অ্যালকেমিস্ট

লেখক: পাওলো কোয়েলহো

ইংরাজী অনুবাদ: এ্যালান আর ক্ল্যার্কের

ছেলেটার নাম সান্তিয়াগো।

সবে সন্ধ্যা নামছে, ও এক পাল পোষা পশু নিয়ে এসে ঢুকলো পরিত্যাক্ত এই গির্জাটার মধ্যে। ছাদ পড়ে গেছে বহু কাল আগে; ঢাইস একটা ডুমুর জাতিয় গাছ গজিয়ে উঠেছে যে জায়গাটায়, সেখানে এককালে ছিল ধর্ম-যাজকদের কামরা, যাজকেরা প্রার্থনার জন্য প্রস্তুত হতেন –রাখা থাকতো তাঁদের পোশাক-আশাক আর উপাসনার বিভিন্ন সরঞ্জামাদি।

ঠিক করে ফেললো রাতটা কাটাবে এখানেই। দেখলো ওর সবকটা ভেড়া ঢুকে পড়েছে ভাঙ্গাচোরা সদর দরজা টপকে, এবার  ক‘টা তক্তা দিয়ে বন্ধ করে দিল সেই পথ যেন রাতে কোনো ভেড়া বাইরে বেরোতে না পারে। অত্র অঞ্চলে  নেকড়ের নাম-গন্ধ নেই ঠিকই তবে রাতে-বিরাতে কোন মতে একটা পশু একবার বেরিয়ে পড়ে দলছুট হয়ে গেলে ব্যাস, সকালে উঠে ওটা খুঁজে বের করতে কেটে যাবে সারাটা দিন।

গায়ের জ্যাকেট খুলে মেঝে একটু ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে শুয়ে পড়লো সান্তিয়াগো; বালিশের মতো মাথায় দিয়ে নিলো একটা বই, এইমাত্র পড়ে শেষ করেছে ওটা ।  মনে মনে ভাবলো এবার থেকে আরো মোটা একটা বই পড়া শুরু করতে হবে: পড়াও যাবে অনেক দিন আবার রাতে বেশ যুৎসই বালিশের মতো মাথায় দিয়ে আরামে ঘুমানো যাবে।

ঘুম ভাঙ্গলো তখনোও রাত কাটে নিই, তাকালো উপরের দিকে, আধ-ভাঙ্গা ছাদের ফাঁকে আকাশের তারাগুলো দেখা যাচ্ছে।

চিন্তা করে, আর একটু ঘুমিয়ে নিলে ভালো হতো। সপ্তাহ খানেক আগে দেখা সেই স্বপ্নটা  আজ আবারো দেখলো, আবারো স্বপ্নটা শেষ হবার আগেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো।

উঠে পড়ে, পশু-চরানো ছড়িটা তুলে নেয় হাতে, যে ভেড়া গুলো এখনো ঘুমাচ্ছে সেগুলোকে জাগায়। ও লক্ষ্য করেছে, ও জেগে ওঠবার সাথে সাথেই ওর বেশীর ভাগ পশুই নড়ে চড়ে ওঠে। ব্যাপারটা এমন যেন কোনো এক নিগূঢ় শক্তি ওর জীবনের সাথে ওদের জীবনটা আস্টে পিস্টে বেঁধে ফেলেছে, এক সাথে কেটে গেল দুটো বছর, খাদ্য আর পানির সন্ধানে ওদেরকে নিয়ে চরিয়ে বেড়াচ্ছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তর। “ওরা তাই আমার এতো কাছের হয়ে উঠেছে যে আমি কখন কি করি তা ওরা সব জানে,“ মনে মনে বলে। কথাটা চট করে ভেবে নিয়ে ছেলেটা বুঝতে পারে যে ব্যাপারটা ঘুরিয়ে ধরলে আর এক রকম হতে পারে: ছেলেটাই আসলে ওদের সাথে তাল মেলাতে মেলাতে –ওরা কখন কি করে না-করে, মানে ওদের সময়-সূচি মতো চলতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে।

তবে এদের মধ্যে কয়েকটা আবার একটু গড়ি মসি করে একটু সময় নিয়ে ওঠে। ছেলেটা তাদের হাতের ছড়িটা দিয়ে খোঁচায়, প্রত্যেককে নাম ধরে ডাকে। ওর দৃঢ়মূল বিশ্বাস যে ভেড়াগুলো ওর কথা বোঝে। তাই কখনো সখনো বইয়ের কিছু কিছু অংশ ওদেরকে পড়ে পড়ে শোনায় ও, তাতে একরকমের প্রভাব পড়ে ছেলেটার উপর, কখনো বা ওদেরকে শোনায় মাঠে মাঠে চরে বেড়ানো রাখালের একাকিত্বের কথা আর নয়তো শোনায় তাদের সুখের কোনো ঘটনা। মাঝে মধ্যে ওদেরকে শোনায় পেরিয়ে চলা গ্রামের কোন কোন চোখে পড়া জিনিসের  ওপর ওর নিজস্ব মতামত।

তবে গত কয়েক দিন যাবৎ ও ওদের সাথে কেবলই একটা বিষয়ই কথা বলে চলেছে: একটা মেয়ে, এক ব্যাপারীর মেয়ে, যে গ্রামে ঔ মেয়েরা থাকে সেখানে ওরা পৌছে যাবে আর গোটা চারেক দিন পর। এর আগে আর মাত্র একবার ও সে গ্রামে গিয়েছিল। সেই ব্যাপারী এক শুকনো মালামালের দোকানের মালিক; তার কথা ভেড়ার লোম কামাতে হবে তার চোখের সামনে, তা নইলে অনেকে অনেক রকমের চিটিং-বাটপারী করে সবাই। এক বন্ধু ওকে এই দোকানের খোঁজ দিয়েছিল, ও সেখানে ভেড়াগুলো নিয়ে এসেছিল।

“কিছু উল বিক্রি করতে চাই,“ ছেলেটা বললো ব্যাপারীকে

দোকান তখন রমরমা ব্যাস্ত, ব্যাপারী রাখাল ছেলেটাকে বললা দুপুর পর্যন্ত বসতে হবে। ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে নিয়ে পড়তে বসে পড়লো দোকানটারই সিঁড়ির এক ধাপে।

“জানতামনা রাখালরাও বই পড়তে জানে,“ ওর পেছনে এক নারী কন্ঠ।

আন্দালুশিয়া অঞ্চলের আরো দশটা সাধারন মেয়ের মতই একটা মেয়ে, মাথায় এক রাশ কালো চুল, চোখ জোড়া অবচেতন মনে মূর যোদ্ধাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

“ওহ্ তা বেশ, এমনিতে আমি এই সব বই-পত্রের চাইতে আমার ভেড়াগুলোর কাছ-থেকেই বেশী কিছু শিখতে পাই,“ ছেলেটা বললো। এরপর ওদের ঘন্টা দুয়েক আলাপে, মেয়েটা ওকে বলেছে যে সে এই ব্যাপারীর মেয়ে, আর বলেছে এই গ্রামের জীবনের কথা, এখানের প্রতিটা দিনই অন্য সব দিনে মতই। রাখাল ছেলেটা তাকে আন্দালুশিয়া অঞ্চলের অন্যান্য ড়ায়গার গল্প বলে শোনালো, আর শোনালো অন্যান্য যে সব শহরে সে থেমেছে সে সব শহরের সংশ্লিষ্ট খবরা খবর। নিজের ভেড়াগুলো সাথে বক বক করবার চাইতে এ বেশ এক মনোমুগ্ধকর পরিবর্তন।

“তুমি পড়তে শিখলে কি ভাবে?“ এক সময় মেয়েটা প্রশ্ন করে।

“অন্যান্য সবাই যে ভাবে শেখে,“ ছেলেটা বললো। “স্কুলে।“

“বেশ, তা তুমি যদি লেখা পড়াই জানো, তো এই সামান্য রাখালের কাজ করো কেন?“

উত্তরে ছেলেটা কীসব বিড়বিড় করে বললো ফলতঃ মেয়েটার সে প্রশ্নের আর কোন জবাবই দিতে হলো না। ও বরং ওর ভ্রমনের কাহিনিই বলে শুনিয়ে চললো, আর মেয়েটার সেই চক চকে উজ্জ্বল মুর চোখ জোড়া ক্রমে ভয়ে আর বিস্ময়ে বড় থেকে আরো বড় হয়ে উঠলো। এভাবে ‘সময় কাটিয়া যায়, নদীর শ্রোত প্রায়‘ ছেলেটার একসময় মনে মনে কামনা করতে থাকে ‘এমনি করে যায় যদি দিন যাক না’‘মেয়েটার বাপ যেন আরো আরো ভীষণ ব্যাস্ত হয়ে পড়ে, এভাবেই যেন ওকে তিন দিন বসিয়ে রাখে। ছেলেটা টের পায় এ যেন একেবারে নতুন এক অনুভূতি, এর আগে কখনো আর এমন হয়নি: এক জায়গাতেই সারা জীবন আটকে থাকার বাসনা। কাক-কালো-চুল-এর মেয়ের সাথে সেই দিন, কেমন যেন বদলে গেলো সব কিছু।

অবশেষে ব্যাপারী ‘উদিত হলেন,‘ ছেলেটাকে বললো চারটে ভেড়া কামিয়ে দিতে। উলের প্রাপ্য মূল্য বুঝিয়ে দিয়ে বলে দিলো আগামী বছর আবার ফিরে আসতে।

এখন আর মাত্র চাঁর দিন বাকি, সেই ছোট্ট গ্রামটাতে সে আবারো ফিরে যাবে। প্রচন্ড উত্তেজনা সে‘ সাথে চরম অস্থিরতা: ইতিমধ্য মেয়েটা হয়তো ওকে ভুলেই গেছে। কত রাখাল ছেলেইতো এ পথ বেয়ে চলে গেছে, উল বিক্রি করেছে সেখানে।

“তাতে কিছুই যায় আসে না,“ ওর ভেড়াদের কাছে বলে কথাটা। “আরে, আরো কতখানে কত মেয়ে আমি চিনি।“

কিন্তু ওর হৃদয়ের গহিন গোপনে ও জানে যে তাতে অনেক কিছুই যায় আসে। ও জানে পশুপালক বা রাখালেরা স্বভাব চরিত্রে নাবিক বা ভ্রাম্যমান সেল্স্যানদের মতোই,  ওরা আজীবন খুঁজে পেতে ফেরে সেই দেশটা যেখানে আছে এমন একজন মানুষ যে  উদাসিন ভ্রমনের আনন্দকে ভুলিয়ে দিয়ে আঁটকে ধরে রাখতে পারে।

ভোর সকাল, রাখাল ওর পশু-পাল তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে সূর্য্যের দিশায়। পশুদের কখনোই নিজেদের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয় না, ও ভাবে। হয়তো সে জন্যই ওরা সব আমার কাছে কাছে থাকে সারাক্ষণ।

ভেড়াগুলোর একমাত্র চিন্তা খাদ্য আর পানি। ছেলেটা যতদিন  আন্দালুশিয়ায় ভালো ভালো চারণভূমি খুঁজে খুঁজে বের করে দিতে পারবে, ওরা ততদিনই ওর বন্ধু। হ্যা, আপাতদৃষ্টিতে দিনের পর দিন সকাল-সন্ধ্যা অবিরাম ঘন্টার পর ঘন্টা একই রকম চলছে, থোড়-বড়ি-খাড়া খাড়া-বড়ি-থোড়; অল্প-বয়সে ওরা কোনো বই-পত্র পড়েনি, তাই ছেলেটা যখন ভ্রাম্যমান শহর-নগরের বর্ণনা করে তখন ওরা কিছুই বোঝে না। ওরা কেবল খাদ্য আর পানি পেলেই সন্টুষ্ট, আর তার বদলে, ওরা উদার হস্তে দিয়ে চলেছে ওদের উল, সাথে সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর –হয়তো কখনো-সখনো দেয় –ওদের মাংস।

ছেলেটা ভাবে, আজ যদি আমি দানব হয়ে উঠি, আর যদি ভেবে বসি, একে একে ওদের খতম করে যাবো, তাহলে কেবল পালের অধিকাংশ ভেড়া মেরে ফেলবার পরই ওরা সচেতন হয়ে উঠতে পারবে। ওরা বিশ্বাস করে আমাকে, ভুলেই গেছে কিভাবে নিজের ওপর নিজে নির্ভর করে চলতে হয়, কারন আমিই ওদের পরিপালন করি, পরিপোষণ করাই।

এসব কথা চিন্তা করতে করতে ছেলেটা বিস্ময়-অভিভূত হয়ে পড়ে। এমন সব  চিন্তা-ভাবনা হয়তো এই গির্জা আর তাতে গজিয়া ওঠা বিশালাকার ডুমুর জাতিয় গাছটার প্রচ্ছন্ন প্রভাব।  তার কারনেই ও সেই এক-ই স্বপ্ন আবার দ্বিতীয়বার দেখলো এখানে, হয়তো সেই প্রভাবের ফলেই ওর অতি বিশ্বাসী চির সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে এমন ক্রুর চিন্তা ওর মনে এসেছে। গত-রাতের খাবারে উদ্বৃত্ত থেকে যাওয়া মদ খেলো কয়েক ঢোক, তারপর জ্যাকেটটা তুলে নিয়ে জড়িয়ে ধরে। ও বেশ ভালো করেই জানে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরই, সূর্য যখন চরম শীখরে উঠে বসবে, দিনের তাপমাত্রা তখন এমন বেড়ে উঠবে যে ওর পক্ষে আর এই পশু-পাল তাড়িয়ে নিয়ে পথ চলা সম্ভব হবে না। গ্রীষ্মের দিনে এই সময়টুকু গোটা স্পেন ঘুমিয়ে কাটায়। সেই উত্তাপ টিকে থাকে সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত, এই সারাটা সময় ওকে ওর জ্যাকেটটা বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে। তবে এই বাড়তি বোঝা বয়ে নিয়ে বেড়ানোটা বিরক্তিকর মনে হলেই ও চিন্তা করে, এই জ্যাকেটটা আছে বলেই সকালের এই শীতটা ও প্রতিহত করতে পারছে।

ভেবে নিলো, এবার প্রস্তুতি নিতে হবে, জ্যাকেটটার ওজন আর উষ্ণতার জন্য ও মনে মনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিলো। জ্যাকেট হিসাসে তারও যেমন একটা উদ্দেশ্য আছে, ছেলেটারও তেমন আছে। তার জীবনের উদ্দেশ্য ভ্রমন, আর, এই আন্দালুশিয়া ভূখন্ডে এই দু‘বছর হেঁটে হেঁটে এই অঞ্চলের সব গুলো শহর ও চিনে ফেলেছে। ও মাথায় মাখায় ভেবে নেয়, এবার দেখা হলে, মেয়েটাকে ও সবিস্তরে বুঝিয়ে বলবে যে কী ভাবে একটা অতি সামান্য পশু-পালক পড়া লিখলো।  আসলে ও ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত একটা সেমিনারীতে (যেখানে ধর্ম-যাজক বা ইহুদি আইনজ্ঞ হয়ে ওঠার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, মুসলমানদের মাদ্রাসার মতো) গিয়েছে। ওর মা-বাবা চাইতেন সে একজন যাজক হিসাবে গড়ে উঠুক, সাদা-মাটা একটা চাষী পরিবারের জন্য সেটাই বেশ  গর্বের বিষয়। নিছক খাদ্য আর পানির জন্য ওরা প্রাণান্ত পরিশ্রম করে, এই সব ভেড়ার মতো। সে ল্যাটিন, স্প্যানিশ আর ধর্মতত্ত্ব পড়েছে। তবে ছেলে-বেলা থেকেই পৃথিবী বিষয়ে জ্ঞাণ আহোরনেই ওর আগ্রহ বেশী, ফলে ঈশ্বার কিংবা মানুষের পাপ-পূণ্যের জ্ঞানের চাইতে পৃথীবি সম্পর্ক্যে জ্ঞাণ আহোরণই ও বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এক দিন বিকালে পরিবার-পরিজনের সাথে দেখা করতে এসে, ও বুকে সাহস জুগিয়ে ওর বাবাকে বলেই ফেললো যে ও যাজক হতে চায় না। ওঘুরে বেড়াতে চায়।

“পৃথিবীর কোনা কোনা থেকে কত মানুষ এলো- গেলো আমাদের এই মাটির উপর থেকেরে, বাবা।“ ওর বাবা বলেছে। “ ওরা সবাই আসে নতুন জিনিস খোঁজ করার ধান্দায়, তবে ফিরে যাবার সময় মুলতঃ যা নিয়ে এসেছে সঙ্গে, সঙ্গে নিয়ে ফিরে যায় তাই। পাহাড় পর্বত ডিঙ্গিয়ে যায় কেল্লা দেখতে, মনে করে যে দিন গেছে সেদিন গুলো আজকের চেয়ে ভালো, অবশেষে সেই চিন্তার লেজ গুটিয়ে চলে যায়। সে সব স্বর্ণকেশী, কালো চামড়ার মানুষ, আসলে ভিন্ন কিছু নয়, এখানকার মানুষের মতোই মানুষ।“

ছেলেটা বুঝিয়ে বলে,“কিন্তু আমিতো দেখতে চাই ওরা যেখানে বসবাস করে সেই শহরের মাটিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে কেল্লা, সেই সব।!“

ওর বাবা কথা খেই ধরে বলে, “ওরা, আমাদের এই দেশটা দেখে দেখে বলে, সারা জীবন  এখানেই থেকে যেতে চায়।“

“বেশতো, আমি ওদের দেশটা দেখে নিতে চাই, দেখে নিতে চাই ওদের জীবন যাপন,“ ছেলেটা বলে ওঠে।

“এখানে যারা আসে তাদের হাতে খরচ করবার মত অনেক টাকা পয়সা থাকে, তাই তারা ঘুরে ফিরে বেড়িয়ে বেড়াতে পারে,“ ওর বাবা বললেন। “আর আমাদের মধ্যে শুধু পশু-পালক রাখালরাই ঘুরে বেড়াবার সুযোগ পায়।“

“বেশতো, আমি তাহল পশু-পালক রাখালই হবো!“

ওর বাবা আর কিছুই বলে নিই। পরের দিন, ছেলের হাতে একটা ছোট্ট টাকার-থলী তুলে দেয় ওর বাবা, তাতে তিনটে প্রাচীন স্প্যানিশ স্বর্ণ-মুদ্রা।

“এক দিন এ গুলো সব আমি খুঁজে পেয়েছি মাঠে। মনে করেছিলাম ছেলে-পুলে নাতী-নাতনীর জন্য এগুলো রেখে যাবো। নে এ গুলো নিয়ে তোর জন্য এক পাল ভেড়া কেন। মাঠে ময়দানে ও গুলো চরিয়ে নিয়ে বেড়া, তারপর এক দিন বুঝতে পারবি এই মাটিই সবার সেরা, আর আমাদের মেয়েরাই শ্রেষ্ঠ সুন্দরী।“

ব্যাস, ছেলেকে সে দোয়া করে দিলো। ছেলেটা বাপের চোখের দৃষ্টিতে খুঁজে পায় একটা ধামাচাপা পড়া স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে পারার চক চকে আনন্দ, নিজের জন্য দেখা স্বপ্ন, বিশ্বময় ঘুরে বাড়াবার স্বপ্ন —স্বপ্নটা যেন আজো কোথাও বেঁচে বর্তে আছে, মনের কোন সংগোপনে তা দাফন দিয়ে রেখেছেন ওর বাবা, একটু নিস্তিত শোবার জায়গা, খাবার খাদ্য, আর পানের পানি জোগাড়ের সংগ্রামে সংগ্রামে কেটে গেল যুগ যুগান্তর।

রাঙ্গা আলোর ছোপে লালাভো হয়ে পড়েছে আকাশ, কখন যেন জেগে উঠেছে সূর্য। ছেলেটার মনে ভেসে ওঠে বাবার সাথে তার সেই সব কথপোকথন, মনে মনে সুখী হয়ে ওঠে; ইতোমধ্য সে অনেক দুর্গ দেখেফেলেছে মিশেছে অনেক নারীর সাথে (তার মতো কেউ নয় যার সাথে আর ক‘দিন পর দেখা হবে তার)। ও একটা জ্যাকেটের মালিক, একটা বইয়ের মালিক সেটা বিক্রি করে অন্যটাও নিতে পারে আর আছে এক পাল ভেড়া। সব চাইতে বড় কথা ওর স্বপ্নের মধ্যে বেঁচে থেকে কাটাতে পারে ও প্রতিটা দিন। আন্দালুশিয়ার মাঠ ঘাট চরে চরে ও ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে উঠলে, ও ভেড়া গুলো বেচে দিয়ে সমুদ্রে চলে যেতে পারে ইচ্ছে মতো। এক সময় সমুদ্র দেখে দেখে মন ভরে উঠলে, ওর আরো অনেক শহর চেনা, নগর চেনা, নারী চেনা, তাছাড়াও সুখী হওয়ার আরো অন্য অনেক পথ ওর এখন চেনা। সেমিনারীতে বসে থেকে আমি ঈশ্বরকে খুঁজে পিইনি, সূর্যোদয় দেখতে দেখতে ও এসব ভাবে।

সুযোগ পেলেই ও ঘুরে বেড়াবার জন্য খুঁজে পেতে নতুন নতুন সব পথ বের করে নেয়। এর আগেও ও অনেকবারই এই অঞ্চলের উপর দিয়ে যাতায়াত করেছে তবে আগে আর কখনো এই ভাঙ্গা-চোরা গির্জাটায় আসে নিই। পৃথিবীটা  আসলেই সুবিশাল অক্ষয় অনন্ত; ব্যাস সামান্য কিছুক্ষণ একবার শুধু ভেড়াগুলোর হাতে ছেড়ে দিতে হবে পথ বেছে নেওয়ার দায়িত্ব  তাতেই ছেলেটা আরো মজাদার কিছু কিছু জিনিষ দেখে নিতে পারবে। আসল সমস্যা, ওরাতো বুঝতেও পারে না যে কখন চলেছে একেবারে নতুন একটা পথ ধরে। ওরা দেখেই না এ মাঠ নতুন না পুরানো, বোঝেনা ঋতুর অদল-বদল।

ছেলেটা আনমনে ভাবে, আদতে আমরা সবাই হয়তো ওই রকমই। আমিও — ব্যাপারীর মেয়েটার সাথে দেখা হবার পর থেকে আমিওতো অন্য কোনো মেয়ের কথা চিন্তাও করি না। সূর্যের দিকে চেয়ে ও অনুমান করে নিলো দুপুরের আগেই ওরা ‘তারিফ‘-এ পৌছে যেতে পারবে। ওখানে ও ওর বইটা বদলে একটা মোটা বই নিতে পারবে, মদের বোতলটা ভরে নিতে পারবে, দাড়ি কামাতে হবে, চুল কাটাতে হবে; মেয়েটর সাথে দেখা করবার জন্য নিজেকে একটুগুছিয়ে নিতে হবে, ওতো মোটেই চিন্তা করতে রাজিই না যে অন্য কোনো রাখাল সেখানে আসতেও পারে, হয়তো তার কাছে প্রচুর ভেড়া, ওর আগেই সেই রাখালটা ওখানে পৌছে মেয়েটার পাণি প্রার্থনা করে বসে আছে।

স্বপ্ন সত্য হওয়ার সম্ভাবনায় জীবনটা মধুর হয়ে উঠে, ভাবেতে ভাবতে আবারো একবার সূর্যের অবস্থান দেখে নেয়, চলবার গতি বাড়ায়। হঠাৎ করে ওর মনে পড়ে, তারিফে এক বৃদ্ধ মহিলা আছে, সে স্বপ্নের বিশ্লেষণ করে বলে দেয়।

বৃদ্ধ মহিলা ছেলেটাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলো তার বাড়ির পেছনের একটা কামরায়; ঘরটা আসলে ওদের বসবার ঘরের একটা অংশ রঙ্গিন পুথীর তৈরি পর্দা দিয়ে পৃথক করা। কামরাটায় আসবাব বলতে মোটে একটা টেবিল, যীশু খ্রীষ্টের পবিত্র হৃদয়ের একটা ছবি আর দুটো চেয়ার।

মহিলা বসে পড়ে ওকেও বসতে বলে। তারপর নিজের হাতে ছেলেটার দুটো হাত তুলে নিয়ে নিশ্চুপে প্রার্থনা শুরু করে।

শুনে মনে হয় যাযাবরদের প্রার্থনা। এর মধ্যেই পথে যাযাবরদের ব্যাপারে ছেলেটার বেশ অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে; তারাও দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়, তবে ভেড়ার-পাল চরায় না। মানুষ বলে  যাযাবরেরা মানুষ ঠকিয়ে জীবন চালায়। আরো শোনা যায় ওদের সাথে নাকি অপদেবতা বা শয়তানদের একরকমের সখ্যতা আছে,ওরা বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায় সেই অনেক দূরে ওদের কোনো রহস্যময় গোপন আস্তানায়, ওদেরকে নিজেরে দাস-দাসী বানিয়ে রাখে। শিশুকালে ও সাংঘাতিক ভয় পেতো ‘যাযাবরেরা ধরে নিয়ে যাবে‘ ভেবে, এখন বৃদ্ধা ওর হাত ধরবার পর শিশুকালের সেই ভয়টা মনের মধ্যে চাগাড় দিয়ে ওঠে।

ও চিন্তা করে দেখে, বৃদ্ধার কাছে এখানে যীশু খ্রীষ্টের পবিত্র হৃদয় আছে,  নিজেকে আশ্বস্ত করবার চেষ্টা। ও চায় না ওর হাত দুটো কেঁপে উঠুক, বৃদ্ধার চোখে পড়লে ভাববে ও ভয় পাচ্ছে। মনে মনে নিরবে ‘আওয়ার ফাদার‘ প্রার্থনা আওড়াতে থাকে।

ছেলেটার হাতের ওপর নিষ্পলক দৃষ্টি ফেলে রেখে মহিলা বলে ওঠে “বেশ চমৎকারতো।“ আবার সব নিরব।

ধীরে ধীরে নার্ভাস হয়ে হয়ে পড়ছে ছেলেটা। ক্রমে ওর হাত কাঁপতে থাকে, মহিলা তা‘ ঠের পায়। ছেলেটা নিজের হাত দুটো টেনে সরিয়ে নেয়।

“আমিতো এখানে আপনার কাছে হাত দেখাতে আসি নিই।“ ও বলে ওঠে, আফসোস করতে শুরু করে। এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করে নেয় সেই ভালো বরং ওর পাওনাটা মিটিয়ে দিয়ে চলে যাইএখান থেকে, দরকার নেই কোনো কিছু জানবার, মনে হলো ও বার বার দেখা ঐ স্বপ্নটার উপর বেশী গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছে।

“তুমিতো এখানে এসেছো তোমার স্বপ্নের গোমর জানতে,“ বৃদ্ধা বললো। “ স্বপ্ন হলো ঈশ্বরের বুলি। তিনি যখন আমাদের বুলি বলেন, আমি তখন বলতে পারি তিনি কী বলছেন। তবে তিনি যখন আমাদের হৃদয়ের বুলিতে কিছু বলেন শুধু তুমি — তুমিই সে কথা বুঝতে পারবে। তা যা হোক, আমাকে কিন্তু আমার কাজের দর দাম সব মিটিয়ে দিয়ে যেতে হবে।

ছেলেটা বুঝে ফেলে, এ বেশ আর এক রকমের ধান্দাবাজী। তবু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয় শেষটা দেখে ছাড়বে। রাখালদের চিরকালই বন্য – নেকড়ে আর খরা-বন্যার সাথে যুঝে চলতে হয়, তাতেইতো পশু-পালনের আনন্দ আর শিহরণ।

“একই স্বপ্ন আমি দু‘দু‘বার দেখেছি“ ও বলে। “স্বপ্নে আমি আমার ভেড়ার পাল নিয়ে চলেছি দিগন্ত বিস্তৃত এক মাঠে, আতকা কোথা-থেকে এক বালক এসে আমার পশু গুলোর সাথে খেলা জুড়ে দেয়। আমি এসব পছন্দ করিনা, ভেড়ারা অজানা অচেনা মানুষ দেখলে ভয় পায়। তবে কোন বাচ্চা ওদের নিয়ে খেলা ধুলা করলে ভেড়ারা সাধারনত ভয় পায় না। জানি না কেন। কী জানি ভেড়া আবার মানুষের বয়সের কি বোঝে না বোঝে।“

“তোমার স্বপ্নের কথা আরো কিছু বলো।“ মহিলাটি বলে। “আমাকে আবার রান্না বান্না করতে হবে, এখনো দুনিয়ার কাজ পড়ে আছে। আর, তোমার কাছেওতো বেশী টাকা পয়সা নেই, বেশীক্ষণ সময় দিতে পারবো না।“

“বাচ্চাটা অনকক্ষণ ধরে আমার ভেড়াগুলোর সাথে খেলেই চলেছে, খেলেই চলেছে,“ ছেলেটা কথা চালিয়ে যায়, খানিক বিরক্ত। “তারপর একেবারে আৎকা একসময় বাচ্চাটা আমাকে দু‘হাতে ধরে নিয়ে চলে গেল মিশরীয় পিরামিডে।“

ও মুহূর্তখানিক থেমে দেখে নিতে চাইলে, ও যে মিশরীয় পিরামিডের কথা বললো সে সম্পর্কে মহিলার আদৌ কোনো ধারনা আছে কিনা। মহিলা নিশ্চুপ।

“তারপর সেই মিশরীয় পিরামিডে,“ ছেলেটা শেষের শব্দ তিনটে বললো বেশ টেনে টেনে ধীরে, যাতে করে বুড়ি বুঝতে পারে কথাটা —  “বাচ্চাটা আমাকে বললো, এখানে আসলে কিন্তু তুমিএকটা গুপ্তধনের খোঁজ পাবে।‘ আর যেই না সে বাচ্চা মেয়েটা আমাকে একেবারে সঠিক জায়গাটা দেখাবে, ঠিক তখনি আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। দু‘, দু‘বার।!

মহিলা বেশ কিছুক্ষণ নিরব থেকে সে আবার ওর হাত দুটো টেনে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে।

“আমি এখনিই তোমার কাছ থেকে কোন টাকা-পয়সা নিতে চাই না,“ মহিলা বললো। “বরং আমি চাই সে গুপ্তধন খুঁজে পেলে আমাকে তার দশ-ভাগের এক-ভাগ ধন দিয়ে দিতে হবে।“

ছেলেটা হেসে ওঠে — আনন্দে। গুপ্তধনের স্বপ্ন ব্যাখ্যা অছিলায় ওর যেটুকু টাকা-পয়সা খরচ হবার কথা, এখন তাও হবেনা।

ছেলেটা বললো, “ঠিক আছে, এবার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বল,“

“আগে আমার সামনে কিরে কাটো। কিরে কাটো যে এখন আমি তোমাকে যা শোনাতে যাচ্ছি তার বদলে তুমি আমাকে তোমার ধন-রত্নের দশ ভাগের এক ভাগ দিয়ে দেবে।“

রাখাল তা-ই কিরে কাটলো যে তা-ই দেবে। বৃদ্ধা তাকে আবারো কিরে কাটতে বলে যীশু খ্রীষ্টের পবিত্র হৃদয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে।

“এটা পৃথিবীর ভাষাতেই বলা একটা স্বপ্ন,“ মহিলা বললো। “আমি এর ব্যাখ্যা বলতে পারবো, তবে কাজটা বড় কঠিন। সে জন্যেই আমি মনে করি তোমার প্রাপ্ত ধন-রত্নের কিছুটা অংশ আমার পাওয়া উচিৎ।

“এবার খোলোসা করে বলি: তোমার অবশ্যই মিশোরীয় পিরামিডে যাওয়া উচিৎ, তবে আমি এর আগে কখনো এই জায়গাটার কথা কিছুই শুনিনি, তবে, যদি যে তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে সে যদি বাচ্চাই হয়, তাহলে গুপ্তধন ওখানেই আছে। সেখানেই তুমি যা ধন-সম্পত্তি পাবে তাতেই তুমি হয়ে যাবে বড়-লোক।“

ছেলেটা বললো, “শুধু সে জন্য এর পেছনে আমার সময় নষ্ট করবার দরকার নেই।“

“তোমাকে আমি আগেই বলেছি যে তোমার স্বপ্নটা বেশ কঠিন। জীবনের অনেক সহজ জিনিষই আসলে অসাধারন হয়ে ওঠে; শুধু মাত্র প্রাজ্ঞ ব্যাক্তিরাই তা ধরতে পারে। আমি তেমন প্রাজ্ঞ নই তাই আমাকে অন্য কাজ শিক্ষতে হয়েছে, এই যে এই হাতের রেখা পড়বার কাজ।“

“বেশ, তা মিশোরে আমি গিয়ে পৌছাবো কী ভাবে?“

“আমিতো শুধুই স্বপ্নের মানে ব্যাখ্য করে বলতে পারি। আমিতো জানি না সে সব কীভাবে বাস্তবায়িত করা যাবে। তাইতো আমাকে বেঁচে থাকতে হয় মেয়েদের দেওয়া অন্নে।“

“আর তাহলে কী হবে যদি আমি কখনোই মিশোরে পৌছুতে না পারি।“

“তাহলে আর কী হবে, আমি কোনো টাকা-পয়সা পাবো না। এতো আর জীবনে প্রথম নয়“

তারপর বৃদ্ধা চলে যেতে বলে ছেলেটাকে, বলে যে সে এতক্ষণে ওর জন্য অনেকক্ষটা সময় নষ্ট করে ফেলেছে।

এসব শুনে ছেলেটা নিরাশ হয়ে পড়ে; মনস্থির করে ফেলে আর কখনো ও স্বপ্ন বিশ্বাস করবে না। মনে পড়ে এখনো ওর অনেক কাজ বাকি পড়ে আছে: বাজারে গিয়ে কিছু খাওয়া দাওয়া করে নেয়, ওর বইটা বেচে আরো একটু মোটা একটা বই নেয়, তারপর নগরীর উন্মুক্ত বসবার জায়গায় একটা খালী বেঞ্চ পেয়ে বসে পড়ে সদ্য কেনা মদটা একটু চেখে দেখে। দিনটা বেশ তেঁতে উঠেছে গরমে, এর মধ্যে একটু মদ বেশ চাঙ্গা করে তোলে শরীরটা। ভেড়াগুলো সব নগরীর দরজার কাছে, ওর এক বন্ধুর খোয়াড়ে রেখে দিয়ে এসেছে। এই শহরের বহু মানুষ জণকেই ছেলেটা চেনে। এ জন্যেই ভ্রমন ওর এত ভালো লাগে — সর্বদাই ও নতুন নতুন বন্ধু বানায়, আর তাছাড়া তাদের সাথে ওর সারাক্ষণ সময় কাটাতেও হয় না। প্রতিদিন ঘুরে ফিরে একই মানুষ দেখতে দেখতে — দেখতে দেখতে, সেমিনারীতে ওর সাথে যেমন হয়েছিল, সবাই গুটিয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনের একেকটা অংশ হয়ে ওঠে। তারপর ওরা আশা করে মানুষটা বদলে যাক। কেউ একজন যদি তার মতো বদলে যেতে না পারে তাহলে সে রুষ্ট হয়।

প্রত্যেকটা মানুষেরই যেন পরিষ্কার ধারনা আছে যে অন্যান্য মানুষদের কেমন করে জীবনের পথ চলা উচিৎ, তবে কোন পুরুষ বা মহিলা নিজেরটার ব্যাপারে তা জানেনা।

সূর্য আকাশের আরো একটু নীচে নেমে আসা অব্দি ও অপেক্ষা করতে চায় তারপর গিয়ে ওর পশুর-পাল নিয়ে রওনা দেবে মাঠ-ময়দাম পেরিয়ে। আর তিন দিন, তারপর সে ব্যাপারীর মেয়ের সাথে।

কিনে নিয়ে আসা বইটা পড়তে শুরু করে। এক্কেবারে প্রথম পৃষ্ঠাতেই একটা দাফন অনুষ্ঠনের বর্ণনা। সংশ্লিষ্ট লোকজনের নামগুলো সব খটোমটো, উচ্চারণ করতে বেশ কষ্ট হয়। ও ভাবে, ও যদি জীবনে কখনো বই লেখে তাহলে এক সময় একটা চরিত্র উপস্থিত করবে,  যেন পাঠকদের একবারে অনেক নাম মনে রাখার ঝামেলা না পোহাতে হয়।

শেষ-মেষ বইটার মধ্যে পুরো পুরি ঢুকে পড়তে পেরে, পরে ভালোই লাগছে;  দাফন অনুষ্ঠনটা চলছিল এক তুষারপড়া দিনে।

ওরও বেশ শীত শীত লাগতে শুরু করে।  ও পড়ছে, একটা বয়স্ক লোক ওর পাশে এসে বসে কথা বলবার জন্য উস-খুস করতে থাকে।

আসে-পাশের অন্যান্য লোকদের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বৃদ্ধটি বলে, “ওরা সব কী করছে?“

“কাজ“ শুকনো গলায় অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর ছেলেটির, যাতে দেখে মনে হয় ও বই পড়ায় মনোযোগ দিতে চাইছে।

আসলে ও মনে মনে ভাবছিল এবার সে ব্যাপারীর মেয়ে চোখের সামনেই  ভেড়াগুলো কামাবে, তাহলে মেয়েটা বুঝতে পারে যে ছেলেটা কঠিন কঠিন কাজও করতে পারে অনায়াসে। এর মধ্যে ও এই দৃশ্য কল্পনা করেছে অনেকবার; প্রতিবারই মেয়েটা মুগ্ধ হয়ে শোনে যে ছেলেটা ওকে বোঝাচ্ছে ভেড়ার গায়ের পশম পেছন  দিক দিয়ে সামনের দিকে কামাতে হয়। ভেড়াদের পশম কামাবার সময় যাতে সময়-উপযোগী কিছু গল্প শোনাতে পারে তেমন কিছু গল্প ও মুখস্থ করতে চায়। গল্পগুলোর বেশীর ভাগই বইতে পড়া, সে গুলো বলতে হবে কিন্তু এমন ভাবে যেন মনে হয় সে সব ওর নিজের চোখে দেখা অভীজ্ঞতা। মেয়েটাতো কোনো দিন ধরতেও পারবেনা, কারণ সেতো পড়তে জানে না।

এদিকে আবার বুড়োটা লেগে রয়েছে ওর সাথে কথা-বর্তা বলবার ধান্দায়। ছেলেটার মদের বোতল থেকে কয়েক ঢোক মদ চেয়ে বলে, সে খুব ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্ত। ছেলেটা আশা করে বুড়োটা তাহলে এবার বিদায় হবে, মদের বাতল এগিয়ে ধরে তার দিকে।

বুড়োটারতো ধান্দা ওর সাথে কথা চালিয়ে যাওয়া, সে এবার জানতে চায় কী বই পড়ছে ছেলেটা। সত্যি সত্যি মেজাজ খারাপ হয়ে ওঠে ছেলেটার, একবার ভাবে উঠে চলে যাবে পাশের অন্য কোনো বেঞ্চে, তবে ওর মাথায় ওর বাবার শিক্ষা, বড়দের সন্মান করবে। এবার বইটা ও এগিয়ে ধরে বুড়োটার দিকে — কারন দুটো: প্রথমত, ও নিশ্চিত নয় যে বইটার নামের আসল উচ্চারন কী হবে; আর দ্বিতীয়ত, যদি বুড়ো মানুষটা নিজে পড়তে না পারে তাহলে সে লজ্জ্বা পাবে ফলে নিজেই উঠে গিয়ে অন্য একটা বেঞ্চ খুঁজে নিয়ে বসবে।

“হুম্…,“ বলে বুড়ো মানুষটা বইটা এ-পাশ ও-পাশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো, যেন ওটা কোনো একটা আজব বস্তু। “এটা কিন্তু খুবই কাজের একটা বই তবে বেশ বিরক্তিকর।“

ছেলেটা যেন আকাশ থেকে পড়লো। তারমানে বৃদ্ধ পড়তে জানে, বইটা সে আগেই পড়ে ফেলেছে।  বৃদ্ধের কথা মত বইটা যদি তেমন বিরক্তিকরই হয়ে থাকে, তাহলে এখনো বইটা বদলে নেওয়ার সুযোগ আছে।

“বইটা সেই একই চর্বিত চর্বন যা পৃথিবীর অন্যান্য তাবৎ বইতেও বলা হয়,“ বৃদ্ধ বলেই চলেছে। “বলেছে নিজের ভাগ্য নিজে বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা নেই মানুষের, আর বইটা শেষ করেছে এই বলে যে পৃথিবীর সব চাইতে রড় মিথ্যাটাই গোটা বিশ্বের মানুষ বিশ্বাস করে বসে আছে।“

ছেলেটা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে জানতে চায় “পৃথিবীর সব চাইতে রড় মিথ্যাটা কী?“

“পৃথিবীর সব চাইতে রড় মিথ্যা: জীবনে এমন একটা সময় এসে দাঁড়ায়, যখন মানুষ আর তার জীবনের প্রবাহমান ঘটনার উপর নিয়ন্ত্রন রাখতে পারে না, তখন মনে হয় আমি বরং যাযাবর পশুপালক হয়ে যাই।“

“আমার জীবনের ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়,“ ছেলেটা বলে উঠলো। “আমার মা-বাবা আমাকে ধর্ম যাজক বানাতে চাইছিল, আমিই সিদ্ধান্ত নিয়ে পশু-পালনের কাজ শুরু করেছি।“

বৃদ্ধ বলে উঠে, “বাহ্ বাহ্ বেশ। কারন তুমি ঘুরে বেড়াতে ভালবাসো।“

ছেলেটা মনে মনে বলে, “উনি জানে আমি কী ভাবতাম।“ বৃদ্ধ লোকটা এতক্ষণ বইটার পাতা উল্টেই চলেছে, ওটা ফেরৎ দেওয়ার কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ছেলেটা ক্ষেয়াল করে, মানুষটার পরনে অদ্ভুদ পোশাক। দেখতে আরবীয়, এখানে ব্যাপারটা নতুন কিছু নয়। তারিফ থেকে আফ্রিকা মাত্র কয়েক ঘন্টার পথ; নৌকায় চিকন একটা খাড়ি পেরোলেই হয়। আরবরাতো প্রায়ই এ শহরে আসে, কেনাকাটা করে আর দিনের মধ্যে কয়েকবার ওরা অদ্ভুদ ভাবে ওদের প্রার্থনা সেরে নেয়।

 ছেলেটা জানতে চায়, “আপনি কোত-থেকে আসছেন?“

“অনেক জায়গা থেকে।“

“একজন কেউ অনেকগুলো জায়গা থেকে আসতে পারে না।“ ছেলেটা বলে। “আমি একজন পশু-পালক, অনেক কয়টা জায়গাতেই আমি যেতে পারি, তবে আমি এসেছি কিন্তু একটাই জায়গা থেকে – পুরানো কেল্লার শহর থেকে। সেখানেই আমার জন্ম।“

“বেশতো, তাহলে বলতে পারো আমার জন্ম সালেমে।“

ছেলেটা জানে না সালেম কোথায়, তবে সে জিজ্ঞাসা করতে চায় না, মনে হলে তাতে সে কিছুটা হেয় হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ বরং এ-দিক সে-দিক তাকিয়ে একটু লোক জন দেখে নিলো; এ-দিক সে-দিক যাতায়াত করছে, সব্বাই যেন খুব ব্যাস্ত।

“তা, সালেম জায়গাটা কেমন?“ জানতে চায় ছেলেটা, অনুমান করবার জন্য ছিটে ফোঁটা সূত্র যদি পাওয়া যায়। “আগে সবসময় যেমন ছিল তেমনই।“

অনুমানের কোনো পথ পাওয়া গেল না। তবে ও নিশ্চিত সালেম আন্দালুশিয়ার কোথাও না। এখানে কোথাও হলে এতদিনে কোনো না কোনো ভাবে ওর কানে আসতো জায়গাটার নাম।

“সালেমে আপনি কী করেন?“ ছেলেটার মাথায় রোষ চেপে যায়।

“সালামে আমি কী করি?“ বৃদ্ধ হেসে ওঠে। “আমি, আমি সালামের রাজা“

ছেলেটা ভাবে, মানুষ কীনা সব আজগুবি কথাকার্তা বলে বেড়ায়। কখনো সখনো ভেড়াদের সাথে সময় কাটানোই বরং ভালো, ওরা কিছুই বলে না, আবার বই নিয়ে একা একা সময় কাটানোও আরো ভালো। শুনতে চাইলে তবেই ওরা ওদের আজগুবি গল্প শোনায়, নইলে নয়। মানুষের সাথে কথা বললে মাঝে মাঝে এমন সব আজগুবি কথা বলে বসে যে পরে আর কথা বলতেই ইচ্ছে করে না তাদের সাথে।

“আমার নাম মেলসিযেদেক,“ বৃদ্ধ লোকটা বললো। “তোমার কাছে আছে কটা ভেড়া?“

ছেলেটা বললো, “আছে মোটামুটি কম নয়।“ ও দখতে পাচ্ছে বুড়োটা ওর ব্যাপারে আরো অনেক কিছু জানতে আগ্রহী।

“তাহলেতো ভালই, তবে তাতে একটা সমস্যা আছে। তুমি যদি মনে করো যে তোমার কাছে যথেষ্ট ভেড়া আছে তাহলেতো আর আমি তোমার জন্য কোনো রকমের কোনো সাহায্য সহযোগিতা করতে পারবো না।“

ছেলেটার মেজাজ খারাপ হয় কথাটা শুনে। ওতো কোন সাহায্য সহযোগিতা চায়নি। বুড়ো মানুষটাই বরং ওর কাছ থেকে একটু মদ খেতে চেয়ে আলাপ জুড়ে দিলো।

“ আমার বইটা ফেরৎ দেবেন,“ ছেলেটা বলে। “ আমাকে এবার যেতে হবে, ভেড়াগুলো একসাথে জড়ো করে রওনা দিতে হবে।“

বৃদ্ধ বলে, “তোমার কাছে যা ভেড়া আছে তার এক দশমাংশ আমাকে দিয়ে দাও, তাহলে আমি তোমাকে গুপ্তধন খুঁজে বের করবার পথ বাতলে দেবো।“

স্বপ্নের কথা মনে পড়ে, সাথে সাথে ওর কাছে সব পরিষ্কার ভাবে ফুটে ওঠে। বৃদ্ধা ওর কাছে  থেকে পরামর্শ দানের জন্য কিছুই মুল্য নেয়নি, তবে ওখানে আদৌ কোনো গুপ্তধন নেই তাই এই বুড়ো লোকটা — হয়তো ওর স্বামী —  সে জায়গার খবর দিয়ে বাড়তি কিছু টাকা খসিয়ে নেওয়ার জন্য এই রাস্তাটা বেছে নিয়েছে। বৃদ্ধ লোকটাও হয়তোবা যাযাবর, হতেও পারে।

ছেলেটা কিছু বলে ওঠার আগেই বুড়ো ঝুঁকে পড়ে একটা লাঠি তুলে নিয়ে বালিতে কী যেন লিখতে থাকে। বৃদ্ধ নড়ে ওঠার সাথে সাথেই ওর বুকের কাছ থেকে চকচকে উজ্জ্বল একটা জিনিষ প্রচন্ড ভাবে তৃক্ষ্ম আলো ঝকমক করে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে ছেলেটার চোখ ধাঁধিয়ে যায়, কিছুক্ষণ আর কিছুই দেখতে পারে না। বৃদ্ধ অসম্ভব দ্রুত গতিতে চট করে নিজের বুকের জিনিষটা ঢেকে ফেলে।  ছেলেটার চোখের দৃষ্টি আবার স্বাভাবিক হয়ে এলে ও মাটিতে বুড়োর লেখাগুলো পড়ে।

ছোট্ট সেই শহরের উন্মুক্ত বসবার জায়গায় বালির উপরের লেখা, ছেলেটা পড়ে, ওর বাবার আর ওর মায়ের নাম আর যে সেমিনারীতে ও যোগ দিয়েছিল তার নাম। ও ওখানে পড়ে দেখে ব্যাপারীর মেয়ের নাম, ও নিজেও এখনো জানে না, আর পড়ে দেখে সেই বালির ওপর বৃদ্ধ লোকটা এমনও কয়েকটা বিষয় লিখেছে যা ও নিজেই কাউকে কখনো বলেনি।

বৃদ্ধ বলে, “আমি সালেমের রাজা।“

ছেলেটা হতবুদ্ধ মনে সংশয়, প্রশ্ন করে, “কী কারনে একজন রাজা পশু-পালকের সাথে কথা বলছেন?“

“কারণ অনেক। তবে সবচাইতে জরুরি যে তুমি তোমার নিয়তি খুঁজে বের করে নিতে পেরেছো।“

ছেলেটা জানে না মানুষের ‘নিয়তি‘ মানে কী।

“নিয়তি, যা তুমি পেতে চাও সর্বদা। সবাই ছেলে-বেলায়’ জেনে যায় নিজেদের নিয়তি।“

“ জীবনের ঔ সময়টায় সব কিছুই বেশ ঝকঝকে পরিস্কার আর সব কিছু করাই সম্ভব। স্বপ্ন দেখায়ও কোনা ভয় নেই, ইচ্ছেমত সব কিছুই আকাঙ্ক্ষা করা চলে। তারপর সময়ের সাথে সাথে, রহস্যময় এক রকমের শক্তি মানুষকে বুঝিয়ে দেয়, না, নিয়তিকে বোঝা সম্ভব নয়।“

বুড়ো লোকটার বলা কথাবার্তার মাথামুন্ডু কিছুই ছেলেটার মাথায় ঢোকে নি। তবে সে বুঝতে চায় যে ‘রহস্যময় শক্তিটা‘ কী; ব্যাপারীর মেয়ে ছেলেটার মুখে এসব কথা শুনলে নিশ্চয় খুব অনুরক্ত হয়ে উঠবে।

“এ এমন এক শক্তি যা আপাতদৃষ্টিতে খারাপ মনে হবে, কিন্তু এই শক্তিই তোমাকে দেবে তোমার নিয়তি অনুধাবন করবার ক্ষমতা। সেই শক্তিই গড়ে তোলে মানুষের কর্ম উদ্দিপনা আর জাগিয়ে তোলে মানুষের মনের ভেতরের আগ্রহ, কারণ সেই শক্তির মধ্যেই নিহিত রয়ে গেছে এ গ্রহের চরম একটা সত্য: তুমি যা-ই হও না কেনো, অথবা যা-ই তুমি করো না কেন,  তুমি যখন আসলেই মনে-প্রাণে কোনো কিছু পেতে চাইবে, সেই শক্তিটাই তখন তোমার ইচ্ছাটা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে নিয়ে পৌছে দেবে। সেইটাই হবে এই পৃথিবীতে তোমার বেঁচে থাকার মূল উদ্দেশ্য।“

“মূল উদ্দেশ্য হতে পারে ভ্রমনকালে যা যা করতে চাও? কিংবা বস্ত্র বণিকের কন্যকে বিয়ে করতে চাওয়া?“

“হ্যা, এমনকি ধন-রত্নের খোঁজে যেতে চাওয়াও হতে পারে জীবনের মূল উদ্দেশ্য। পৃথিবীর আত্মা পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে মানুষের আনন্দে। সে সাথে অবশ্য নিরানন্দ, পরশ্রিকাতরতা আর ঈর্ষাও। নিয়তি বুঝতে পারাটাই মানুষের আসল দায়িত্ব। সব জিনিষই এক।

“যখনই তুমি একটা কিছু চেয়ে বসো কায়-মনো-বাক্যে, গোটা ব্রহ্মাণ্ড লেগে পড়ে তোমাকে তা পাইয়ে দিতে।“

দু‘জনই কিছুক্ষণ নিরবে কাটায়, শহরের সেই ফাঁকা বসবার জায়গা আর শহরের মানুষজন দেখে চেয়ে চেয়ে। নিরবতা ভঙ্গ করে বৃদ্ধ প্রথম কথাটা বলে।

“এক পাল ভেড়া নিয়ে তুমি চরে বেড়াচ্ছো কেন?“ “আমি ভ্রমন করতে ভালবাসি।“

এক কোনের এক রুটির দোকানে জানালায় একজন  দোকানদার দাঁড়িয়ে ছিল, বৃদ্ধ তাকে দেখিয়ে বলে, “ঐ যে লোকটা, ছেলে বেলা সেও ভ্রমনের কথা ভাবতো। তবে ভাবলো প্রথমে একটা রুটির দোকান করে, কিছু টাকা-পয়সা জমা করে নিক।সময় কেটে যাবে, ও বৃদ্ধ বয়সে, আফ্রিকায় গিয়ে একটা মাস ছুটি কাটিয়ে আসবে। কখনো অনুধাবনই করতে পারবে না যে মানুষ ইচ্ছে করলে জীবনের যে কোনো সময় নিজের স্বপ্ন গড়ার কাজে নেমে পড়তে পারে।“

ছেলেটা বললো, “ওরতো পশু-পালক হওয়াই উচিৎ ছিল।“

“ও একবার চিন্তাও করেছিল তাই,“ বৃদ্ধ বলে, “তবে কথাটা কী জানোতো পশু-পালকের চাইতে রুটি বানানোর লোকের কদর বেশী। যারা রুটি বানানোর কাজ করে তারা নিজের ঘরে ঘুমায় আর পশু-পালক — রাখালদের শুতে হয় খোলা আকাশের নিচে যেখানে সেখানে। কোনো মেয়ের বাবা-মাও তাদের মেয়ের জামাই হিসাবে রাখালের চাইতে বেশী পছন্দ করবে রুটিওয়ালাদের।

ব্যাপারীর মেয়ের কথা চিন্তা করে ছেলেটা মনে মনে একটু কষ্ট পায়। ওদের শহরেওতো নিশ্চয় রুটিওয়ালা আছে।

বৃদ্ধ বলেই চলেছে, “শেষ পর্যন্ত মানুষজনের কাছে নিজেদের নিয়তির চাইতেও বড় হয়ে ওঠে রাখাল আর রুটি-কারিগরের ব্যাপারে ওদের চিন্তা।“

বৃদ্ধ লোক বইটা পাতার পর পাতা উল্টে চলেছে, এক জায়গায় এসে থামলো, পড়ছে মনে হলো। ছেলেটা বসেই আছে, এক সময় একটা কথা ওর মনে আসে ও পশ্ন করে বৃদ্ধলোকটাকে, “এ সব আপনি আমাকে বলছেন কেন?“

“কারণ তুমি তোমার নিয়তি বুঝে নিতে চাইছো। আর এখন পথের ঠিক সেই মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছো যেখান থেকে সব কিছু গুটিয়ে ফেলতেও পারো“

“আর সেজন্যেই আপনি ঠিক সেই মোড়ে এসে হাজির হয়েছেন?“

 “সর্বদা এইভাবে হাজির হই না, আমি এসে হাজির হই কোন না কোনো রুপে। কখনো সখনো আমি আসি সমাধান হয়ে, কখনো বা আসি উত্তম ধারণা হিসাবে। অন্য কখনো আসি চরম মুহূর্ত হিসাবে, ঘটনা ঘটার পথ সহজতর করে ফেলি। আরো অনেক কিছুই আমিই করি, তবে অধিকাংশ সময় মানূষ ঠের পায় না তা আমি করেছি।“

বৃদ্ধ লোকটা নজির দিয়ে বলে, সপ্তাহখানেক আগে, ওকে জোর করে একটা খনি শ্রমীকের সুমুখে যেতে হয়েছিল, যেতে হয়েছিল পাথরের রুপ ধরে। পান্নার খোঁজে লোকটা সর্বশান্ত হয়ে যায়। বিগত পাঁচ বছর যাবৎ সে একটা নদীর পাড়ে কাজ করছিলেন, হাজার-হজার পাথর পরিক্ষা নিরিক্ষা করে করে পান্না খুঁজতো সে। এক সময় যখন লোকটা তিতি-বিরক্ত হয়ে চোতা-পাত্তাড়ি সব গুটিয়ে নিয়ে ফিরে চলে যাবে ভাবছে ঠিক তখন কিন্তু সে তার মহামূল্যবান পান্না পাওয়া থেকে আর মাত্র একটা — মাত্র একটা পাথর দেখা বাকি। শ্রমিকটি তার নিয়তির খোঁজে জীবনের সব কিছু ত্যাগ করে বসে আছে, তাই বৃদ্ধটি ওর ব্যাপারে জড়িয়ে পড়বার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি একখন্ড পাথরের রুপ ধরে শ্রমীকটির পায়ের কাছে গড়িয়ে আসে। লোকটা তখন মহা রাগে বিরক্তিতে ক্ষেভে পাথরটা তুলে নিয়ে সর্ব শক্তি দিয়ে ছুড়ে মারে এক পাশে। পাথরের গায়ে পাথরটা পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর পান্নাটা।

“জীবনের প্রাতঃকালে মানুষ জেনে ফেলে তার জীবনের মূল উদ্দেশ্য কী,“ তিক্ত কন্ঠে কথাটা বলে বৃদ্ধ লোকটা। “সে জন্যই হয়তো তাড়া হুড়ো করে সব মাটি করে ফেলে। তবে নিয়তির গতি ওটাই।“

ছেলেটা বৃদ্ধকে মনে করিয়ে দেয়, গুপ্তধনের কথা কী যেন বলছিলো সে।

“ধন-সম্পদ পানির তোড়ে ভেসে ওঠে আবার সেই পানির স্রোতেই ডুবে যায়,“ বুড়ো লোকটা বলে। “হ্যা তবে তুমি নিজের গুপ্তধনের কথা কিছু জানতে চাও, সে ক্ষেত্রে আগে আমাকে তোমার ভেড়াগুলোর দশ ভাগের এক ভাগ দিয়ে দিতে হবে।“

“আমার গুপ্তধনের দশ ভাগের এক ভাগ যদি দিতে চাই?“

দেখে মনে হলো কথাটা বুড়োর পছন্দ হয়নি। “তোমার হাতে যা এখনো এসে পৌছালো না, তা নিয়ে এত ভাগাভাগি করতে বসলে পরেতো আর সে গুপ্তধনে তোমারই কোনো আগ্রহই থাকবে না।“

ছেলেটাতো আগেই বলে ফেলেছে যে সে যাযাবর মহিলাকে কথা দিয়েছে, গুপ্তধন পেলে ও গুপ্তধনের দশ ভাগের এক ভাগ তাকে দিয়ে দেবে।

“যাযাবরেরা কিন্তু মানুষকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পটু,“ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুড়োটা। “যাহোক তবু তুমিতো জীবনে একটা জিনিষ শিখে নিলে যে, জীবনে কিছু পেতে গেলে কিছু দিতেই হবে। সব কিছুরই কিছু না কিছু মূল্য দিতে হয়। এই কথাটাই আলোর দিশারীগণ শেখাতে চায়।“

বৃদ্ধ বইটা ফেরৎ দেয়।

“আগামীকাল, ঠিক এই সময়ে, তোমার ভেড়াগুলোর একদশমাংশ নিয়ে চলে আসো। ব্যাস আমি তোমাকে বলে দেবো গুপ্তধন খুঁজে বের করতে হবে কি ভাবে। ভালো থাকো।“

খোলা  মেলা বসবার জায়গাটার এক কোনে মানুষটা উদাও হয়ে গেল।

ছেলেটা আবারো বই পড়তে শুরু করে, তবে এবার সে আর কিছুতেই পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না। উত্তেজনা বেড়েছে, মনটা তেতো হয়ে ওঠে, ও জানে বুড়ো লোকটা একেবারে সঠিক কথা বলেগেছে। সে উঠে গিয়ে রুটির দোকান থেকে একটা রুটি কিনে নিয়ে আসে, দোকানে দাঁড়িয়ে একবার ভেবে নিলো বুড়োটা ওর সম্পর্ক্যে যা যা বলে গেলো সেসব ও ওকে বলবে কি না। কখনো কখনো যেটা যেমন আছে তা তেমই রেখে দেওয়াই ভালো, মনে মনে ভেবে নেয়, মনে হলো না বলাই ভালো। ও কিছু বললে, রুটিওয়ালা ব্যাটা তিন দিন ধরে ভাববে, তাহলে কি এটা গুটিয়ে ফেলা দরকার, যদিও যেমন আছে তেমন চলায় ও অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে এত দিনে। অবশ্যই রুটিওয়ালার মনে এই জাতীয় উদ্বেগ সৃষ্টি করার বিরুদ্ধেচারণ করে ছেলেটা। তাই সে এবার শহরটা ঘুরে ফিরে বেড়াতে বেড়াতে এসে পড়লো মূল ফটকের কাছে। এখানে ছোট একটা বিল্ডিংয়ের জানালায় মানুষ আফ্রিকা যাওয়ার টিকিট কাটছে। ও জানে মিশর আফ্রিকায়।

“কিছু লাগবে?“ জানালার পিছরে বসা লোকটা জানতে চাইলো।

“কালকে হয়তো লাগবে,“ বলে দূরে চলে গেল ছেলেটা। ওর একটা ভেড়া বেচলেই সাগরের খাড়িটা পেরিয়ে যাবার ভাড়া হয়ে আরো টাকা থেকে যাবে কত। এই চিন্তাতেই ও শিউরে উঠলো।

“আরেক স্বপ্নদর্শী,“ ছেলেটাকে চলে যেতে দেখে কথাটা তার সহকারীর কাছে বললো টিকিট বিক্রেতা। “ওপারে যাওয়ার মাল নেইওর পকেটে।“

টিকিট ঘরের জানালাটার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলেটার মনে পড়ে ওর পশুগুলোর কথা, ও মনোস্থির করে ফেলে ফিরে গিয়ে ও বরং রাখাল হয়েই থাকবে। দু‘বছরে ও রাখালগিরীর সব কাজ শিখে নিয়েছে: ভেড়ার লোম কমানো, পয়াতি ভেড়ার পরিচর্যা, আর নেকড়ের কবল থেকে কী ভাবে ভেড়ারপাল রক্ষা করে রাখা যায় তাও। আন্দালুশিয়ার সব মাঠ-ঘাট আর চারণক্ষেত্র এখন ওর চেনা। আর ও ওর প্রত্যেকটা ভেড়ার উপযুক্ত মূল্যও জানে।

সে ঠিক করলো অনেকে পথ ঘুরে ঘুরে ও এখন ওর বন্ধুর খোয়াড়টাতে যাবে। হাঁতে হাঁটতে  পৌছুলো এসে নগরীর কেল্লাটার কাছে, ওখানে দাঁড়িয়ে পাথরের ঢাল বেয়ে দেয়ালের উপরে ওঠে। সেখান থেকে দেখা যায় আফ্রিকা, অনেক দূরে। কে যেন কবে ওকে  বলেছিল ওখান থেকেই এক কালে নিগ্রোরা এসে গোটা স্পেন দখল করে নিয়েছিল।

যেখানে সে এখন বসে, সেখান থেকে মোটামুটি প্রায় পুরো শহরটই চোখে পড়ে, এমনকি বুড়ো লোকটার সাথে বসে বসে যে ফাঁকা জায়গাটায় ও এতক্ষণ কথা বলেছে সে জায়গাটাও দেখা যাচ্ছে। ও ভাবে, কী এক কুক্ষণে যে বুড়োটার সাথে ওর দেখা হয়েছিল! যে বুড়িটা স্বপ্নের ব্যাখা করে দিতে পারে শুধু তার সাথে দেখা করবার জন্যেই ও এ শহরে এসেছিল। ও যে রাখাল এই বাস্তব সত্য কথাটা শুনে বুড়ো-বুড়ি কেউই  খুশি হতে পারে নি। ওদেরা দুজনেই এককেটা নির্জন বিলাসী মানুষ, কিছুতেই এখন আর ওদের কোনো বিশ্বাস নেই, ওরা ধারনাও করতে পারে না যে পশু-পালকের সাথে তার পশুদের এক রকমের আত্মার সম্পর্ক্য তৈরি হয়ে যেতে পারে। ওর পশু-পালের প্রতিটা ভেড়ার ব্যাপার, ওর নখ দর্পনে: ও জানে কোন ভেড়াটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটে, কোনটা এখন পোয়াতি, দু‘মাস পরেই তার বাচ্চা হবে, আর কোন কোন গুলো অলস। ও জানে কী করে ভেড়ার গায়ের পশম কামিয়ে নিতে হয়, আবার এও জানে কী ভাবে ভেড়া জবাহ দিতে হয়। ও কখনো ওদের ছেড়ে চলে গেলে ওদের অনেক ভুগতে হবে।

বাতাস জোরে বইতে শুরু করে। ও জানে এই বাতাসকে ওরা বলে: ল্যেভানতে, কারণ নিগ্রোরা ভূমধ্যসাগরের পূর্ব প্রান্ত লিভান্ত থেকে এসেছিল। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের এক রকমের শক্তিশালী পূর্বমুখী বাতাস।

বাতাসের তীব্রতা ক্রমেই বাড়তে থাকে।ছেলেটা চিন্তা করে, এখানে পড়ে আছি আমি আমার ভেড়ার পাল আর গুপ্তধনের মাঝখানে। একটা ওর জীবনের সাথে মিলে মিশে আছে আরেকটা যা ও জীবনে পেতে চায়, এই দুয়ের মাঝে একটা এখন বেছে নিতে হবে। তার ওপর আরো আছে ব্যাপারীর মেয়ে, তবে সে ওর ভেড়াদের মত অত গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ সেতো আর ওর ওপর নির্ভরশীল নয়। এমনও হতে পারে, ওর আর এই ছেলেটার কথা মনেই নেই। ছেলেটাদৃঢ় ভাবে নিশ্চিত যে সে কবে পৌছাবে না পৌছাবে মেয়েটার তাতে কিছুই যায় আসে না: ওর কাছে প্রতিটা দিনই সমান, প্রতিটা দিনই আগের দিনেরই মতো, কারো মনে প্রত্যেকটা দিন একই রকমের মনে হওয়ার মানে প্রতি দিন সূর্য ওঠার মতো জীবনে ঘটে চলা ভালো ভালো ব্যাপার গুলো সে পৃথক ভাবে সনাক্ত করতে পারে না।

আমার বাবা, আমার মা, আর আমার শহরের সেই কেল্লা সব পেছনে ফেলে রেখে চলে এসেছি। ওরা আমার দূরে থাকায় অভ্যস্থ হয়ে গেছে, আমিও। আমি এখানে না থাকলে, ভড়াগুলোও ক্রমে ক্রমে তেমন হয়ে উঠবে এক সময়, ছেলেটা ভাবে।

যেখানে ও বসেছে সেখান থেকে শহরের ফাঁকা বসবার জায়গাটা স্পষ্ট দেখা যায়। মানুষ জন সারাক্ষণই আসছে যাচ্ছে রুটির দোকানটায়। বুড়ো লোকটার সাথে যে বেঞ্চটায়  বসে ও কথা বলছিল সেখানে এখন এক জোড়া যুবক যুবতি বসে চুমু খাচ্ছে।

“রুটিওয়ালা …“ মনে মনে কথাটা শুরু করে শেষ করতে পারেনি। বাতাসের বেগ এখনো কমেনি একটুও, প্রচন্ড ঝাপটা মুখে এসে লাগছে। এই বাতাস নিগ্রোদের এনেছিল, হ্যা, তবে সেই সাথে এসেছে মরুভূমির ঘ্রাণ আর অবগুন্ঠিত নারীদের কাহিনি। এই বাতাসই বয়ে নিয়ে এসেছে সেই সব পুরুষদের ঘাম আর স্বপ্ন, একদা যারা চলেগেছে অজানার খোঁজে, যারা চলেগেছে স্বর্ণ অথবা দু:সাহসিক অভিযানের নেশায় — আর পিরামিডের টানে। বাতাসের স্বাধিনতায় ছেলেটা ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে, ও ভেবে দেখে, সে নিজেও এমন স্বাধিন থাকতে পারে।  ও ছাড়া ওর আর কোনো পিছুটান নেই। ভেড়া, ব্যাপারীর মেয়ে, আর আন্দালুশিয়ার মাঠ-ঘাটই শুধু ওর নিয়তিতে পৌছানোর  পথে বাধা।

পরের দিনে দুপুরে ছেলেটা আবার বুড়োর সাথে দেখা করে। সাথে ছ‘টা ভেড়া।

“অবাক কান্ড“ ছেলেটা বলে। “অন্যান্য সব কটা ভেড়া আমার বন্ধুই কিনে নিলো সঙ্গে সঙ্গে। ও বললো ওর চির দিনের স্বপ্ন ও পশু-পালনের পেশা, ফলে আমার সিদ্ধান্ত নাকি ওর জন্য উত্তম লক্ষণ।“

“এভাবেই সব হয় সব সময়,“ বৃদ্ধ শুনে বললো। একেই বলে আনুকূল্যতার নীতি। তুমি প্রথম বার তাস খেলতে বসলে, মোটামুটি ভাবে ধরে নিতে পারো তুমিই জিতবে। ভাগ্যের করুনা।“

“কারণ কী?“

“কারণ, এক রকমের শক্তি সর্বদাই চায় যে তুমি তোমার কপাল পরক্ষ করে দখো, সে-ই এক ছিটে ফোটা ভাগ্য ছড়িয়ে দিয়েই তোমার ক্ষুধা উসকে দিতে চায়।“

তারপর বুড়ো লেগে পড়লো ভেড়া গুলো পরিক্ষা নিরিক্ষা করবার কাজে, একটা খোঁড়া। ছেলেটা বোঝালো, ওটা লেংচে লেংচে হাঁটে ঠিকই তবে ওর সব ক‘টা ভেড়ার মধ্যে ওটাই সবার চাইতে বেশী বুদ্ধিধর আর ওটা পশমও দেয় বেশী।

ও জানতে চায়, “গুপ্তধন কোথায়?“

“মিশরে, পিরামিডের আসে পাশে।“

ছেলেটা চমকে ওঠে।  বুড়িওতো এই একই কথা বলেছে, সেতো কোনো কিছু নেয়নি।

“গুপ্তধন খুঁজে পেতে হলে তোমাকে কিছু দিগনির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ঈশ্বর সবার জন্য পথ স্থির করে রেখেছেন, সেটা অনুসরণ করে চলতে হয়। তোমার জন্য যে পথ নির্দেশনা তিনি দিয়ে রেখেছেন, সেটা পড়ে পড়ে বুঝে বুঝে তোমাকে এগিয়ে যেতে হবে।“

ছেলেটা কিছু বলবার আগেই, কোথা থেকে একটা প্রজাপতি এসে ওদের র মাঝখানে অস্থির হয়ে ওড়াউড়ি করতে থাকলো। ওর দাদাজান একবার একটা কথা বলেছিল ওকে, সে কথাটা এখন মনে পড়ে গেলো: প্রজাপতি কিন্তু ভালোর লক্ষণ। যেমন ঝিঁঝিঁ, প্রত্যাশার সুলক্ষণ; যেমন টিকটিকি, যেমন চাঁর পাতার ক্লোভ।

ছেলেটার চিন্তাটুকু পড়ে বুঝে নিয়ে বুড়ো বললো, “ঠিক। তোমার দাদাজান শিক্ষিয়েছেনতো। ভালো লক্ষণ।“

বুড়োটা এবার তার পরনের হাতা-কাটা কোটটা ফুলে ফেললো, ছেলেটাতো ওর দিকে তাকিয়ে থ মেরে গেলো। বৃদ্ধ বুকে পরে আছে একটা স্বর্ণের বক্ষাবরণী, চতুর্দিক মহামূল্যবান পাথরের কারুকাজ করা। ছেলেটার মনে পড়ে যায় গতকাল দেখা সেই আলোর ঝিলিকের কথা।

দেখা যাচ্ছে সেতো সত্যি সত্যিই একজন রাজা!  তাহলেতো চোর-ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য তার ছদ্মবেশ নেওয়া প্রয়োজন।

বক্ষাবরণীর মাঝখানে বসানো একটা সাদা পাথর আর একটা কালো পাথর তুলে বের করে নিয়ে বৃদ্ধ বললো, “নাও, এগুলো নাও। একটা ইউরেম আরেকটা থামেম। কালো পাথরটার ঈঙ্গিত ‘হ্যা-সূচক‘ সাদাটার ঈঙ্গিত ‘নেতিবাচক।‘ নিজে নিজে কোন লক্ষণ সু না কু বুঝতেপারলে তখন এগুলো তেমায় সহযোগিতা করবে। সব সময় বস্তুনিষ্ট প্রশ্নই করবে।

“তবে পারলে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়াই ভালো। গুপ্তধন পিরামিডে; এ কথাতো তুমি জানোই। তোমাকে আমি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজে সহায়তা করেছি, সেজন্য ছয়টা ভেড়া নিলাম।

ছেলেটা ওর থলির মধ্যে পাথরদুটো রাখে। এই এখন থেকে ও নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে।

“মনে রেখো যা কিছু করছো শুধুই একটামাত্র জিনিষের জন্য, অন্য কিছুর জন্য নয়।  লক্ষণ বুঝে চোলো। সবচাইতে বড় কথা সবসময় নিয়তির পথে চলবে, একেবারে শেষটা দেখে ছাড়বে।

“চলে যাবার আগে একটা গল্প শুনিয়ে যাই।

“এক দোকানদার তার ছেলেকে পৃথিবীর সবচাইতে বুদ্ধিমান লোকটার কাছে গিয়ে সুখী হওয়ার গোপন সূত্রটা জেনে আসতে পাঠালো। চল্লিশ দিন পর্যন্ত দোকানদারের ছেলে মরুভূমি ঘুরে বেড়ালো, শেষে সু উচ্চ একটা পাহাড়ের ওপরে অতিব সুন্দর একটা প্রাসাদ খুঁজে পেলো। এখানেই সেই বুদ্ধিমান লোকটা থাকেন।

“আমাদের এই গল্পে নায়ক ভেবেছিল এখানে সে কোনো এক ধ্যানমগ্ন জ্ঞাণতাপসের দেখা পাবে, তবে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে দেখে, এতো কাজেকর্মে ব্যাস্ত একটা জনাকীর্ণ স্থান: ব্যবসায়ীরা যাচ্ছে আসছে, এক কোনে বিভিন্ন মানুষজণ জড়ো হয়ে আলাপ-আলোচনা করছে, অল্প কিছু বাদক দলের ছোট-খাটো একটা অর্কেস্ট্রা নরম সূর বাজিয়ে চলেছে, আর বিশ্বের এ-প্রান্তের যাবতীয় সুস্বাদু খাদ্য সম্ভার একটা টেবিলের উপর খাঞ্চি [বড় আকারের প্লেট] ভরে ভর সাজিয়ে রাখা। বিজ্ঞ ব্যাক্তিটি সবার সাথেই কথা বলে চলেছেন, দোকানদারের ছেলের মনে হচ্ছে লোকটার সাথে কথা বলতে হলে এখনো  দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ঘন্টা দুয়েক, তার আগে বিজ্ঞলোকটা ওর দিকে তাকাবারও ফুরসৎ পাব না।

“বিজ্ঞ লোকটা ওর কাছে বেশ খোলসা করে একেবারে পরিষ্কার ভাবে জেনে নিলো ওর এখানে আসবার কারণ, তারপর বুঝিয়ে বললো এই মুহূর্তে সুখের মুল চাবীকাটিটা যে কী তা সবিস্তারে বলবার সময় ওনার হাতে নেই। দোকানদারের ছেলেটাকে তিনি পরামর্শ  দিয়ে বলে দিলেন প্রাসাদটা ঘুরে ঘুরে দেখে দুই ঘন্টা পরে আসতে।

“‘সেই সাথে  আমি তোমাকে একটা কাজ দেবে,‘ বলে বিজ্ঞ লোকটাওর হাতে একটা চা-চামুচ ধরিয়ে দিলো, তাতে দু’ফোঁটা তেল। ‘এই চামুচটা হাতে ধরে রেখো প্রাসাদটা ঘুরে ঘুরে দেখার সময়। দেখো তেল যেন না পড়ে।‘

“দোকানদারের ছেলে অনেক বড় বড় চড়াই উৎরাই সিড়ি পেরেয়ে পেরিয়ে প্রাসাদটা ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়ালো, তবে হাতের চামুচ আর তেলের উপর থেকে মোটেই চোখ সরায়নি। ঠিক দু’ঘন্টা পরে সে আগের সেই ঘরটায় ফিরে এলো যেখানে বিজ্ঞ লোকটাছিলেন।

“বিজ্ঞলোকটা ওকে দেখে বললো, ‘এই যে ছেলে, তুমি আমার খাবার বড়-ঘরটায় টাঙ্গানো পারস্যের পর্দাটা দেখেছ? আমার বাগানটা দেখেছ, ওটা একজন ওস্তাদ মালী দশ বছর ধরে গেড়ে তুলেছে? আমার গ্রন্থাগারের বই গুলোর অনিন্দনিয় সুন্দর চর্ম-পত্র [পার্চমেন্ট: চামড়ার তৈরি কাগজ] লক্ষ্য করেছো?‘

“দোকানদারের ছেলে বেশ বিব্রত হয়ে পড়ে, স্বীকার করে যে ও আসলে কিছুই ঠিক-ঠাক ভাবে দেখেনি। ও কেবল বিজ্ঞলোকটা যে দায়ীত্ব দিয়েছিল সেই চামুচ আর তেলের দিকে নজর রাখতে গিয়ে অন্য কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে পারেনি।

“ঠিক আছে এবার আবার একবার যাও আমার এই গোটা পৃথিবীর বিষ্ময়কর সৌন্দর্য ঘুরে দেখে আসো,‘ বিজ্ঞ লোকটা বললেন। ‘কোনো মানুষের থাকবার জায়গাটা জানা না থাকলে তাকে বিশ্বাস করা যায় না।‘

“স্বস্তি পেয়ে দোকানদারের- ছেলে চামচটা তুলে নিয়ে প্রাসাদটা পুনরাবিষ্কারের জন্য বেরিয়ে পড়লো, এবার সে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে নিলো সিলিং আর দেয়ালের শৈল্পিক কারুকাজ। সে বাগানটা দেখলো , দেখলো ওর চতুর্পাশে ঘিরে থাকা পাহাড়, মনোরম ফুলের বাহার, আর প্রতিটা জিনিষে উন্নততর রুচির সুস্পষ্ট ছাপ। বিজ্ঞলোকটার কাছে ফিরে এসে, ও যা যা দেখেছে তা বয়াণ করে।

“কিন্তু তোমাকে যে আমি দু ফোঁটা তেল দিয়েছিলাম তা কোথায়? জানতে চাইলেন বিজ্ঞলোকটা।

“হাতের চামুচটার দিকে চেয়ে দেখে, তেল নেই।

“বেশ, তাহলে তোমাকে শুধু একটামাত্র পরামর্শ আমি দিতে পারি,‘ বিজ্ঞতর লোকটা বললেন, ‘সুখী হওয়ার গোপনসূত্রটি হলো এই যে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য্য দেখো তবে কখনোই নিজের হাতের চামচে তেলটার কথা ভোলা চলবে না।“

রাখাল ছেলেটার মুখে রা নাই। বৃদ্ধ রাজার গল্পটা সে বেশ অনুধাবন করতে পারছে। সে ভ্রমনে যেতেই পারে, তবে ওর ভেড়াগুলোর কথা ভুলে থাকা চলবে না।

বৃদ্ধ ছেলেটাকে দেখে, দু হাত জোড় করে, কত রকমের আশ্চর্য সংকেত করে ওর মাথার ওপর। তারপর ভেড়াগুলো নিয়ে চলে যায় দূরে।

তারিফের সর্বোচ্চ জায়গাটায় একটা পুরাতন কেল্লা, নিগ্রোরা নির্মান করে গেছে। এরই দেওয়ালের উপর থেকে এক ঝলক আফ্রিকা দেখে নেওয়া যায়। মেলসিযেদেক, সালেমের রাজা, পড়ন্ত সেই বিকালে কেল্লার দেওয়ালে বসে বসে পূবালী ঝড়ো বাতাস, ল্যেভানতে উপভোগ করছিল, বাতাস তার মুখে বয়ে এসে ঝাপটা মারছে।  কাছেই অস্থির ভেড়াগুলো, নতুন মালিকের কাছে কিছুটা অস্বচ্ছন্দ আবার এত সব অদল বদলে বেশ উত্তেজিত। ওদের একমাত্র চাওয়া খাদ্য আর পানি।

মেলসিযেদেক দেখে একটা ছোট ভেড়া দূরে চলে যাচ্ছে। আর কোনো দিন দেখা হবে না রাখাল ছেলেটার সাথে, ঠিক যেমন আব্রাহামের কাছ থেকে এক-দশমাংশ ফী আদায় করে নেওয়ার পর আর কখনো দেখা হয়নি। এটাই ওর কাজ।

দেবতাদের মনে বাসনা থাকা ঠিক নয়, কারন ওদেরতো কোনো ললাট লিখনের ব্যাপার নেই। তবে সালেমের রাজা মনে প্রানে আশা করে যে ছেলেটা সফল হোক। মনে মনে আফসোস করে ছেলেটা চট করেই ওর নাম ভুলে যাবে। নামটা আরো কয়েকবার ওকে বলা দরকার ছিল। তাহলে আমারকথা কিছু বলতে হলে বলতো, সালেমের রাজা, মেলসিযেদেক।

সে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায়; কুন্ঠা জাগে মনে, বলে, “হে প্রভু, জানি, তোমার মতে, এ অসার অহঙ্কার। তবে বৃদ্ধ একজন রাজা কখনো সখনোতো মনে মনে খানিকটা অহং করতেই পারে।“

চলবে