো করে জানো না। তার চেয়ে বরং ঘরে বসে বসে রোজা-নামাজ করলেই পারো; সেটাই তোমার জন্য ভালো। এই যে বাবারা, বস বস, তোমরা বসে পড়ো।

[চলবে]